×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২০ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

হাবড়ায় দম্পতি খুনের ঘটনায় জামাইয়ের পরে ধৃত মেয়েও

নিজস্ব সংবাদদাতা 
হাবড়া২৯ নভেম্বর ২০২০ ০৩:০৪
গ্রেফতারের পরে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে নিবেদিতাকে (বাঁ দিকে)। ছবি: সুজিত দুয়ারি

গ্রেফতারের পরে পুলিশ নিয়ে যাচ্ছে নিবেদিতাকে (বাঁ দিকে)। ছবি: সুজিত দুয়ারি

হাবড়ায় দম্পতি খুনে এর আগে ধরা পড়েছিল জামাই। এ বার ধরা পড়ল মেয়ে।

১৫ সেপ্টেম্বর রাতে হাবড়ার টুনিঘাটা এলাকার লন্ডনপাড়ায় নিজের বাড়িতেই গুলিতে খুন হয়েছিলেন প্রাক্তন সেনাকর্মী  রামকৃষ্ণ মণ্ডল এবং স্ত্রী লীলারানি। তাঁর ভাইয়ের মেয়ের পুরনো প্রেমিক খুন করেছে বলে প্রথমে সন্দেহ করেছিল পুলিশ। গ্রেফতারও করা হয় ওই যুবককে। কিন্তু কিছু দিনের মধ্যেই তদন্ত নাটকীয় মোড় নেয়। সম্পত্তির লোভে এক সঙ্গীকে নিয়ে রামকৃষ্ণর জামাই বান্টি সাধু শ্বশুর-শাশুড়ির উপরে প্রাণঘাতী হামলা চালায় বলে জানতে পারে পুলিশ। গ্রেফতার করা হয় বান্টিকে। 

বাবা-মায়ের খুনের ঘটনার পরে বাপের বাড়িতে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল বড় মেয়ে নিবেদিতা। বাবা মায়ের খুনের ঘটনায় দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিরও দাবি তোলে সে। খুড়তুতো বোনের প্রেমিক এই কাণ্ড ঘটিয়েছে বলে সে জানিয়েছিল তদন্তকারীদের। 

Advertisement

তবে শেষরক্ষা হল। তদন্ত কিছু দূর এগোনোর পরে নিবেদিতাকেই গ্রেফতার করল পুলিশ। বাবা-মাকে খুনের মূল চক্রান্তকারী সে-ই, দাবি পুলিশের।

শনিবার সকালে জয়গাছি বেলতলা এলাকায় তার বাড়ি থেকে ধরা হয় নিবেদিতা সাধুকে। শনিবার বারাসত জেলা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাকে জেল হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। নিবেদিতার স্বামী বান্টি সাধু এবং বান্টির বন্ধু অজয় দাস এখন জেল হেফাজতে। বারাসতের পুলিশ সুপার অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘‘তদন্তে নেমে আমরা জানতে পেরেছি, দম্পতি খুনের অন্যতম পরিকল্পনাকারী নিবেদিতা।’’

বাবা-মাকে কেন খুনের পরিকল্পনা করেছিল নিবেদিতা? 

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, নিবেদিতা এবং তার স্বামী বান্টির বাজারে প্রায় ৮-১০ লক্ষ টাকা ধারদেনা হয়ে গিয়েছিল। নিবেদিতা বাবা-মায়ের কাছে চাইলেও তাঁরা টাকা দিচ্ছিলেন না। তা ছাড়া, নিবেদিতা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। মা নাকি তার সন্তানকে নষ্ট করতে চাপ দিচ্ছিল বলে জানিয়েছে সে। সে কারণে বান্টি অজয়ের সঙ্গে মিলে খুনের পরিকল্পনা করে বলে জানতে পেরেছে পুলিশ। 

