গঙ্গাসাগর মেলার প্রস্তুতি খতিয়ে দেখতে সোমবার দুপুরে হেলিকপ্টারে এলাকায় পৌঁছলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। প্রশাসনিক পরিদর্শনের পাশাপাশি সরকারি সভামঞ্চ থেকে তিনি গঙ্গাসাগর সেতুর শিলান্যাস করেন। একই সঙ্গে দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা জুড়ে একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাস করেন মুখ্যমন্ত্রী। কিছু প্রকল্পের ঘোষণা, উদ্বোধন হয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার জন্যও।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, মুড়িগঙ্গা নদীর উপরে চার লেনের প্রায় ৪.৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ গঙ্গাসাগর সেতু তৈরি করতে খরচ হবে আনুমানিক ১৭০০ কোটি টাকা। প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, গঙ্গাসাগর মেলা শেষ হলেই সেতু নির্মাণের কাজ শুরু হবে। এই সেতু তৈরি হলে কাকদ্বীপ ও সাগরদ্বীপের মধ্যে যাতায়াত আরও সহজ হবে বলে দাবি প্রশাসনের।
সভামঞ্চ থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, ২০১১ সালে তাঁর সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় ৩৭টি ছোট, মাঝারি ও বড় সেতু তৈরি করা হয়েছে। হাতানিয়া-দোয়ানিয়া নদীর উপরে সেতু নির্মাণের ফলে বকখালি যাতায়াত অনেক সহজ হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, তাঁর সরকারের আমলেই সাগরদ্বীপে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে। সুন্দরবন পুলিশ জেলা গঠন, তিনটি হেলিকপ্টার পরিষেবা চালু, একাধিক জেটি নির্মাণ, গঙ্গাসাগর ও কাকদ্বীপে নতুন কোস্টাল থানা তৈরির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
পর্যটনের উন্নয়নের প্রসঙ্গ টেনে মুখ্যমন্ত্রী জানান, গঙ্গাসাগরে ১০০ শয্যার ডরমেটরি তৈরি করা হয়েছে, যার নাম ‘সাগরকন্যা’। পাশাপাশি, ২০টি কটেজ নির্মাণ করা হয়েছে, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘গঙ্গান্ন’ (নবান্নের আদলে)। ক্যানিং ১ ও ক্যানিং ২ ব্লকে মাতলা নদীর উপরে ৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে আরসিসি সেতু নির্মাণ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং তার উদ্বোধনও হয়ে গিয়েছে বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী।
আমার পাড়া আমার সমাধান প্রকল্পের আওতায় দক্ষিণ ২৪ পরগনা জুড়ে হওয়া কাজের খতিয়ান তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘‘প্রায় আট হাজার কোটি টাকার এই প্রকল্পে পঞ্চায়েতের প্রতিটি বুথে ১০ লক্ষ টাকা করে বরাদ্দ করা হয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রকল্পের ৭০-৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হয়েছে।’’ সাধারণ মানুষের পরামর্শ মেনেই এই অর্থ ব্যয় করা হয়েছে বলে দাবি তাঁর।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জেলায় ২,০৬৩টি রাস্তার সংস্কার ও ১,৯০০টি নতুন রাস্তা নির্মাণের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। বিভিন্ন জেটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৬৭ কোটি ২১ লক্ষ টাকা। বিদ্যুৎ প্রকল্পে দেওয়া হয়েছে ৫৪ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা। ‘আমার পাড়া আমার সমাধান’ প্রকল্পের অধীনে আলোর জন্য বরাদ্দ ৬১ কোটি টাকা। জেলায় ১,৪১৫টি নিকাশি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। পানীয় জল প্রকল্পেও বরাদ্দ হয়েছে অর্থ। শুধু সাগর ব্লকেই পানীয় জলের জন্য ৭ কোটি ৪৯ লক্ষ টাকা এবং নিকাশি প্রকল্পে ৬ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
এ দিন জেলা জুড়ে ৯৬টি প্রকল্পের উদ্বোধন করেন মুখ্যমন্ত্রী, যার আনুমানিক ব্যয় ৩৯৪ কোটি ৯৩ লক্ষ টাকা। পাশাপাশি, ৭০টি প্রকল্পের শিলান্যাস হয়েছে, যার আনুমানিক ব্যয় ১,৯২৯ কোটি ৩৭ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনার অশোকনগর-কল্যাণগড় পুরসভার ১৫ ও ২২ নম্বর ওয়ার্ডে সিদ্ধেশ্বরী কালীমন্দির কালভার্ট থেকে বিদ্যাধরী খাল পর্যন্ত হাই ড্রেন নির্মাণ, যার আনুমানিক ব্যয় প্রায় ৬ কোটি টাকা।
সেতু, নিকাশি নালা, পানীয় জল, স্কুলে অতিরিক্ত শ্রেণিকক্ষ ও ল্যাবরেটরি, বাস টার্মিনাল, কমিউনিটি হল, রাস্তার আলো, টয়লেট, ঢালাই রাস্তা, জেটি, বিদ্যুৎ সাব-স্টেশন, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র উন্নয়ন সব মিলিয়ে জেলা জুড়ে একাধিক প্রকল্পের উদ্বোধন ও শিলান্যাসের মধ্যে দিয়ে উন্নয়নের কথাই ফের এক বার তুলে ধরলেন মুখ্যমন্ত্রী।
স্থানীয় বিজেপি নেতা অরুণাভ দাস বলেন, ‘‘ভোটের আগে জেলা জুড়ে একাধিক প্রকল্পের শিলান্যাস ও উদ্বোধন আসলে লোক দেখানো। প্রতি বছর গঙ্গাসাগর মেলার আগে বড় বড় ঘোষণা করা হলেও বহু প্রকল্প সময় মতো শেষ হয় না। মানুষের আর প্রতিশ্রুতি নয়, কাজের হিসাব চাইছে।’’
সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী বঙ্কিম হাজরার প্রতিক্রিয়া, ‘‘উন্নয়ন কোনও ভোটমুখী কর্মসূচি নয়, এটি মুখ্যমন্ত্রীর ধারাবাহিক কাজের ফল। সেতু, রাস্তা, পানীয় জল থেকে পর্যটন সব ক্ষেত্রেই দক্ষিণ ২৪ পরগনায় বাস্তব উন্নয়ন হয়েছে, যা মানুষ নিজের চোখেই দেখছেন। বিরোধীদের ভাঁওতাবাজি কথায় সাধারণ মানুষ আর বিশ্বাস রাখেন না। মানুষের ভরসা উন্নয়নেই।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)