Advertisement
E-Paper

তিনসুকিয়া-হাফলং-জাটিঙ্গা-মায়োদিয়া-ধুবুরি

উজান, মধ্য ও নমনি অসমে যাঁরা ঘুরতে চান, তাঁদের জন্য রইল সবিস্তার ভ্রমণসূচি। আজ তৃতীয় তথা শেষ পর্ব।ডিব্রু-শইখোয়া জাতীয় উদ্যানের অনেকটা অংশই জল। তাতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির স্বর্গরাজ্য। আছে মেঘলা চিতাবাঘ, হরিণ, স্লো লরিস, বুনো মোষ, বুনো কুকুর, হাতি ও অন্যান্য বুনো। জলে দেখা মিলবে ডলফিনদের।

রাজীবাক্ষ রক্ষিত

শেষ আপডেট: ০৬ অক্টোবর ২০১৭ ২০:৫৪
সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অপূর্ব মায়োদিয়া পাস। দেবাশিস রায়ের ক্যামেরায়।

সাত হাজার ফুট উচ্চতায় অপূর্ব মায়োদিয়া পাস। দেবাশিস রায়ের ক্যামেরায়।

অসম ঘোরার পর্যটন মানচিত্রে সচরাচর অন্তর্ভুক্ত না হলেও, যাঁরা অফ বিটের সন্ধানী, তাঁরা কিন্তু তিনসুকিয়ায় ঘাঁটি করে অবশ্যই ঘুরে নিতে পারেন ডিব্রু-শইখোয়া জাতীয় উদ্যান, পরশুরাম কুণ্ড, মায়োদিয়া পাস, জয়পুর যুদ্ধ স্মারক, নামসাইয়ের সোনালী প্যাগোডা।

ডিব্রু-শইখোয়া জাতীয় উদ্যানের অনেকটা অংশই জল। তাতে বিভিন্ন প্রজাতির পাখির স্বর্গরাজ্য। আছে মেঘলা চিতাবাঘ, হরিণ, স্লো লরিস, বুনো মোষ, বুনো কুকুর, হাতি ও অন্যান্য বুনো। জলে দেখা মিলবে ডলফিনদের। কিন্তু এই অরণ্যের বিশেষত্ব বুনো ঘোড়া। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পরে পোষা খচ্চর-ঘোড়াদের জঙ্গলে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। তাদের উত্তর-পুরুষরা এখন বুনো ঘোড়া হয়ে জঙ্গল দাপায়। এমন জিনিস ভারতে বিরল। ডিব্রু-শইখোয়ায় হাউস বোটে থাকা ও নৌকায় ঘোরার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন সঞ্জয় দাসের সঙ্গে। নম্বর: ৯৯৫৪৫৪২২৩৩।

ধুবুরি শহরের বুকে গুরু তেগবাহাদুরের গুরুদ্বার। ছবি: রাজীবাক্ষ রক্ষিত।

আরও পড়ুন:

তেজপুর-কাজিরাঙা-মাজুলি-শিবসাগর

গুয়াহাটি-কামাখ্যা-পবিতরা-মানস

তিনসুকিয়া বা পাশেই ডিব্রুগড় থেকে এসইউভি ভাড়া করে পাড়ি দিতে পারেন পরশুরাম কুণ্ড, নামসাই, রোয়িং।

যাত্রাপথে পার হন ভারতের দীর্ঘতম, ধলা থেকে শদিয়াগামী, সাড়ে ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ ভূপেন হাজরিকা সেতু। ৫২ নম্বর জাতীয় সড়ক হয়ে অরুণাচলের লোহিত জেলায় ঢুকে এগোতে থাকলে টেঙাপানি বা চোংখামে রয়েছে বর্মি কায়দায় গড়া সোনালি প্যাগোডা বা কোংমু খাম। তার জমক, বাহার, গঠনশৈলী আপনাকে মুগ্ধ করবে।

সোনায় সোহাগা, মন্দির চত্বরেই কটেজে থাকার ব্যবস্থা। তাইল্যান্ড থেকে আসা রাজবংশের শাসন ছিল উজান অসম ও অরুণাচলের এই অংশে। তাই-খামটিদের উপাসনাস্থল ওই মন্দিরের প্রধান পুরোহিত তাইল্যান্ডের। মন্দিরের চারটি প্রবেশপথ রক্ষা করছে জোড়া সিংহ মূর্তি। আছে অশোকস্তম্ভ। শতাধিক বৌদ্ধ ভিক্ষু মঠে থাকেন। রাতের আলোয় যেন মঠের সোনালি রং আরও খোলে। শান্তি ও সৌন্দর্যের এই যুগলবন্দি ছেড়ে আসতে মন চাইবে না।

শৈল শহর হাফলং। ছবি: রাজীবাক্ষ রক্ষিত।

নামসাই থেকে জয়রামপুরে স্টিলওয়েল রোড, মিত্রবাহিনীর সমাধিক্ষেত্র দেখে আসতে পারেন। চিনা, কাচিন, ভারতীয়, ইংরেজ, আমেরিকান— সহস্রাধিক সৈন্যের কবর রয়েছে এখানে।

সেখান খেকে চলুন লোহিত নদীর সঙ্গে থাকা পরশুরাম কুণ্ডের উদ্দেশে। লোহিত জেলার সদর তেজু থেকে ২১ কিলোমিটার দূরে পরশুরাম কুণ্ড। কথিত আছে মাতৃহত্যার পাপে পরশুরামের হাতে এঁটে যাওয়া কুড়ুল এই জলে হাত ধোয়ার পরে হাত থেকে খসেছিল। অন্য মতে, ২১ বার বিশ্ব ক্ষত্রিয়হীন করার পাপ থেকে মুক্তি পেতে ওই জলে স্নান করেছিলেন পরশুরাম। ১৮ শতকে এক সাধুর হাত ধরে খ্যাতি পায় ওই কুণ্ড। কিন্তু ১৯৫০ সালের ভূমিকম্পে আদি কুণ্ড ও আশ্রম জলের তলায় চলে যায়। তার স্থানে পাথরের বড় চাঁই নতুন কুণ্ডের জন্ম দিয়েছে। প্রতি বছর মকর সংক্রান্তিতে তীর্থযাত্রীর ঢল নামে এখানে। বিশ্বাস, এখানে স্নান করলে চরম পাপ থেকেও মুক্তি মিলবে। তেজু থেকে কামলাং অভয়ারণ্যের ভিতরে বিরাট গ্লো লেকও ট্রেক করে আসা যায়।

লোয়ার দিবাং উপত্যকার রোয়িং-মায়োদিয়া বরফ দেখতে চাওয়া, নির্জনতাপ্রেমী, পাখিপ্রেমীদের অবশ্য গন্তব্য। সাত হাজার ফুট উচ্চতার মায়োদিয়ায় রোয়িং থেকে গাড়িতে ঘুরে আসা যায়। দূরত্ব ৫৭ কিলোমিটার। ইদু মিশমি উপজাতির বাস এখানে। আছে মেহাও অভয়ারণ্য। রোয়িংয়ে রয়্যাল বেঙ্গলেরও দেখা বহু বার মিলেছে। মায়োদিয়ায় মূলত হোম স্টেতেই থাকতে হবে। থাকা-খাওয়ার বিলাসিতা এখানে চলবে না। অপূর্ব মায়োদিয়ায় জায়গাগুলিকে চিহ্নিত করা হয় রোয়িং থেকে দূরত্ব দিয়ে। যেমন ১২ কিলো, ৬০ কিলো (কিলোমিটার)।

