E-Paper

অগ্নিকাণ্ডে অতীতে শ্রমিক-মৃত্যুর পরেও সতর্ক হয়নি তালবান্দা শিল্পাঞ্চল

কয়েক বছর আগে এক রাতে বিলকান্দায় পাশাপাশি থাকা একটি গেঞ্জির কারখানা ও ওষুধ সংস্থার একটি গুদামে আগুন লাগে।

প্রবাল গঙ্গোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ২৮ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:০৩
পুরনো পরিকাঠামো নিয়েই চলছে তালবান্দা-বোদাই শিল্পাঞ্চল। মঙ্গলবার।

পুরনো পরিকাঠামো নিয়েই চলছে তালবান্দা-বোদাই শিল্পাঞ্চল। মঙ্গলবার। নিজস্ব চিত্র।

শিল্পাঞ্চলের গলিতে একটু ঘুরলে থিনারের গন্ধ নাকে এসে লাগবেই। সমগ্র শিল্পাঞ্চলে জলের উৎস বলতে তিনটি মাত্র পুকুর। অথচ কারখানা অন্তত শ’তিনেক। অতীতে এই শিল্পাঞ্চলে কারখানার ভিতরে আগুনে আটকে পড়ে চার জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছিল। তা সত্ত্বেও আজও সোদপুরের বিলকান্দা অঞ্চলের তালবান্দা-বোদাই শিল্পাঞ্চলের পরিকাঠামোর বিশেষ উন্নতি ঘটেনি। রবিবার নরেন্দ্রপুর থানা এলাকার নাজিরাবাদে মোমোর বিপণির গুদামে আগুনে পুড়ে একাধিক মৃত্যুর ঘটনার পরে প্রশ্ন উঠছে, কতটা নিরাপদ বিলকান্দার এই শিল্পাঞ্চল?

কয়েক বছর আগে এক রাতে বিলকান্দায় পাশাপাশি থাকা একটি গেঞ্জির কারখানা ও ওষুধ সংস্থার একটি গুদামে আগুন লাগে। গেঞ্জি কারখানার ভিতরে আটকে পুড়ে মৃত্যু হয় চার শ্রমিকের। সেই সময়ে প্রশাসন জানিয়েছিল, ওইশিল্পাঞ্চলে জলাধারের সংখ্যা বাড়ানো হবে। একই সঙ্গে সেখানকার পরিকাঠামোরও উন্নতি করা হবে। কিন্তু মঙ্গলবার দুপুরে ওই এলাকা ঘুরে জানা গেল, প্রায় ৩৫ বছর ধরে চলা ওই শিল্পাঞ্চলে ২০১৭ সালে একটি রাস্তা তৈরি হয়েছিল। বর্তমানে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা পরিষদ একটি নতুন রাস্তা তৈরি করছে। সেই সঙ্গে কিছু নর্দমা ছাড়া আর বিশেষ কিছুই নেই তালবান্দা-বোদাই শিল্পাঞ্চলে। অন্তত আগুনের নিরিখে বিচার করলে কারখানাগুলি কতটা অগ্নিবিধি মেনে চলছে, সেই নজরদারি ব্যবস্থাও কার্যত অনুপস্থিত।

ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, স্থানীয় দেবরূপায়ণ নগরে একটি দমকল কেন্দ্র তৈরি হওয়ার কথা। তার বাইরে মাস ছয়েক আগে দমকলের তরফে জানানো হয়েছে, কারখানার ভিতরে অগ্নি নির্বাপণ ব্যবস্থা পরিচালনার প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে। কিন্তু এখনও পর্যন্ত সেসব কিছুই শুরু হয়নি। তাঁরা জানাচ্ছেন, শিল্পাঞ্চলের ভিতরের কারখানাগুলি জলের পাইপলাইন দিয়ে এক সঙ্গে জুড়ে নিতে প্রশাসনের কাছেপ্রস্তাব পাঠিয়েছেন, যাতে কারখানায় জলের জোগান সব সময়ে থাকে। তালবান্দা বোদাই ইন্ডাস্ট্রিজ় অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক পান্নাগোপাল ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘পাইপলাইন দিয়ে কারখানাগুলি জুড়ে নিলে কোনও দুর্ঘটনা ঘটলে শুরু থেকেই আগুনের সঙ্গে লড়ার একটা উপায় হবে। আমরা সরকারের থেকে সাহায্য পাই। জেলা পরিষদ একটি রাস্তা তৈরি করে দিচ্ছে। সরকার এই শিল্পাঞ্চলের পরিকাঠামো উন্নয়নের দিকে আর একটু নজর দিক।’’

কিন্তু শিল্পাঞ্চল ঘুরে জানা গেল, শুরু থেকেই সেটি পরিকল্পনামাফিক গড়ে ওঠেনি। আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনার সময়ে ভাঙাচোরা রাস্তা দিয়ে শিল্পাঞ্চলে পৌঁছতে নাকানিচোবানি খেয়েছিল দমকল। এখনও রাস্তার একই হাল। শিল্পাঞ্চল জুড়ে গেঞ্জি, রং, নিটিং, রাবার, প্লাস্টিক— সব ধরনের কারখানা চলছে। অধিকাংশ পণ্যের উৎপাদনে দাহ্যবস্তুর ব্যবহার হয়। অনেক কারখানায় রাতে লোকজন থাকেন। কিন্তু অগ্নিবিধি কতটা মেনে কারখানাগুলি চলছে, তা জানেন না ব্যবসায়ীরাও। পান্নাগোপালের কথায়, ‘‘আমরা কারও কারখানায় ঢুকতে পারি না। বিধি মেনে কারখানা চলে বলেই ধরে নিচ্ছি।’’ উত্তর ২৪ পরগনা দমকল বিভাগ সূত্রের খবর, পাঁচ বছর আগের ওই দুর্ঘটনায় গেঞ্জির কারখানার ছাদের দরজা বন্ধ ছিল। সিঁড়িতে মালপত্র ডাঁই করে রাখা ছিল। ফলে ভিতরে আটকে পড়া শ্রমিকেরা কারখানার ছাদে উঠে প্রাণে বাঁচতে পারেননি।

সেই সমস্যা এখনও রয়ে গিয়েছে অনেক কারখানায়, এমনই অভিযোগ স্থানীয় বিলকান্দা-১ পঞ্চায়েত এবং উত্তর ২৪ পরগনার দমকল বিভাগের। দমকলের অভিযোগ, সিংহভাগ কারখানার ভিতরে অগ্নি নির্বাপক ব্যবস্থা সঠিক নয়। কারখানাগুলি দমকলের ছাড়পত্র নিতে চায় না। বিলকান্দা পঞ্চায়েত-১ প্রধান প্রবীর দাস বলেন, ‘‘অধিকাংশ কারখানা চলছে বেআইনি ভাবে। সরকারও আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জমির চরিত্র বদল না করায় সম্প্রতি একটি কারখানার নির্মাণকাজ বন্ধ করা হয়েছে। আমরা অনেক ক্ষেত্রে কারখানার ভিতরেঢুকে দেখেছি, নিয়ম না মেনে আপৎকালীন দরজা মালপত্র দিয়ে আটকানো রয়েছে। আমরা জেলা পরিষদ, বিধায়কের কাছে অভিযোগ করেছি। সবটা আমাদের হাতেও নেই। ভিতরে একটা চক্র চলছে। সেটা ভাঙার প্রয়োজন।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Barrackpore Fire Accident

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy