E-Paper

বাড়ছে গরম, ট্রাইবুনালের লাইনেও ভোগান্তি

ট্রাইবুনালে আবেদন জমা দিতে বুধবার বনগাঁ মহকুমাশাসকের দফতরে ভিড় জমান বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দারা।

নিজস্ব প্রতিবেদন

শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:০১
ট্রাইবুনালে আবেদন করার লাইন। বুধবার বনগাঁয়।

ট্রাইবুনালে আবেদন করার লাইন। বুধবার বনগাঁয়। ছবি: নির্মাল্য প্রামাণিক ।

ট্রাইবুনাল নিয়ে দুই ২৪ পরগনায় ভোগান্তি অব্যাহত। বহু মানুষেরই আশঙ্কা, ভোটার তালিকায় নাম না থাকলে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা থেকেও তাঁরা বঞ্চিত হতে পারেন। অনেকেই কাজ ফেলে, টাকা খরচ করে আবেদন করতে এসেছেন। প্রয়োজনীয় নথি থাকা সত্ত্বেও নাম ফের তোলার অনিশ্চয়তা, দীর্ঘ লাইন, আর্থিক ক্ষতি— সব মিলিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন লাইনে দাঁড়ানো মানুষ।

ট্রাইবুনালে আবেদন জমা দিতে বুধবার বনগাঁ মহকুমাশাসকের দফতরে ভিড় জমান বিভিন্ন প্রান্তের বাসিন্দারা। বহু মানুষ ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে অভিযোগ করেন, সমস্ত নথি থাকা সত্ত্বেও তাঁদের নাম চূড়ান্ত ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শুধু তাই নয়, ট্রাইবুনালে আবেদন করার প্রক্রিয়া সম্পর্কেও স্পষ্ট ধারণা না থাকায় দুর্ভোগ আরও বেড়েছে বলে অভিযোগ তাঁদের।

বাগদার গেবিন্দপুরের বাসিন্দা সরিয়ত মণ্ডল বলেন, “সব নথিপত্র থাকা সত্ত্বেও নাম বাদ গিয়েছে। মাধ্যমিকের মার্কশিট নেই। ষষ্ঠ শ্রেণি পর্যন্ত পড়েছি। কোথায় পাব? ফাইভ পাশ শংসাপত্র দিয়েছি। ২০০২ তে বাবা-মায়ের নাম ছিল। সেটাই দিয়েছি।”

গোপালনগরের মাটিয়ারা এলাকার বাসিন্দা দেবব্রত বিশ্বাস জানান, জীবিকার ক্ষতি করেই তাঁকে ছুটে আসতে হয়েছে। তাঁর কথায়, “উত্তরপ্রদেশে ইটাওয়ায় গ্রামীণ চিকিৎসক হিসেবে কাজ করি। হয়রানি তো আছেই, পাঁচ হাজার টাকা খরচও হয়েছে। ২০০২ সালে নাম ছিল কিন্তু এবার নাম বাদ গিয়েছে।”

লাইনে দাঁড়ানো এক মহিলার কথায়, “এ দেশে জন্মেছি। আগে ভোট দিয়েছি। আচমকা আমি ভোটার থাকলাম না। তা হলে আগে যে ভোট দিয়েছি, সে সব নির্বাচন বাতিল করা হোক। আমরা অবৈধ হলে যাঁরা আমাদের ভোটে জিতেছেন তাঁরাও অবৈধ।” তবে ট্রাইবুনালে আবেদন করলেও আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে ভোটাধিকার ফিরে পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যাচ্ছে। এক ব্যক্তির কথায়, “এ বার ভোট দিতে না পারলেও ভোটার তালিকায় নামটা উঠুক। সম্মান নিয়ে বাঁচতে পারব। বেনাগরিক তো হতে হবে না।”

বসিরহাট ১ ব্লক অফিসে বুধবার সকাল থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন নিমদাঁড়িয়া কোদালিয়া পঞ্চায়েতের বাসিন্দা আকলিমা বিবি। তাঁর অভিযোগ, এসআইআর-এর জটিলতায় তিন বার লাইনে দাঁড়াতে হয়েছে, দু’বার শুনানিতেও ডাকা হয়েছে নামের ভুলের কারণে। প্রয়োজনীয় নথিপত্র জমা দেওয়ার পরেও নাম ওঠেনি। তাঁর প্রশ্ন, “এই হয়রানি কবে মিটবে?”

শাকচুঁড়ো বাগুন্ডি পঞ্চায়েতের সুমিতা দাস প্রায় দু’ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর কথায়, “ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, লাইন এগোয় না। নামের বানান ভুলের জন্য নথি দিয়েও লাভ হয়নি। প্রেসারের ওষুধ খেতেও ভুলে গিয়েছি।”

বছর ছাব্বিশের ফিরোজ গাজির অভিযোগ, ১৯৯৫ সালের জমির দলিল-সহ সব নথি দিয়েও নাম বাদ পড়েছে। তাঁর কথায়, “ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারব কি না জানি না। কাজ ফেলে তিন ঘণ্টা দাঁড়িয়ে আছি।”

তবে ক্যানিং মহকুমায় কিছুটা ভিন্ন ছবি দেখা গেল। বুধবার ক্যানিং মহকুমাশাসকের দফতরে ভিড় তুলনামূলক কম ছিল। দফায় দফায় মাইকে প্রচার করে জানানো হয়, অনলাইনে আবেদন করলে নথি জমা দেওয়ার জন্য দফতরে আসার প্রয়োজন নেই। মহকুমাশাসক প্রবীন মালিয়া বলেন, “মানুষের হয়রানি কমাতে আমরা অনলাইনে আবেদনের উপরে জোর দিচ্ছি। শুনানির সময়ে যাঁদের ডাকা হবে, তাঁরা এলেই কাজ হবে।”

অন্যদিকে, কাকদ্বীপ মহকুমাশাসকের দফতরের সামনেও এদিন সকাল থেকে দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। নামখানার মৌসুনি দ্বীপের বাসিন্দারা ভোর থেকে বৃষ্টির মধ্যেই লাইনে দাঁড়ান। তাঁদের প্রশ্ন, এত হয়রানির পরে আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন কি না!

মৌসুনি দ্বীপের বাসিন্দা হাসিবুল ইসলাম শেখ জানান, দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে কাগজ জমা দিলেও ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটছে না। কোনও রাজনৈতিক দলের সহায়তাও পাননি বলে অভিযোগ তাঁর।

ট্রাইবুনালে আবেদনের জন্য মহকুমা-স্তরের সহায়তা কেন্দ্রের পাশাপাশি ডায়মন্ড হারবারের বিভিন্ন সাইবার ক্যাফেতেও ভিড় জমছে। রায়দিঘি, মন্দিরবাজার, কুলপি, উস্তির মতো এলাকা থেকে বহু মানুষ আবেদন জানাতে ডায়মন্ড হারবার শহরে আসছেন। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের তরফে ওই ভোটারদের সহযোগিতার ব্যবস্থাও করা হয়েছে বলে জানা গিয়েছে। তবে মহকুমাশাসকের দফতরের সামনে ভিড়ও ছিল যথেষ্ট। উস্তির বাসিন্দা আকিবুল মোল্লা বলেন, “পরিবারের সকলের নাম রয়েছে, আমার নাম নেই। এই গরমে কয়েক ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে ট্রাইবুনালের জন্য আবেদন জানালাম। এই হয়রানি আর মেনে নিতে পারছি না।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Tribunal Bangaon

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy