উত্তর ফ্রান্সের এসতেভেলেস কমিউনাল সেমেটরির একটি সমাধির উপর এই শব্দগুলো লেখা: ‘তিনি মারা গিয়েছেন তাঁর আদর্শকে ভালবেসে’। এই সমাধির তলায় যিনি নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছেন, তাঁর জন্ম ফ্রান্স থেকে কয়েক হাজার মাইল দূরে, কলকাতায়!  তিনি এক বঙ্গসন্তান, ইন্দ্রলাল রায়। প্রথম ভারতীয় বিমানচালক। আজ ২২ জুলাই তাঁর মৃত্যুর শতবর্ষ।

ইন্দ্রলালের ডাক নাম ছিল ‘ল্যাডি’। ইন্দ্রলালের চেয়ে ল্যাডি নামেই বরং তিনি পরিচিত ছিলেন বেশি। ১৮৯৮ সালের ২ ডিসেম্বর কলকাতায় তাঁর জন্ম। সেই সময়ের নামী আইনজীবী এবং কলকাতার পাবলিক প্রসিকিউশন্‌স-এর ডিরেক্টর প্যারীলাল রায় ও তাঁর স্ত্রী ললিতা রায়ের সন্তান তিনি। বরিশালের ধনী পরিবারের ছেলে প্যারী বিশ্বাস করতেন, একমাত্র ব্রিটিশরাই পারে ভারতীয়দের গড়ে তুলতে। ইংরেজি শিক্ষার প্রতি ছিল তাঁর অগাধ বিশ্বাস। সন্তানদের দেখাশোনার জন্য তিনি এক জন ইংরেজ গভর্নেসও নিয়োগ করেছিলেন।

প্যারী ছিলেন যথেষ্ট স্বাস্থ্যসচেতন। শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক রাখাটা খুব জরুরি, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি ছেলেদের সাঁতার, ঘোড়ায় চড়া, সাইকেল চালানোও শিখিয়েছিলেন। হাইকোর্টে কাজে যাওয়ার সময় অনেক দিনই তিনি তাঁর বড় ছেলে পরেশকে সঙ্গে নিয়ে যেতেন। আদালতে কী ভাবে কাজ হয় তা দেখানোর পাশাপাশি তাঁর পিতা কতটা প্রভাবশালী, ছেলেকে তা দেখানোও উদ্দেশ্য ছিল প্যারীর। বাবা-ছেলের সম্পর্ক ছিল বন্ধুর মতো। ঘোড়ায় টানা ফিটন গাড়িতে চড়ে পিতা-পুত্র ঘুরে বেড়াতেন কলকাতার আনাচে-কানাচে। প্যারী ভেবেছিলেন, তাঁর বড় ছেলে আইসিএস পরীক্ষা দেবে, ভারত সরকারের উচ্চ পদে চাকরি করবে। সে ভাবেই তিনি ছেলেকে তৈরি করছিলেন।

আঁকাজোখা: ইন্দ্রলাল রায়ের আঁকা যুদ্ধবিমানের স্কেচ।

ব্রিটিশ শাসন ও শিক্ষার প্রতি প্যারীর এতটাই প্রীতি ছিল যে, ১৯০১ সালে ছয় সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে চলে এলেন লন্ডনে। বাড়ি নিলেন হ্যামারস্মিথে, ৭৭ নম্বর ব্রুক গ্রিনে। পরেশ, ইন্দ্র ও ললিত— তিন ছেলেকে ভর্তি করেছিলেন হ্যামারস্মিথে সেন্ট পল বয়েজ় স্কুলে। আর লীলাবতী, মীরাবতী এবং হীরাবতী— তিন মেয়ে ভর্তি হল সেন্ট পল স্কুল অব গার্লস-এ। কিন্তু প্যারী লন্ডনে থাকলেন না। সংসার গুছিয়ে দিয়ে স্ত্রী ললিতার দায়িত্বে সন্তানদের রেখে তিনি ফিরে আসেন কলকাতায়।

পরেশ আর ইন্দ্র দুজনেই তাঁর বাবার মান রেখেছিলেন। স্কুলে বক্সিং চ্যাম্পিয়ন ছিলেন পরেশ। আর ইন্দ্র ছিলেন তাঁর স্কুলের সাঁতারের দলের ক্যাপ্টেন। দুই ভাই নিয়ম করে প্রতিদিন প্রায় এক মাইল সাঁতার কাটতেন! শুধু সাঁতার নয়, রাগবি খেলাতেও তুখড় ছিলেন ইন্দ্র। কয়েক দিন পর ব্রুক গ্রিনের বাড়ি ছেড়ে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ললিতা চলে আসেন অন্য এক ঠিকানায়। ইন্দ্র ও তাঁর ভাইবোনেরা পশ্চিমি শিক্ষায় বড় হলেও ললিতা তাঁদের শেকড়টা ভুলে যেতে দেননি। তাঁদের বাড়ি থেকে ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিকের পাশাপাশি ভেসে আসত ভারতীয় সঙ্গীতের সুরও।

ইন্দ্রলাল রায়ের আঁকা ছবির কোনায় যুদ্ধবিমানের নাম, আছে নিজের স্বাক্ষরও।

দেশ থেকে বহু দূরে অচেনা শহরে ছয় ছেলেমেয়ের একমাত্র অভিভাবক ললিতা। সর্বক্ষণ তাঁর সন্তানদের জন্য নিবেদিতপ্রাণ। কিন্তু তার মধ্যেও ললিতা নিজের একটা স্বকীয় পরিচয় গড়ে তুলেছিলেন। সেই সময় ব্রিটেনে মেয়েদের ভোটের অধিকার নিয়ে সাফ্রাজেট আন্দোলন জোরদার হয়। এই আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন তিনি। তিন মেয়েকেও পাশে পেয়েছিলেন ললিতা। মাত্র ৪৬ বছর বয়সে এই বিপ্লবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে উঠেন তিনি। একটা সময়ের পর ‘লন্ডন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন সোসাইটি’র প্রধানও হয়েছিলেন। ব্রিটেনের নারীদের ভোটাধিকারের জন্য লড়াইয়ের পাশাপাশি ললিতা ভেবেছিলেন ভারতীয় মেয়েদের কথাও। তাঁদের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য তিনি অর্থ জোগাড় করতেন বিভিন্ন অনুষ্ঠান পরিচালনা করে।

সমাজসেবা, পড়াশোনা, খেলাধুলো, সঙ্গীত— সব কিছু নিয়ে লন্ডনের দিনগুলো হইহই করে কাটছিল ললিতা ও তাঁর ছেলেমেয়েদের। এই সুখী জীবনে ছেদ পড়ল ১৯১৪ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হল। পরেশ তখন কেমব্রিজের ইমানুয়েল কলেজ থেকে সদ্য গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেছেন। যুদ্ধ শুরু হওয়ায় তিনি চলে যান সেনাবাহিনীতে। হঠাৎ সেনাবাহিনীতে কেন? এই প্রশ্নের উত্তর বহু দিন পরে একটি সাক্ষাৎকারে দিয়েছিলেন পরেশ। বলেছিলেন, ‘‘আমি প্রমাণ করতে চেয়েছিলাম, বাঙালিরাও রণাঙ্গনে গিয়ে অন্য দেশের সৈনিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে পারে।’’

ইন্দ্রলালের মৃত্যুর ‘ক্যাজ়ুয়ালটি কার্ড’

তাঁর একুশতম জন্মদিনে পরেশ ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর জায়গা হয়েছিল ব্রিটিশ সেনার সব চেয়ে পুরনো রেজিমেন্টে। পরেশ রায়ই প্রথম ভারতীয় যিনি ওই রেজিমেন্টে যোগ দিয়েছিলেন। সেই সময় ইন্দ্রলালের বয়স পনেরো। দাদাকে দেখে তিনি যথেষ্ট উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। ঠিক করেন, পড়াশোনার গণ্ডি পেরিয়ে তিনিও সেনাবাহিনীতে যোগ দেবেন। তারই প্রস্তুতি নিতে তিনি স্কুলে ক্যাডার ফোর্সে যোগ দিয়েছিলেন।

স্কুলের পাঠ শেষ হলে অক্সফোর্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তি পেয়েছিলেন ইন্দ্র। কিন্তু তিনি উঠে পড়ে লাগলেন স্বপ্নপূরণের আশায়। গতি ভালবাসতেন ল্যাডি, খুব পছন্দের ছিল স্পোর্টস কার চালানো। তাঁর নিজের একটি মোটরসাইকেলও ছিল। বড় শখের সেই যান।

ল্যাডি উড়তে চেয়েছিলেন আকাশেও। তাই ‘রয়্যাল ফ্লায়িং কর্পস’-এ যোগ দেওয়ার জন্য আবেদন করেন তিনি। কিন্তু কপাল খারাপ। কমজোরি দৃষ্টিশক্তির জন্য পরীক্ষায় উতরোতে পারলেন না। কিন্তু ভেঙে না পড়ে ইন্দ্র বিক্রি করে দিলেন তাঁর শখের মোটরসাইকেল। সেই টাকা দিয়ে ব্রিটেনের সবচেয়ে নামী চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়ে চিকিৎসা করালেন। চিকিৎসক সবুজ সিগনাল দিতেই ইন্দ্র ফের এক বার রয়্যাল ফ্লায়িং কর্পস-এ আবেদন করেন। এ বার তিনি সসম্মানে পাশ করলেন। মায়ের কাছে বিদায় নিয়ে যুদ্ধে গেলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তখন জ্বলছে গোটা ইউরোপ। ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গিয়েছে দিদি লীলার। দুই ছেলে যুদ্ধে চলে যাওয়ার পর ললিতা বাকি তিন সন্তানকে নিয়ে আবার বাড়ি বদলে চলে আসেন কেনসিংটনে কুইন অ্যান ম্যানশনে।

জুলাই, ১৯১৭। অক্সফোর্ডে ট্রেনিং শেষে আঠারো বছর বয়সি ইন্দ্রলাল ৫৬ নম্বর স্কোয়াড্রনে সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের পদে যোগ দেন। ফ্রান্সের ভাদোম-এ পোস্টিং হয় তাঁর। এয়ার ফোর্সে ইন্দ্র বেশ জনপ্রিয় ছিলেন। তাঁকে অধিকাংশ সময় বন্ধু, সহকর্মীরা ঘিরে থাকত, তাঁর কথা শোনার জন্য।

স্মারক: ভবানীপুরে ইন্দ্রলাল রায়ের নামাঙ্কিত রাস্তার ফলক।

কাজে যোগ দেওয়ার পরে সহোদরা লীলাকে একটি চিঠিতে ইন্দ্র লিখেছিলেন, তাঁদের এরোড্রাম মূল শহর থেকে চার কিলোমিটার দূরে। তাই ঘন ঘন তিনি শহরে যেতে পারেন না। চিঠিতে তিনি লীলার স্বামী, অর্থাৎ তাঁর বড় জামাইবাবু সত্য মুখোপাধ্যায়ের কথাও জানতে চান। বড় জামাইবাবুকে তিনি ভালবেসে ‘সক’ নামে ডাকতেন। সক কেন তাঁকে চিঠি লেখেন না, সেই অনুযোগও করেন দিদিকে। পরক্ষণেই অবশ্য স্বীকার করে নেন যে সক তাঁর চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি চিঠি লেখেন। দিদিকে লিখতে ভোলেন না, ল্যাডি খুব তাড়াতাড়ি সক-কে চিঠি লিখবেন। এও জানান, ক’দিন পরেই তাঁর পাইলট হিসেবে ট্রেনিং শুরু হবে। চিঠির শেষে লেখা, ‘তোমার স্নেহের ভাই, ল্যাডি’। এই চিঠিই বুঝিয়ে দেয়, দিদি-জামাইবাবুর সঙ্গে কতটা স্নেহের সম্পর্ক ছিল ল্যাডির। লীলাকে লেখা ইন্দ্রলালের এই চিঠিটি লন্ডনের রয়্যাল এয়ার ফোর্স মিউজিয়মে আজও সযত্নে রাখা আছে।

ইন্দ্র তথা ল্যাডির সাহসও ছিল আকাশছোঁয়া। আত্মবিশ্বাসে ভর করে তখন সগর্বে উড়ছেন আকাশে। মাত্র আঠারো বছর বয়সেই কার্জিস, বি ই টু, সপউইথ ক্যামেল, আভরো এবং এস ই ফাইভ-এর মতো যুদ্ধবিমানে হাত পাকান তিনি।

আকাশে উড়তে না উড়তেই মুখোমুখি হন শত্রুপক্ষ জার্মান বিমানেরও। ১৯১৭ সালে ৬ ডিসেম্বর, ঘটে গেল এক অঘটন। সে দিন এস ই ফাইভ বিমানে আকাশে উড়ছিলেন ইন্দ্র। আচমকা তাঁর বিমানকে লক্ষ্য করে এক জার্মান যুদ্ধবিমান গুলি চালায়। নো ম্যান’স ল্যান্ডে ভেঙে পড়ে তাঁর বিমান। স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে মৃত বলে ঘোষণা করা হয় ইন্দ্রলালকে। দেহ রাখা হয় মর্গে। হঠাৎ মর্গের দরজায় ভিতর থেকে ধাক্কা। ভূতের ভয়ে হাসপাতালের কর্মীদের তো একেবারে দাঁতকপাটি লেগে যাওয়ার জোগাড়। কিন্তু মর্গের ভিতর ভূত নয়, আসলে দরজায় ধাক্কা দিচ্ছিলেন ল্যাডি! দুর্ঘটনায় সে দিন মারা যাননি তিনি। মর্গে জ্ঞান ফিরে আসায় দরজায় ধাক্কা দিয়ে বেরোনোর চেষ্টা করছিলেন। হাসপাতালের কর্মীদের ভূতের ভয় তাড়িয়ে ইন্দ্র শেষমেশ বোঝাতে সমর্থ হন যে তিনি বেঁচে আছেন। নিজের শিবিরেও ফিরে আসেন তিনি। চিকিৎসার পর ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেন। ইন্দ্রলাল ছবিও আঁকতেন চমৎকার। অসুস্থতার সময় অনেকগুলো স্কেচ করেছিলেন তিনি। সবগুলোই যুদ্ধবিমানের ছবি।

সুস্থ হয়ে উঠলেও আর বিমান চালানোর ছাড়পত্র দেওয়া হয়নি তাঁকে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত তাঁর পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। তাঁর বারংবার অনুরোধ ও অদম্য ইচ্ছের কাছে হার মানতে হয় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। আকাশে ওড়ার জন্য আবার শারীরিক প্রস্তুতি নেন তিনি। হাসপাতালে থাকার সময় মানসিক দিক থেকেও আরও পরিণত হয়েছিলেন। শুধু আবেগে ভেসে নয়, এ বার আরও বেশি সচেতন হয়ে, মন দিয়ে ট্রেনিং নিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন জর্জ ম্যাকরয়-এর তত্ত্বাবধানে। বৈমানিকের দক্ষতায় আরও শান দিয়ে তিনি তিনি ফিরে আসেন ফ্রান্স থেকে। ১৯১৮ সালের ২২ জুন যোগ দেন ৪০ নম্বর স্কোয়াড্রনে।

৬ জুলাই ১৯১৮। আবার বিমান নিয়ে ইন্দ্রলাল উড়ে যান যুদ্ধক্ষেত্রে। প্রথম দিনেই তাঁর আক্রমণে পরাজিত হয় এক জার্মান বিমান। এই জয়ের ছবি তিনি এঁকে রেখেছিলেন তাঁর আঁকার খাতায়। ছবিটির তলায় লিখে রাখেন ‘‘৬ জুলাই, ১৯১৮। ৫.৪৫ এএম এন ই অফ আরাস, হ্যানওভার রানার, ২ সিটার, শট ডাউন বাই আই এল রায়।’’ তাঁর কৃতিত্বের উল্লাসে মেতে ওঠে বন্ধুরাও। পিঠ চাপড়ে শুভেচ্ছা জানায় সহকর্মীরা। এই উৎসাহ তাঁকে যেন আরও শক্তি জোগায়। ৯ জুলাই থেকে ১৯ জুলাই, টানা দশ দিনে ন’টি জার্মান বিমানকে তিনি আক্রমণ করে মাটিতে নামিয়ে আনেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় বিমান চালক, যিনি ১৭০ ঘণ্টা বিমান চালানোর রেকর্ড করেছিলেন।

২২ জুলাই। প্রথম বিশ্ব যুদ্ধ শেষ হওয়ার চার মাস আগের ঘটনা। ফ্রান্সের আকাশে ইন্দ্র উড়ছেন, তাঁর মন হিসাব কষছে শত্রুপক্ষের বিমানকে ধূলিসাৎ করার। আর ঠিক তখনই চার-চারটে জার্মান ফকার যুদ্ধবিমান তাঁকে চার দিক থেকে ঘিরে ধরে। ধুন্ধুমার যুদ্ধ শুরু হয় আকাশে। চার বনাম একের যুদ্ধে অভিমন্যুর মতো সর্বশক্তি দিয়ে লড়েন ইন্দ্র। পরাস্ত করেন দুটো জার্মান বিমানকে। কিন্তু শেষরক্ষা হল না। একটি জার্মান বিমানের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা খায় তাঁর বিমান। শেষ হয়ে যায় ল্যাডির আকাশে ওড়ার স্বপ্ন। লন্ডনে বসে ললিতা জানতে পারেন, তাঁর মেজ ছেলে ‘মিসিং ইন অ্যাকশন’।

ল্যাডির কমান্ডিং অফিসার ইন্দ্রলালের যুদ্ধের বর্ণনা দিয়ে তাঁর মা’কে একটি চিঠি লিখে জানান, ‘‘ন’টা জার্মান বিমানকে ইন্দ্রলাল রায় একা পরাস্ত করেছেন। প্রত্যেক অফিসার তাঁর প্রশংসা করেছেন। সকলের কাছে তিনি খুব জনপ্রিয়ও ছিলেন। আমি নিশ্চিত, তিনি তাঁর এই সাহসিকতার জন্য পুরস্কৃত হবেন।’’

১৯১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ইন্দ্রলাল রায় যে বিমান দুর্ঘটনায় মারা গিয়েছেন, তা পরে নিশ্চিত করে রয়্যাল এয়ার ফোর্স। ওই বছরই রয়্যাল ফ্লায়িং কর্পস-এর নাম বদলে হয় দ্য রয়্যাল এয়ার ফোর্স। এর তিন দিন পর তাঁকে মরণোত্তর ‘দ্য ডিসটিংগুইশ্‌ড ফ্লায়িং ক্রস’ সম্মানে ভূষিত করা হয়। তিনিই প্রথম ভারতীয় যিনি এই সম্মান পেয়েছিলেন। তাঁর মানপত্রে লেখা হয়েছিল, ‘‘(ইন্দ্রলাল রায়) ভীষণ সাহসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এক অফিসার, যিনি ১৩ দিনে ৯টি জার্মান বিমানকে পরাস্ত করেছেন। এই স্বল্প সময়ের মধ্যে তিনি অসাধারণ প্রতিভা দেখিয়েছেন।’’

উত্তর লন্ডনে বেন্টলি প্রায়রি মিউজিয়ামে কিছু দিন আগে অনুষ্ঠিত হল দ্য রয়্যাল এয়ার ফোর্সের শতবর্ষ। এই বিশেষ অনুষ্ঠানে ইন্দ্রলাল রায়কে তাঁর বীরত্বের জন্য শ্রদ্ধার্ঘ্য জানানো হয়েছে। এই বীর সন্তানের মা ললিতা রায়কে স্মরণ করা হয়েছিল পার্লামেন্ট স্কোয়ারে, ব্রিটেনে মেয়েদের ভোটাধিকার আন্দোলনের ১০০ বছর পূর্তিতে। ল্যাডির দিদি লীলার ছেলে সুব্রত মুখোপাধ্যায় পরে স্বাধীন ভারতের এয়ার ফোর্স-এর প্রথম ‘চিফ অব দি এয়ার স্টাফ’ হয়েছিলেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়েই তাঁর বিমানচালনার কাজে হাতেখড়ি হয়। বেঁচে থাকলে ভাগ্নের জন্য মামা নিশ্চয়ই গর্বিত হতেন।

কলকাতার ভবানীপুরে ইন্দিরা সিনেমাহলের কাছে রাস্তাটির নাম ‘ইন্দ্র রায় রোড’। কিন্তু আমাদের মধ্যে ক’জনই বা চিনি এই বীর বাঙালিকে! কত জনই বা জানি তাঁর সাহসিকতার কাহিনি! বাঙালির ভিতু, ঘরকুনো তকমাকে যে মানুষটা মুছতে চেয়েছিলেন, মৃত্যুর শতবর্ষে আজ সেই ইন্দ্রলাল রায় বিস্মৃত।