পেট্রল-ডিজেলের ঊর্ধ্বমুখী দামের প্রভাব পড়ছে সর্বত্র। এই পরিস্থিতিতে সস্তার ‘কাটা তেল’-এর রমরমা দুই ২৪ পরগনার নানা প্রান্তে। তার জেরে আবার বেড়ে চলেছে পরিবেেশ দূষণ। খোঁজ নিল আনন্দবাজার
ঘটকপুকুরের ঘিঞ্জি বাজারের মধ্যে একটি কাটা তেলের গোডাউনে আগুন লাগে গত ১৯ ডিসেম্বর। আগুন আশপাশের দোকানেও ছড়িয়ে পড়ে। এক হোটেল মালিক-সহ দুই কর্মচারীর মৃত্যু হয়েছিল।
তারপর থেকে প্রশাসনের কড়াকড়িতে দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল কাটা তেলের কারবার। স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, প্রশাসনের নজরদারি কমতে থাকায় ফের বেড়েছে কাটা তেলের কারবার।
ভাঙড় ১, ২ ব্লকের মানুষের যাতায়াতের মূল ভরসা অটো, ট্রেকার, ছোট গাড়ি ও ইঞ্জিন ভ্যান। তা ছাড়া, ওই সমস্ত ব্লক এলাকায় প্রচুর পরিমাণে ধান ও আনাজের চাষ হয়। বিশেষ করে গরমের বোরো ধান চাষ হয় সেচের ও ভূগর্ভস্থ জলে। ভূগর্ভস্থ জল তোলার জন্য ব্যবহার করা হয় শ্যালো মেশিন। ভাঙড়, জীবনতলা-সহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ওই সমস্ত শ্যালো মেশিনে ডিজেলের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে কাটা তেলে। গ্রামীণ এলাকায় যে সমস্ত অটো, ইঞ্জিন ভ্যান চলে, তারও অধিকাংশ কাটা তেলে চলছে বলে অভিযোগ।
ভাঙড়ের বিজয়গঞ্জ বাজার, কাঁঠালিয়া, শোনপুর, পোলেরহাট নলমুড়ি, বড়ালিঘাট-সহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার ধারে বিভিন্ন সাইজের বোতলে কাটা তেল ভরে সাজিয়ে রাখা হয়। মুদিখানার দোকান, স্টেশনারি দোকানেও মেলে কাটা তেল।
অভিযোগ, সরকারি নীল কেরোসিন ডিলারদের থেকে ঘুরপথে খোলা বাজারে চলে আসছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ওই কেরোসিন তেলের সঙ্গে রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি করে কাটা তেল।
ভাঙড়ের পানাপুকুর গ্রামের চাষি রমজান মোল্লা নিজের জমিতে শ্যালো মেশিন বসিয়েছেন। ভূগর্ভস্থ জল তুলে তিনি মাঠের অন্য চাষিদেরও বিক্রি করেন। প্রতি ঘণ্টায় চাষিদের থেকে নেন ১২০ টাকা। ১ ঘণ্টা শ্যালো মেশিন চালাতে তাঁর ১ লিটার ডিজেল পোড়ে। বর্তমানে এক লিটার ডিজেলের দাম ৯২ টাকার আশেপাশে ঘোরাফেরা করছে। এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে ৭০-৭৫ টাকায় কাটা তেল দিয়ে শ্যালো মেশিন চালালে তাঁর লাভ থাকছে বেশি। রমজান বলেন, ‘‘যে ভাবে পেট্রল-ডিজেলের দাম বাড়ছে, তাতে চাষের খরচ অনেক বেড়ে গিয়েছে। যে কারণে শ্যালো মেশিন ডিজেলের পরিবর্তে কাটা তেলে চালাচ্ছি। তাতে কিছু সাশ্রয় হচ্ছে।’’
পোলেরহাটের অটো চালক সন্দীপ মণ্ডল বলেন, ‘‘এক লিটার ডিজেলে ২৫-২৮ কিলোমিটার অটো চলে। যে ভাবে ডিজেলের দাম বাড়ছে, তাতে অটো চালিয়ে খরচ পোষাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে কাটা তেল ব্যবহার করছি। এর ফলে কিছু লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে।’’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কাটা তেল ব্যবসায়ী জানালেন, রেশন ডিলাররাই ঘুরপথে তাঁদের কাছে কেরোসিন তেল বিক্রি করছেন। যার সঙ্গে রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে কাটা তেল। অভিযোগ অস্বীকার করে ভাঙড় ২ ব্লকের কেরোসিন ডিলার ডিলার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুছা হক মোল্লা বলেন, ‘‘অনেক গ্রাহক আছেন, যাঁরা রেশনে থেকে কেরোসিন তুলে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেন। কিছু ক্ষেত্রে ডিলাররা অতিরিক্ত তেল খোলাবাজারে বিক্রি করে দিতেন। তবে প্রশাসনের কড়াকড়ি এবং আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাঁদের সাবধান করে দিয়েছি। যাতে খোলাবাজারে সরকারি কেরোসিন তেল বিক্রি না হয়।’’
এ বিষয়ে জেলার পুলিশ সুপার বৈভব তিওয়ারি বলেন, ‘‘আমরা এ ধরনের বেআইনি কারবারকে সমর্থন করি না। বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছি। আমরা খোঁজ নিয়ে দেখছি, কোন কোন এলাকায় এ ধরনের কারবার চলছে। অবিলম্বে তার বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপ গ্রহণ করব।’’
পরিবেশের উপরে কাটা তেলের কুপ্রভাব নিয়ে বরাবরই সতর্ক করে আসছেন পরিবেশবিদরা। কিন্তু কে শুনছে সে কথা! পরিবেশবিদ বিশ্বজিৎ মুখোপাধ্যায় জানান, অতীতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও পরিবেশ আদালতে জানানো হয়েছিল। তাঁর মতে, প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এবং সুন্দরবনের বহু প্রান্তে ধারেকাছে পেট্রল পাম্প না থাকায় অনেকে বাধ্য হয়ে কাটা তেল ব্যবহার করেন। সরকারের উচিত, প্রশাসনিক ভাবে ওই সব এলাকায় ভর্তুকি দিয়ে পেট্রোপণ্য পৌঁছে দেওয়া।