খ্রিস্টীয় আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে কলকাতার সবচেয়ে উঁচু অট্টালিকা কোনটি— এ প্রশ্নের জবাবে বলতে হবে, কলকাতার ‘ব্ল্যাক জমিনদার’ গোবিন্দরাম মিত্রের নবরত্ন মন্দির; যেটি উচ্চতায় ছিল ১৬৫ ফুট। অবশ্য ‘ব্ল্যাক জমিনদার’-কৃত সে সময়ের এই ব্ল্যাক প্যাগোডাটি প্রতিষ্ঠার বছর সাতেকের মধ্যেই ঝড় আর ভূমিকম্পে ভেঙে পড়ে। কিন্তু তা হলেও বিখ্যাত ইংরেজ চিত্রকর ড্যানিয়াল সাহেবের রংতুলিতে এ মন্দিরের যে উচ্চতা রূপায়িত হয়েছিল, তাই এখন আমাদের সেই পুরাতন স্মৃতির সাক্ষ্য। পরবর্তী উনিশ শতকের মাঝামাঝিতে ইংরেজ শাসকদের কেরামতিতে গড়ের মাঠে অক্টারলোনি সাহেবের যে স্মৃতিস্তম্ভ নির্মিত হল, সেটি হয়ে উঠল তখনকার কলকাতার সবচেয়ে উঁচু মিনার— ১৫৮ ফুট যার উচ্চতা; যদিও এটি বর্তমানে তার আসল পরিচয় হারিয়ে ভিন্ন নামাঙ্কিত হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে এই মনুমেন্ট প্রতিষ্ঠার আরও বছর পঞ্চাশ পরে ব্রিটিশ শাসকরা কলকাতায় যে সুদৃশ্য ভবনটি নির্মাণ করলেন, উচ্চতার দিক থেকে সেটি মনুমেন্টকেও টেক্কা দিল। কারণ এটি ছিল উচ্চতায় ১৮০ ফুট— যা ওই মনুমেন্টের উচ্চতা অপেক্ষা আরও বাইশ ফুট উঁচু। ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই উচ্চতাসম্পন্ন অট্টালিকাটি হল কলকাতার ‘হাইকোর্ট’ ভবন।

‘হাইকোর্ট’ ভবন স্থাপনেরও একটা ধারাবাহিক ইতিহাস আছে। কলকাতা প্রতিষ্ঠার আদিপর্ব থেকে ন্যায়বিচারালয়ের স্থান বারে বারে স্থানান্তরিত হয়েছে। কলকাতার বুকে বিদেশি শাসকদের প্রথম ন্যায়ালয় হল ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত ‘মেয়রস্ কোর্ট’। যে জন্যে এখন ‘ওল্ডকোর্ট হাউস স্ট্রিট’-এর নামটি আজও সেই পুরাতন স্মৃতিবহ হয়ে রয়েছে। তারপর ১৭৭৮ সালে লালদিঘির উত্তর-পূর্ব কোণের এক বাড়িতে প্রতিষ্ঠিত হল সেকালের সুপ্রিম কোর্ট। পরবর্তী পর্যায়ে এই সুপ্রিম কোর্ট উঠে আসে এসপ্লানেড-পশ্চিম ও স্ট্র্যান্ড রোডের সংযোগস্থলে (অর্থাৎ আজকের হাইকোর্ট ভবনের পশ্চিম অংশে) অবস্থিত এক ভবনে।

উচ্চতার দিক থেকে এটি মনুমেন্টকেও টেক্কা দেয়

সে সময়ের এই সুপ্রিম কোর্টের প্রথম ও প্রধান বিচারপতি ছিলেন ইতিহাসখ্যাত স্যার ইলিজা ইম্পে—যিনি এক জালিয়াতির মামলায় মহারাজ নন্দকুমারের ফাঁসির বিধান দিয়েছিলেন। ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হওয়ার ছ’বছর পরে, তিনি অতিরিক্ত পারিশ্রমিক ছাড়াই সদর দেওয়ানি আদালতেরও প্রধান বিচারপতি নিযুক্ত হলেন। এই সদর দেওয়ানি আদালত ভবনেই একদিন মহারাজ নন্দকুমারকে বিচারাধীন বন্দি হিসেবে রাখা হয়েছিল। সেদিনের সেই সদর দেওয়ানি আদালত ভবন এখনও নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়নি— ‘ইন্ডিয়ান মিউজিয়াম’-এর এলাকার ভেতরে সে ভবনটি এখনও আত্মগোপন করে রয়েছে। তবে সেদিনের সদর আদালতের পরিচয় এখনও বহন করে চলেছে আজকের ‘সদর স্ট্রিট’ নামের রাস্তাটি।

অন্যদিকে বিচারপতি স্যার ইলিডার যেখানে বাসভবন ছিল, সেটি হল মিডলটন রো-তে অবস্থিত রোমান ক্যাথলিক চার্চের পিছন দিককার একটি অংশে— যা বর্তমান লরেটো হাউস কনভেন্ট-এর দখলে এবং বিচারপতি বাসভবনটির চতুর্দিকে ছিল হরিণ বিচরণের এক বিস্তৃত স্থান, যার ইংরেজি নাম ‘ডিয়ার পার্ক’। সেকালের কবরখানার রাস্তাটির নাম এই জন্যেই পরিবর্তন হয়ে দাঁড়াল ‘পার্ক স্ট্রিট’।

ইতিমধ্যে শাসনক্ষেত্রে এক পরিবর্তন হল। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ভারতে তাদের সামরিক ও অসামরিক মায় যাবতীয় দায়দায়িত্ব ব্রিটিশ সম্রাটের হাতে সমর্পণ করল। এই পরিস্থিতিতে ন্যায় বিচারের প্রশ্নে আইন-আদালতের ক্ষেত্রে কলকাতায় প্রতিষ্ঠিত হল হাইকোর্ট। সাধারণের কাছে তাই তার নতুন নামকরণ হল, ‘নিউ কোর্ট হাউস’। ১৮৬১ সালে যথাবিধি প্রতিষ্ঠিত হয়ে হাইকোর্ট তার আপিল বিভাগ বসাল লোয়ার সার্কুলার রোডের এক ভবনে—যেখানে এখন মিলিটারি হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। অন্যদিকে হাইকোর্ট—এর আদিম বিভাগের বিচার বসত অস্থায়ীভাবে কলকাতা টাউন হলে। তবে পর বৎসর ১৮৬২ সালেই হাইকোর্টের কাজ পুরোপুরিভাবেই আরম্ভ হয়।

১৮৬২ সালে হাইকোর্টের কাজ পুরোপুরিভাবে আরম্ভ হয়েছিল

কিন্তু হাইকোর্ট-এর নিজস্ব ভবনের একান্ত প্রয়োজন। সেজন্যে এসপ্লানেড-পশ্চিম ও স্ট্র্যান্ড রোডের  সংযোগস্থলে যে ভবনে সুপ্রিম কোর্ট বসত, সেই জায়গাতেই পাকাপাকিভাবে প্রস্তাবিত ‘হাইকোর্ট’ ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হল। সরকারি স্থপতি মি. ওয়ালটার গ্রানভিল-এর উপর দায়িত্ব পড়ল এর নকশা তৈরির। বেলজিয়ামের ইপ্রেস শহরে খ্রিস্টীয় তেরো শতাব্দীর মিউনিসিপ্যাল ভবন পর্যায়ের ‘ক্লথ হাউস’-এর অনুকরণে এর নকশা প্রস্তুত করলেন গ্রানভিল। সেইমতো ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয় এবং নির্মাণ কার্য সম্পূর্ণ হয় ১৮৭২ খ্রিস্টাব্দে মে মাস নাগাদ। হাইকোর্ট ভবনের এই স্থাপত্য সম্পর্কে, এটি সত্য কি না জানি না, কিন্তু এমন একটা কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, বিগত প্রথম মহাযুদ্ধে ইপ্রেস শহরের ক্লথ হলটি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায়, পরবর্তীকালে সেটি পুনর্নির্মাণে এখানকার হাইকোর্ট ভবনের নকশা প্রতিলিপি করার প্রয়োজনে বেলজিয়াম থেকে স্থপতিদের কলকাতায় আসতে হয়।

 

(উপরের নিবন্ধটি তারাপদ সাঁতরা-র ‘কীর্তিবাস কলকাতা’ থেকে নেওয়া। আজ তার প্রথম অংশ প্রকাশিত হল। সৌজন্যে আনন্দ পাবলিশার্স)