বান্টি, নিবেদিতা ভেবেছিল রামকৃষ্ণ ও লীলারানি সরিয়ে দিতে পারলে তাঁদের স্থাবর-অস্থাবর সমস্ত সম্পত্তি তারা কব্জা করতে পারবে। রামকৃষ্ণ ও তাঁর স্ত্রীর নামে ১৩ কাঠা জমি আছে। কাঠা প্রতি জমির মূল্য ৫ লক্ষ টাকা। ওই সম্পত্তির দিকেই চোখ ছিল বান্টি-নিবেদিতার। পরিচিত যুবক অজয়কে তারা ১০ লক্ষ টাকা দেবে বলেছিল কাজ হাসিল হলে। 

তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, বান্টি-অজয়কে জেরা করে তাঁরা আগেই খুনের ঘটনায়  নিবেদিতার যুক্ত থাকার কথা জানতে পেরেছিলেন। তা হলে গ্রেফতার করতে দেরি হল কেন? 

পুলিশ জানিয়েছে, নিবেদিতার উপরে নজর রাখা হচ্ছিল। তার বিরুদ্ধে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছিল। তা ছাড়া, নিবেদিতা অন্তঃসত্ত্বা ছিল। পুলিশ জানিয়েছে, রামকৃষ্ণ ও লীলারানি খুনের পরিকল্পনা করতে নিবেদিতা অজয়ের সঙ্গে ফোনে কয়েকবার কথা বলেছিল। অজয় কথাবার্তা  রেকর্ডিং করে রেখেছিল। অজয় ভেবেছিল, প্রতিশ্রুতি মতো ১০ লক্ষ টাকা যদি সে না পায়, তা হলে রেকর্ডিং দেখিয়ে ব্যাকমেল করবে। পুলিশ মোবাইলের সেই রেকর্ডিং হাতে পেয়েছে। তথ্য হাতে পাওয়ার পরেই নিবেদিতাকে গ্রেফতার করা হয়। পুলিশের পক্ষ থেকে আদালতের কাছে মোবাইলের ভয়েস রেকর্ডিং শনাক্ত করতে চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। 

হাবড়া থানার আইসি গৌতম মিত্র বলেন, ‘‘মোবাইলে নিবেদিতার কথাবার্তার রেকর্ডিং শুনে মনে হচ্ছে, খুনের মূল পরিকল্পনা তারই।’’ 

দম্পতি খুনের ঘটনার পরে নিবেদিতা পুলিশকে বিভ্রান্ত করতে এলাকার এক যুবকের নাম বলেছিল। নিবেদিতা দাবি করেছিল, তার কাকার মেয়ের সঙ্গে ওই যুবকের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। বোনকে নিয়ে ওই যুবক বাংলাদেশে পালিয়ে গিয়েছিল। থানায় অপহরণের অভিযোগ করা হয়েছিল। কয়েক মাস পর ওই যুবক নিবেদিতার বোনকে নিয়ে দেশে ফিরে এসে নিজের বাড়িতে স্বামী-স্ত্রী হিসাবে থাকতে শুরু করে। পরে সাংসারিক অশান্তির কারণে তরুণী বাপের বাড়ি চলে আসেন। ওই যুবক তাঁকে উক্ত্যক্ত করত, খুনের হুমকি দিত। নিবেদিতার বক্তব্য ছিল, সেই আক্রোশেই ওই যুবক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে চড়াও হয়েছিল তাদের বাড়িতে। তার মূল লক্ষ্য ছিল নিবেদিতার খুড়তুতো বোন ও তাঁর বাবা-মা। তবে সামনে পড়ে যাওয়ায় দুষ্কৃতীরা খুন করে নিবেদিতার বাবা-মাকেই।

পুলিশ ওই যুবককে গ্রেফতার করে জেরার পরে নিশ্চিত হয়, তিনি নির্দোষ। পুলিশ জানিয়েছে, আদালতকে ইতিমধ্যে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, খুনের ঘটনায় ওই যুবক যুক্ত নন। চার্জসিট থেকেও তাঁর নাম বাদ দেওয়া হবে। শীঘ্রই তিনি জামিন পেয়ে যাবেন বলে পুলিশ  কর্তাদের দাবি।

Advertisement