Advertisement
E-Paper

রক্ত-আর্তনাদই স্নায়ু শক্ত করল ডাক্তারের

দু’চার সেকেন্ডের জন্য মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে বসেছিলেন ডাক্তারবাবু।চোখের সামনে তখন একের পর এক রক্তাক্ত শিশু যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। বুদ্ধি-বিবেচনা বলেছিল, থানা-পুলিশের কেস। এই অবস্থায় সকলকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে পারলেই ভাল। কিন্তু গ্রামের লোক পারলে তখন তাঁর পায়ে পড়ে। সকলেরই বক্তব্য, ডাক্তারবাবু আপনি কিছু করুন।

নির্মল বসু

শেষ আপডেট: ২৯ মে ২০১৬ ০২:১০
এখানেই ফেটেছিল বোমা। ইনসেটে, জুলফিকার আলি। শনিবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

এখানেই ফেটেছিল বোমা। ইনসেটে, জুলফিকার আলি। শনিবার তোলা নিজস্ব চিত্র।

দু’চার সেকেন্ডের জন্য মাথায় হাত দিয়ে ভাবতে বসেছিলেন ডাক্তারবাবু।

চোখের সামনে তখন একের পর এক রক্তাক্ত শিশু যন্ত্রণায় আর্তনাদ করছে। বুদ্ধি-বিবেচনা বলেছিল, থানা-পুলিশের কেস। এই অবস্থায় সকলকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে পারলেই ভাল। কিন্তু গ্রামের লোক পারলে তখন তাঁর পায়ে পড়ে। সকলেরই বক্তব্য, ডাক্তারবাবু আপনি কিছু করুন। পুলিশ এলে সকলকে হাসপাতালে পাঠানো যাবে। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে জুলফিকার আলি ভেবে দেখেন, হাসপাতাল এখান থেকে প্রায় কুড়ি কিলোমিটার দূরে। সেখানে পাঠাতে গেলে যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হবে, তাতে বাচ্চাগুলোর অনেকের প্রাণসংশয় হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। সাতপাঁচ ভেবে শেষমেশ কাজে হাত লাগান বসিরহাটের কৃপালপুর গ্রামের মাঝেরপাড়ার হাতুড়ে চিকিৎসক জুলফিকার।

শনিবার সকালে তাঁর বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে বোমা ফেটে জখম হয়েছেন অনেকে। তাঁদেরই আনা হয়েছিল ডাক্তারবাবুর চেম্বারে। পরে পুলিশ জানায়, বোমা ফেটে জখম শিশুরা হল— শিবম মণ্ডল (দ্বিতীয় শ্রেণি), আয়নাল মোল্লা (পঞ্চম শ্রেণি), আসিদ খান (সপ্তম শ্রেণি), সাইন মণ্ডল (সপ্তম শ্রেণি), রেহেনা পারভিন (৭ বছর), পারভিন খাতুন (৯ বছর)। এ ছাড়াও জখম হয়েছেন বাপ্পা মণ্ডল, মহিরুল ইসলাম, মাসুদ খান, আলাউদ্দিন মণ্ডল, ছোট্টু মণ্ডল, নাসির মণ্ডল। আসিদ মণ্ডল নামে সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রও চোট পেয়েছে বিস্ফোরণে। তার দাদু লুৎফার রহমান পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। জানিয়েছেন, মিছিলে কেউ কেউ বোমা নিয়ে লোফালুফি করতে গিয়েই এই বিপত্তি।

গ্রামের মাঝে জুলফিকারের আটপৌরে একতলা বাড়ি। সংলগ্ন চেম্বার। ছোট্ট জায়গা। সকলকে সেখানে ঠাঁই দেওয়া সম্ভব নয়। বারান্দার গ্রিলে স্যালাইনের বোতল বেঁধে ৯ জনের হাতে চ্যানেল তৈরি করে দেন ডাক্তারবাবু। সেই সঙ্গে ব্যথা কমার ওষুধ, ইঞ্জেকশন দেন। টেটভ্যাকও দেন কাউকে কাউকে। সামান্য পরিকাঠামোয় যতটা সম্ভব, চেষ্টা করেছেন জুলফিকার— গ্রামের লোক সকলেই মানছেন এক বাক্যে। অনেকের ক্ষতস্থান থেকে স্‌প্লিন্টার বের করেন তিনি। ব্যান্ডেজ বাঁধেন।

জুলফিকার জানান, আঠারো বছর ধরে ডাক্তারি করছেন। কিন্তু এত বড় ঘটনা দেখেননি। শুরুতে নিজেও সংশয়ে ছিলেন। এত রক্ত দেখে একেবারে ঘাবড়ে যাননি, তা-ও নয়। কিন্তু পরে মন শক্ত করেন। তাঁর কথায়, ‘‘বাচ্চাদের আর্তনাদ করতে দেখে নিজেকে বোঝালাম, যা হওয়ার হবে। আগে চিকিৎসা তো শুরু করি। গ্রামের মানুষ যে ভাবে ভরসা করেছেন, তার মর্যাদা রাখতে পেরে আমি গর্বিত।’’

গ্রামের মানুষ জানাচ্ছেন, বছর পাঁচেক আগে খাদ্যে বিষক্রিয়ায় অনেকে অসুস্থ হয়েছিলেন। সে সময়েও একা হাতে প্রায় ২৫-৩০ জনের স্যালাইন-সহ আনুষঙ্গিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করে প্রাথমিক ভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছিলেন জুলফিকার। প্রতাপ ঘোষ, আশাদুল ইসলাম, লুৎফার রহমান-সহ কয়েকজন গ্রামবাসী জানালেন, কাজটা ডাক্তারবাবুর পক্ষে ঝুঁকির ছিল অবশ্যই। এতগুলো মানুষের জীবন-মরণ সমস্যা। কিন্তু বাপি দাস আর ফকিলদা মণ্ডল নামে দুই গ্রামবাসীকে সঙ্গে নিয়ে সত্যিই সাহসের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। তা ছাড়া যে অন্য উপায় সে সময়ে ছিল না, তা-ও মনে করছেন সকলে।

পরে পুলিশ এলে আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। আলাউদ্দিন, ছোট্টু এবং নাসিরকে পাঠানো হয়েছে কলকাতার হাসপাতালে।

বসিরহাট হাসপাতালে ভর্তি আছে জনা চারেক। হাসপাতালের সুপার শ্যামল মণ্ডল বলেন, ‘‘গ্রামে প্রাথমিক চিকিৎসা করে খুবই ভাল হয়েছে। এত দূর থেকে আহতদের আনতে গেলে যে পরিমাণ রক্তক্ষরণ হতো, তাতে শিশুদের অবস্থা আরও খারাপ হতে পারত।’’ চিকিৎসকদের অনেকে জানান, গ্রামে এ ধরনের চিকিৎসকদের উপযুক্ত তালিম দেওয়া দরকার। তা হলে গ্রামীণ চিকিৎসা পরিকাঠামোই উন্নত হবে।

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy