×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৯ জুন ২০২১ ই-পেপার

সৃষ্টিশীলতায় জগদ্ধাত্রী পুজো

বিভূতিসুন্দর ভট্টাচার্য
২০ নভেম্বর ২০১৫ ০০:০২
কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ার বুড়িমা।

কৃষ্ণনগরের চাষাপাড়ার বুড়িমা।

কৃষ্ণনগর না চন্দননগর? জগদ্ধাত্রী পুজোয় কে এগিয়ে সে তর্ক বহু দিনের। তবে এই দুই জায়গার সঙ্গে একাত্ম হয়ে গিয়েছে জগদ্ধাত্রী পুজোর চিরন্তন ঐতিহ্য। জগদ্ধাত্রী দুর্গারই রূপ ভেদ। দেশের বিভিন্ন সংগ্রহালয়ে সিংহবাহিনী দেবীর মূর্তিগুলি থেকে গবেষকরা মনে করেন, পাল-সেন যুগেও জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন ছিল। এমনকী, সে কালের বিভিন্ন তন্ত্র গ্রন্থে উল্লেখ মেলে জগদ্ধাত্রী পুজোর। যেমন, ‘মায়াতন্ত্র’-এ দেখা যায় ‘প্রপূজয়েজগদ্ধাত্রীং কার্তিকে শুক্লপক্ষকে দিনোদয়ে চ মধ্যাহ্নে সায়াহ্নে নবমেহহন।’ মানে, কার্তিক মাসের শুক্লা নবমী তিথিতে দিনের শুরুতে মধ্যাহ্নে এবং সায়াহ্নে জগদ্ধাত্রী পুজো করা যায়।

এ পুজোর প্রচলন নিয়ে শোনা যায় একাধিক কাহিনি।

প্রচলিত কাহিনি অনুসারে, নবাব আলিবর্দি খানকে রাজকর দিতে না পারায় কারাগারে বন্দি হয়েছিলেন মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র। সালটা ১৭৫৪। পরে নবাবের কারাগার থেকে অবশেষে তিনি যখন মুক্ত হয়েছিলেন, তখন দুর্গোত্‌সব প্রায় শেষ। সে বার পুজোয় উপস্থিত থাকতে না পারায় ক্লান্ত বিষণ্ণ রাজা নৌকার মধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। জনশ্রুতি, সেখানেই কৃষ্ণচন্দ্র স্বপ্নে দেখেছিলেন যে এক রক্তবর্ণা চতুর্ভূজা কুমারী দেবী তাঁকে বলছেন আগামী কার্তিক মাসের শুক্লানবমী তিথিতে তাঁর পুজো করতে।

Advertisement


কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির প্রতিমা।



অন্য একটি কাহিনি অনুসারে, ইংরেজদের বন্ধু এই সন্দেহে ১৭৬৪তে মীরকাশিম মুঙ্গেরের কারাগারে বন্দি করেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্র ও তাঁর পুত্র শিবচন্দ্রকে। শোনা যায়, মীরকাশিম নাকি কৃষ্ণচন্দ্রের প্রাণদণ্ডের আদেশ দিয়েছিলেন। শোনা যায়, কারাগারেই কৃষ্ণচন্দ্র এক কুমারী দেবীর স্বপ্নাদেশ লাভ করেছিলেন এবং কারাগার থেকে মুক্তিলাভের প্রতিশ্রুতি লাভ করেছিলেন। জনশ্রুতি, কিছু দিনের মধ্যেই তিনি সত্যি কারামুক্ত হয়েছিলেন এবং সেই স্বপ্নে দেখা দেবীর মূর্তি তৈরি করে জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রচলন করেছিলেন।

দেখুন গ্যালারি, জগদ্ধাত্রীর আলোয়

গবেষকদের মতে, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্রই জগদ্ধাত্রী পুজোর প্রবর্তক। তবে চন্দননগরে পুজোর প্রচলন কী ভাবে হয়েছিল তা নিয়ে মতান্তর রয়েছে। ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরী ছিলেন ফরাসি সরকারের দেওয়ান। এ কথা বহুল প্রচলিত যে কৃষ্ণচন্দ্র আর ইন্দ্রনারায়ণ চৌধুরীর মধ্যে সখ্যতা এবং যোগাযোগ ছিল। অনেকেই মনে করেন ইন্দ্রনারায়ণের মাধ্যমে কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজো চন্দননগরে প্রবেশ করেছিল। এক বার কৃষ্ণচন্দ্রের বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো দেখে পরের বছর তিনি চন্দননগরে পুজোর প্রবর্তন করেছিলেন। যদিও এ কাহিনি নিয়ে মতান্তর আছে। কেননা, ইন্দ্রনারায়ণের মৃত্যু হয়েছিল ১৭৫৬ সালে। আর ১৭৫৬-এ কৃষ্ণনগরে পুজোর প্রচলন হয়েছিল কি না তা নিয়ে দ্বিমত আছে।


ভদ্রেশ্বরের তেঁতুলতলা গৌরহাটির প্রতিমা।



তেমনই চন্দননগরে জগদ্ধাত্রী পুজো প্রসঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে কৃষ্ণচন্দ্রের দেওয়ান দাতারাম শূরের নাম। দাতারামের বাড়ি ছিল ভদ্রেশ্বরের গৌরহাটি অঞ্চলে। এখানেই আনুমানিক ১৭৬২-র কাছাকাছি সময় দাতারামের বিধবা মেয়ে তাঁর বাড়িতে জগদ্ধাত্রী পুজো শুরু করেছিলেন। গবেষকদের মতে এ পুজোতেও কৃষ্ণচন্দ্রের অনুদান ছিল। পরে পুজোটি স্থানান্তরিত হয় শিবতলা অঞ্চলে। পরবর্তী কালে মূলত আর্থিক কারণে পুজোটি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলে গৌরহাটি অঞ্চলের বাসিন্দারা পুজোটির দায়িত্ব নেন। সেই পুজোটি আজ তেঁতুলতলার পুজো বলে প্রসিদ্ধ।

শোনা যায়, নানা কাহিনি। যেমন চন্দননগর (ফরাসডাঙা) আর কৃষ্ণনগরের মধ্যে বাণিজ্যিক যোগাযোগ বহু দিনের। কৃষ্ণনগরের চাল ব্যবসায়ীরা নির্দিষ্ট সময় চাল কিনে ফিরতে না পারায় ফরাসি সরকারের অনুমতি নিয়ে চাউল পট্টিতে জগদ্ধাত্রী পুজোর শুরু করেছিলেন। পরে এই পুজোর দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন চন্দননগরের চাল ব্যবসায়ীরা। এর পরবর্তী কালে শুরু হয়েছিল লক্ষ্মীগঞ্জ কাপড়পট্টির জগদ্ধাত্রী পুজো। এই অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য পুজোগুলির মধ্যে রয়েছে লক্ষ্মীগঞ্জ চৌমাথা ও লক্ষ্মীগঞ্জ বাজারের পুজো।

বর্তমানে চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোগুলিকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়। উত্তর ও দক্ষিণ চন্দননগরের পুজো। উত্তরে লক্ষ্মীগঞ্জের উল্লিখিত পুজোগুলি ছাড়া খলিসানী খালপুকুরধার, বউবাজার, শীতলাতলা, বাগবাজার চৌমাথা, বিদ্যালঙ্কার, পালপাড়া, বিবরহাট চড়কতলা, হেলাপুকুরধার, কাঁটাপুকুর, কাঁটাপুকুর চৌমাথা, বোড়ো কালীতলা, চাঁপাতলার পুজো উল্লেখযোগ্য। তেমনই দক্ষিণ চন্দননগরের মানকুণ্ডু সর্বজনীন, নিয়োগী বাগান, সার্কাস মাঠ, তেমাথা, অম্বিকা অ্যাথলেটিক ক্লাব, গোন্দলপাড়া মনসাতলা, লিচুতলা হাজিনগর, হাটখোলা দৈবকপাড়া, বড়বাজার, পাদ্রিপাড়া, বারাসত গেটের পুজো উল্লেখযোগ্য।


কৃষ্ণনগর চকেরপাড়ার প্রতিমা।



চন্দননগরের বেশির ভাগ জগদ্ধাত্রী পুজো দুর্গাপুজোর মতো তিন দিন ধরে হলেও তেঁতুলতলা-সহ কিছু প্রাচীন পুজোয় নবমীর দিনে তিন বার পুজোর ঐতিহ্য বজায় আছে। চাউলপট্টি এবং তেঁতুলতলার পুজোয় এখনও পাঁঠা বলি হয়। তবে কৃষ্ণনগরে আজও পুজো হয় শুধুমাত্র নবমীর দিনে।

চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় আলোকসজ্জ্বার খ্যাতি রয়েছে বিশ্ব জুড়ে। এক এক পাড়ায় মেলে এক এক ধরনের চমক। প্রতিমার পাশাপাশি চন্দননগরের আর এক আকর্ষণ আলোকসজ্জ্বা।

চন্দননগরের বেশির ভাগ প্রতিমার মুখ মানবী রূপের। এখানকার প্রতিমা সোলার সাজ এক চিরন্তন ঐতিহ্য পরিণত হয়েছে। যদিও ইদানীং দেখা যাচ্ছে বেশিরভাগ প্রতিমাকে রঙিন ঝলমলে সাজ পরানোর রেওয়াজটা বাড়ছে। তবে তেঁতুলতলা কিংবা চাউলপট্টীর মতো পুরনো পুজোগুলি শোলার সাজের ইতিহ্য বজায় রেখেছে তেমনই সাবেক রূপটিও অপরিবর্তিত রয়েছে। সময়ের সঙ্গে চন্দননগরের পুজোয় প্রবেশ করেছে থিম। বেশ কিছু পুজোয় দেখা যায় তাকলাগানো থিমের সঙ্গে মানানসই প্রতিমা। তবে বেশির ভাগ পুজোগুলিতে এখনও দেখা যায় চিরাচরিত বৃহৎ আকারের প্রতিমা, আকর্ষণীয় সাজ ও আলোকসজ্জ্বার চমক।


চন্দননগরের চাউলপট্টি লক্ষ্মীগঞ্জের প্রতিমা।



অন্য দিকে কৃষ্ণনগরেও সাবেক ঐতিহ্যবাহী পুজোগুলির পাশাপাশি বাড়ছে থিমের প্রাধান্য। তবে এখানে থিমের পাশাপাশি সমান আকর্ষণ রয়েছে পুরনো পুজোগুলির। যেমন রাজবাড়ি এবং রায়বাড়ির পুজো ছাড়াও আজও কাতারে কাতরে মানুষ চাষাপাড়ায় বুড়িমা-র পুজো দেখতে যান। এখানে শুধু প্রতিমা শুধু দর্শন নয়, জমা পড়ে ‘মানত’ করা সোনা রুপোর গয়না, বেনারসি শাড়ি ইত্যাদি। এখানকার বৃহৎ প্রতিমা সোলার সাজে সজ্জ্বিত হলেও পরানো হয় প্রচুর সোনার গয়না। প্রতি বছরই বাড়তে থাকে এই সোনার গয়নার পরিমাণ।

শোনা যায় কৃষ্ণনগর রাজপরিবারে প্রত্যক্ষ্য পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয়েছিল কিছু পুজো। এক সময় রাজবাড়ি থেকে মালোপাড়ার পুজোয় ১৫ টাকা অনুদান দেওয়া হত। সেই প্রথা আজও চলছে। রাজপরিবারের বধূ অমৃতা রায় প্রতি বছর প্রতিমা দর্শন করে অনুদান দিয়ে আসেন। এই পুজোয় দেখা যায় নানা সাবেক ঐতিহ্য। বিসর্জনের দিন আজও জ্বালানো হয় কার্বাইড ল্যাম্পের আলো। থাকে নানা রকম স‌ংও।

কৃষ্ণনগরের অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুজোগুলির মধ্যে চকেরপাড়া, নেদেরপাড়া, কাঁঠালপোঁতা, তাঁতিপাড়া, নুড়িপাড়া, বাঘাডাঙা, কাঠুরিয়াপাড়া, বালকেশ্বরী, ষষ্ঠীতলা এবং শক্তিনগরের বেশ কিছু পুজো উল্লেখযোগ্য।

অতীতের মতো আজও কৃষ্ণনগরের সব সর্বজনীন প্রতিমা রাজবাড়ির সামনে দিয়ে শোভাযাত্রা করে বিসর্জনে যায়। আগে রানিরা সেই সব প্রতিমা দেখে প্রথম দ্বিতীয় নির্ধারণ করতেন। মিলত পুরষ্কারও।

তাই চন্দননগর হোক বা কৃষ্ণনগর সৃষ্টিশীলতায় জগদ্ধাত্রী পুজো যেন খুঁজে পেয়েছে নতুন দিগন্ত।



Tags:

Advertisement