নামসাইয়ে বর্মি কায়দায় গড়া সোনালি প্যাগোডা বা কোংমু খাম। ছবি: দেবাশিস রায়।

উজান, মধ্য ও নমনি অসমে ঘোরার স্থানগুলি এতই বেশি ও ছড়ানো যে তাদের এক লাইনে বাঁধা যায় না। গুয়াহাটি থেকে যাঁরা উপরের দিকে যাচ্ছেন না, তাঁদের জন্য কিন্তু অন্য অভিনব বিকল্পের হাতছানি রয়েছে উমরাংশু, জাটিঙ্গা, হাফলং। শৈল শহর হাফলং যেতে হলে আগে মিটার গেজের ট্রেন ছিল সম্বল। কিন্তু সেই হিল কুইন এক্সপ্রেসের যাত্রাপথ, টানেল, ধীর গতির নস্টালজিয়া ছিল অন্য আকর্ষণ। এখন ওই পথে ব্রডগেজ ট্রেন চালু হয়েছে। নাম অবশ্য একই রাখা হয়েছে। আবার সড়কপথও রয়েছে নগাঁও ঢোকার আগেই। হাফলং যেতে হলে লামডিং হয়েও যাওয়া যায়। আবার নগাঁও বাইপাস হয়ে বা হামরেন হয়ে উমরাংশুর কপিলি জলপ্রপাত দেখেও যেতে পারেন। কপিলি নদীর বাঁধের এক দিকে বিরাট ওই জলপ্রপাততে অসমের নায়গ্রা বলা হয়ে থাকে। হাফলংয়ে ডিমাসা ছাড়াও জেমি, নেপালি, মিজো, বেতে, মণিপুরি, কুকি, মার, রাংখল, খাসি ও অবশ্যই বিস্তর বাঙালির বাস। ২০০৯ সাল পর্যন্ত জঙ্গি সমস্যায় জর্জরিত থাকা হাফলংয়ের স্বশাসিত পরিষদে এখন অনেক জঙ্গি নেতাই পরিষদ সদস্য। হাফলং ঘিরে থাকা সবুজ-নীল পাহাড়-জঙ্গলে বিভিন্ন পশু-প্রাণীর বাস। সুন্দরতম জায়গা সার্কিট হাউস আর দূরদর্শনের টাওয়ার। বরাইল পাহাড়ের রেঞ্জ পুরো দেখা যায় সেখান থেকে।

পাখিদের আত্মহত্যার গল্পের জন্য বিখ্যাত এই জাটিঙ্গা গ্রাম। ছবি: রাজীবাক্ষ রক্ষিত।

হাফলংয়ের অদূরেই জাটিঙ্গা গ্রাম। যে গ্রাম পাখিদের আত্মহত্যার গল্পের জন্য বিখ্যাত। আর নামকরা কমলালেবুর জন্য। বর্ষা শেষে, ঝোড়ো হাওয়ার রাতে পাহাড় টপকে পাখির ঝাঁক জাটিঙ্গার দিকে আসে। মাছরাঙা, হেরণ, ইগ্রেট, পিট্টা, টাইগার, ব্ল্যাক বিটার্নের দলকে গুলতি মেরে, আগুন জ্বালিয়ে টেনে এনে মারা হয়। তাকেই চালানো হত পাখিদের আগুন ঝাঁপ বলে। জাটিঙার ভিউ পয়েন্টে দাঁড়ালেই মন ভরে যাবে।

যাঁরা নামনি অসমে যেতে চান, তাঁদের জন্য ধুবুরিতে ঘাঁটি করাই ভাল। এক দিকে বিরাট ব্রহ্মপুত্র চলে গিয়েছে বাংলাদেশ। অন্য দিকে গদাধর নদীর পারে গড়ে উঠেছে প্রাচীন ধুবুড়ি শহর। তার প্রধান আকর্ষণ মহামায়া ধাম। বাঙালি, কোচ, কছারি, নাথ যোগীদের কাছে সমান গুরুত্ব এই মাতৃধামের। আছে ১৭ শতকে তৈরি হুসেন শাহের গড়া রাঙামাটি মসজিদ। শহরের বুকে গুরু তেগবাহাদুরের গুরুদ্বার অবশ্য দ্রষ্টব্য। নেতাই-ধুবুনির ঘাট থেকে নৌকা করে ঘুরে আসা যায় ব্রহ্মপুত্রের বিভিন্ন চর গ্রাম। বাংলাদেশের সীমান্ত ঘুরে ফেরার সময় ঢুকুন আষাড়িকান্দি গ্রামে। এখানকার টেরাকোটা, মাটির পুতুল রাজ্যে বিখ্যাত। দামেও কম। বাগরিবাড়িতে সুউচ্চ ২৫ হাত কালীমূর্তি রয়েছে। আর আছে চক্রশিলা অভয়ারণ্য। গঙ্গাধর নদীর পারে রয়েছে সীমান্ত গ্রাম আগমনি। কোচ সেনাপতি বীর চিলারায়ের বিয়ে উপলক্ষে এখানে আগমন ঘটে রাজা নরনারায়ণ, শ্রীমন্ত শঙ্করদেব, মাধবদেবদের। আছে সত্রশালের রামরাইকুটি সত্র।

ধুবুরির অদূরেই রয়েছে প্রমথেশ বড়ুয়া, প্রকৃতিশ বড়ুয়া, প্রতিমা বড়ুয়াদের স্মৃতিধন্য বরুয়াদের রাজপ্রাসাদ, মাটিবাগ প্যালেস, মহামায়া মন্দির, হাওয়ামহল। ইতিহাস ও ঐতিহ্য বুকে বয়ে নিয়ে চলা হাওয়া মহলের একতলায় অস্ত্রাগার ও শিকার করা প্রাণীদের মাথা তাক লাগাবে। বর্তমান রাজা প্রবীর বড়ুয়ার অমায়িক ব্যবহার মনে থেকে যায়। তাঁর মেয়ে পুনম বড়ুয়া প্রতিমা বড়ুয়ার গোয়ালপাড়িয়া বা কমতাপুরিয়া গানের ধারা নতুন প্রজন্মেও টেনে নিয়ে যাচ্ছেন।

পরশুরাম কুণ্ড। ছবি: দেবাশিস রায়।

ধুবুড়ি গেলে অবশ্যই ঘুরে নিন গোয়ালপাড়ার ঐতিহাসিক স্থান সূর্য পাহাড়। সেখানে একই সঙ্গে হিন্দু, বৌদ্ধ ও জৈন উপাসনাস্থল থাকার প্রমাণ মিলেছে। আছে শতাধিক পাথরের শিবলিঙ্গ, স্তূপ। কথিত আছে, ব্যাসদেব এই এলাকাকে দ্বিতীয় কাশী হিসেবে তৈরি করতে ৯৯৯৯৯টি শিবলিঙ্গ তৈরি করেছিলেন।

থাকার জায়গা:

মায়োদিয়া হোম স্টে- ৯৮৬২৮৫৬৯৮১, মায়োদিয়া ৬৫– ৯৪০২৭২৯১৭৭। মায়োদিয়া কফি হাউস- ৯৭৭৪৭৪৮৮২৮। স্যালি লেক গেস্ট হাউস- ৯৪০২৪৯২৫৩৫, ৮১১৯৮২৬৪৯২।

নামসাই মঠের অতিথিশালায় থাকার জন্য যোগাযোগ করতে পারেন: ০৩৮০ ৬২৬২৫২৯/৬২৬২২২৯ বা মেল করুন- contact@goldenpagoda.in

ধুবুড়ি ও বঙ্গাইগাঁওতে থাকা-খাওয়ার অনেক হোটেল। ধুবুরিতে সিংহভাগই বাঙালি বা বাংলা বুঝতে পারেন। গুয়াহাটি থেকে নিয়মিত বাস যায় ধুবুড়িতে। গুয়াহাটির পল্টনবাজার ও বেতকুচিতে রয়েছে আন্তঃরাজ্য বাস টার্মিনাস। সেখান থেকে উজান ও নমনি অসমের প্রায় সর্বত্র বাস যায়। এসি এবং নন এসি বাস চলে। ফোন- পল্টনবাজার কাউন্টার– ৯৯৫৭৫৬৩০৩৩, বেতকুচি– ০৩৬১ ৬০১০৮৩৮, ৯৭০৬১৬৪২৬৫

Holiday Destination Assam Travel Tips Dhubri
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy