• Tarapada Santra
  • তারাপদ সাঁতরা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সাবেক চিৎপুর রোড, অধুনা রবীন্দ্র সরণি যেন স্মৃতির সরণি

কুমোরটুলিই ছিল সেকালের নানাবিধ প্রতিমার গড়ন ও চালচিত্র বা সরা-পিঁড়ি চিত্রাঙ্কণের ডাকসাইটে শিল্পকেন্দ্র।

Chitpur Road
পুরনো চিৎপুর রোড।
  • Tarapada Santra

Advertisement

এবারে পৌঁছে যাওয়া গেল কুমোরটুলি এলাকায়। এখানে কোনও প্রসঙ্গ উঠলেই কলকাতার একটি সাবেকি প্রবাদের কথা মনে পড়ে যায়। সেটি হল, ‘গোবিন্দরামের ছড়ি/ বনমালী সরকারের বাড়ি/ উমিচাঁদের দাড়ি/ জগৎ শেঠের কড়ি।’ এখানে ছড়ায় উল্লিখিত গোবিন্দরাম হলেন গোবিন্দরাম মিত্র, যিনি ছিলেন কোম্পানির নিযুক্ত সেকালের ‘ব্ল্যাক জমিনদার’ ও কুমোরটুলির মিত্র বংশের আদিপুরুষ। এখানে ছড়ায় বর্ণিত ‘ছড়ি’র উল্লেখের মধ্যে তার প্রবল দাপটের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। সেকালের চিৎপুর রোডের পশ্চিমপারে ১৭৩০ সালে তাঁর নির্মিত অক্টারলোনি মনুমেন্টের চেয়ে উঁচু নবরত্ন বা ন’চূড়া স্থাপত্যের মন্দির নিয়ে বহু আলোচনা হয়েছে। আদতে তাঁর নির্মিত সুউচ্চ মন্দিরটি যে ন’চূড়ার বদলে ছিল পাঁচচূড়া বা পঞ্চরত্ন এবং তারই পাশাপাশি ছোট আকারের একটি নবরত্নও যে ছিল, তা আঠারো শতকের শেষ দিকে দুই ইংরেজ চিত্রকর ড্যানিয়েলদের ভিন্ন ভিন্ন কোণ থেকে আঁকা দুটি ছবি থেকে স্পষ্টই প্রতীয়মান হয়।

আজও হাতে-টানা রিকশার নস্টালজিয়া এ পাড়ার অলিতে-গলিতে

পরবর্তী সময়ে ওই বিশালাকার পঞ্চরত্নটি বিনষ্ট হলেও, পাশের নবরত্নটি এখনও তার স্বস্থানে অবস্থান করছে। প্রমাণ হিসেবে দেখা যায়, ওই বিদেশি চিত্রকরদের তুলিতে বর্তমান নবরত্নটির দক্ষিণ লাগোয়া যে দোচালা স্থাপত্যটি অঙ্কিত হয়েছিল, বহুবার সংস্কারের প্রলেপ পড়লেও আজও একই স্থান বরাবর সেই দোচালা রূপটি অবিকৃতভাবে টিকে রয়েছে। পশ্চিমবাংলার অন্যান্য স্থানের মতো কলকাতার মাটিতেও যে একসময় দোচালা মন্দিরশৈলী আদৃত হয়েছিল, এটি সেই কালের সাক্ষী।

আরও পড়ুন: উইলিয়াম সিমসনের আঁকা ঝুলবারান্দার স্মৃতিচিহ্ন স্মরণ করায় ট্রাডিশনের কথা

আলোচ্য এ মন্দিরের সামনেই চিৎপুর রোডের অপর প্রান্তে রয়েছে এই মিত্র পরিবারেরই প্রতিষ্ঠিত সিদ্ধেশ্বরী কালীর পশ্চিমমুখী দালান মন্দির। ডানিয়েলদের আঁকা গোবিন্দরামের মন্দির-দৃশ্যের ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষিতে আঁকা দু’টি ছবিতেই যেখানে একটি আটচালা মন্দির দর্শিত হয়েছে ঠিক সেই স্থানটিতেই দেখা যাচ্ছে পরিবর্তিত রূপে এই বর্তমান মন্দিরটির অধিষ্ঠান। তবে পূর্বতন স্থাপত্যের বদলে বর্তমান স্থাপত্যের এ মন্দিরটি কবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তার কোনও সাল-তারিখের হিসেব না পেলেও, দেবীর সেবায়িত মুখুজ্জে পরিবার যে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দ থেকে এর পরিচালনভার পেয়েছিলেন সে সম্পর্কিত একটি মার্বেল-ফলক আজও দেওয়ালে বিদ্যমান।

রবীন্দ্র সরণির এই মল্লিক হাউসেই ‘নীল দর্পণ’ নাটক প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল

গোবিন্দরামের নবরত্ন পেরিয়ে একটু এগুলেই ডানহাতি রাস্তার ওপরে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে সরস্বতী প্রতিমার একমেটে করা অসংখ্য মেড়। তবে তো কুমোরটুলির পোটো পাড়ায় পৌঁছে গেছি। সুবৃহৎ এই মৃৎশিল্প কেন্দ্রটির প্রধান প্রবেশপথ হল বনমালী সরকার স্ট্রিট দিয়ে। এ রাস্তা ধরে একটু ভিতরে গেলেই দু পাশারি পড়বে প্রতিমার অঙ্গসজ্জার জন্য প্রয়োজনীয় শোলা ও ডাকের সাজের দোকান। তদুপরি রয়েছে রকমারি পুতুল, পোড়ামাটির ফুলদানি, ছাইদানি, ধূপদানি, বিবিধ নকাশি প্রদীপ ও মন্দিরসজ্জায় ব্যবহৃত ‘টেরাকোটা’ ফলকের অনুকরণে পোড়ামাটির মৃৎফলক প্রভৃতির দোকান-পশার। আঠারো শতকের শেষ দিক নাগাদ শান্তিপুর, কৃষ্ণনগর, নবদ্বীপ আর মেটেরির কুম্ভকার কারিগররা ধীরে ধীরে এখানে এসে আসর জাঁকিয়ে বসেছিলেন বিভিন্ন দেবদেবীর প্রতিমা নির্মাণের তাগিদে।

আরও পড়ুন: স্মৃতির সরণি: চিৎপুর রোড

রাস্তার ধারের সাবেক দোকান

শুধু প্রতিমা নির্মাণই নয়, আগেকার সময়ে বারোয়ারি পুজোর উদ্যোক্তাদের ফরমাশমতো নানাবিধ ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের বিষয়ীভূত সং-এর মূর্তি গড়নের জন্য এখানকার কারিগরদের যে ডাক পড়ত, তা হুতোমের নকশা থেকে জানা যায়। শুধু কুম্ভকার সমাজই এখানে বসতি গড়ে তোলেননি, সেইসঙ্গে প্রতিমার রূপসজ্জায় প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক শোলা ও ডাকের সাজের কারিগর মালাকার সম্প্রদায়ও এখানে ডেরা বেঁধেছিলেন। আধুনিককালের চারু ও কারুশিল্পকলার শিক্ষণধারা চালু হওয়ার আগে এই কুমোরটুলিই ছিল সেকালের নানাবিধ প্রতিমার গড়ন এবং চালচিত্র বা সরা-পিঁড়ি চিত্রাঙ্কণের এক ডাকসাইটে শিল্পকেন্দ্র। দেশবিভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকেও বেশ কিছু শিল্পী এখানে স্থায়ীভাবে মূর্তি নির্মাণের কাজে অংশ নিয়েছেন। এ ছাড়া কেবলমাত্র এখানকার প্রতিমা নির্মাণের খ্যাতিই নয়, এককালের স্বনামধন্য যদু পাল, রাম পাল, বক্রেশ্বর পাল, রাখাল পাল, ও নিবারণ পালের মতো শিল্পীবৃন্দ দেশ-বিদেশের নানান স্থান থেকে তাঁদের কারুকর্মের কৃতিত্বের জন্য যে সংবর্ধনা লাভ করেছিলেন, তা বাঙালির এক গৌরবের বিষয়।

রবীন্দ্র সরণির বিখ্যাত রবীন্দ্র কাকন

বনমালী সরকার স্ট্রিট দিয়ে আরও একটু পশ্চিমে এগিয়ে যাওয়া গেল। আগেই যে প্রবাদটির উল্লেখ করা হয়েছে সেখানে গোবিন্দরামের পাশাপাশি বনমালী সরকারের বাড়ির প্রসঙ্গ স্থান পেয়েছে। বলাবাহুল্য, এ রাস্তাটি তাঁরই নামাঙ্কিত। বনমালী সরকার ছিলেন পাটনার কমার্শিয়াল রেসিডেন্টের দেওয়ান এবং পরে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডেপুটি ট্রেডার পদে অধিষ্ঠিত হবার সুবাদে বিপুল বিত্তের অধিকারী হয়েছিলেন। কিন্তু ছড়ায় বর্ণিত তাঁর বাড়িটি বর্তমানে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলেও, এই রাস্তায় ২/৫ নম্বরে তাঁর প্রতিষ্ঠিত আনুমানিক আঠারো শতকের বাণেশ্বর শিবের বৃহদাকার আটচালা মন্দিরটি আজও টিকে রয়েছে। স্থাপত্য বিচারে মন্দিরটির যত না গুরুত্ব, এটির প্রবেশপথের দেওয়ালে নিবদ্ধ দেবদেবীর মূর্তি ও সামাজিক বিষয়বস্তু অবলম্বনে উৎকীর্ণ সাবেকি ‘টেরাকোটা’ ভাস্কর্যফলকগুলি আজও প্রথাগত মন্দিরসজ্জার ধারা বহন করে চলেছে। দুঃখের বিষয়, পশ্চিমবঙ্গের প্রত্নতত্ত্ব দফতর কলকাতায় যে সব পুরাকীর্তি সংরক্ষণ করেছেন, তার মধ্যে কয়েকটি গির্জা ও মসজিদের নাম থাকলেও এই গুরুত্বপূর্ণ মন্দিরটি সংস্কারে কেন যে তাঁদের দৃষ্টি এড়িয়ে গেল তা বোঝা শক্ত।

চিৎপুরের রাস্তায় এমন দোকান চোখে পড়বে অনেক

চিৎপুর রোড তথা রবীন্দ্র সরণি দিয়ে যেতে যেতে সেকালের প্রাচীন পরিবারের এমন সব অতীত কীর্তির কিছু না কিছু নিদর্শন চোখে পড়বেই। এই তো বাঁ-হাতি নন্দরাম সেন স্ট্রিট, যার প্রবেশপথেই বাঁ-হাতি দেখা যাচ্ছে একটি বিশালাকার আটচালা মন্দির। যাঁর নামে এই রাস্তাটি সেই নন্দরামের প্রতিষ্ঠিত সনাতন রীতির বাঁকানো চাল ও ত্রিখিলানযুক্ত এই মন্দিরটি এখানের এক বিশেষ দ্রষ্টব্য। মন্দিরে নিবদ্ধ পাঁচটি লিপিফলকে উৎকীর্ণ সাল তারিখগুলি থেকে মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল যথার্থ বিবেচিত না হলেও, স্থাপত্য বিচারে সেটি যে আঠারো শতকের মধ্যভাগে নির্মিত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই।

ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে

 

(উপরের নিবন্ধটি তারাপদ সাঁতরা-র ‘কীর্তিবাস কলকাতা’ গ্রন্থের ‘স্মৃতির সরণি: চিৎপুর রোড’ অধ্যায় থেকে নেওয়া। আজ তার তৃতীয় অংশ। সৌজন্যে আনন্দ পাবলিশার্স)

 

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন