ছোট থেকে যে মেয়ে সাত চড়ে রা কাড়ত না, সে-ই কিনা স্বামীর গলা কোদালের কোপে প্রায় নামিয়ে দিয়েছে?
এখনও যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না অনিমা পালের পরিবার-পরিজন। ফলতার বঙ্গনগর গ্রামের ওই বধূ অবশ্য নিজেই পুলিশের কাছে গিয়ে ধরা দিয়েছেন। কবুল করেছেন খুনের কথা।
তিন বোনের মেজো অনিমা। বাবা মারা যান ছোটবেলায়। পড়াশোনা বেশি দূর এগোয়নি তাঁর। বছর পনেরো আগে প্রতিবেশী যুবক, পেশায় প্লাইউড কারখানার শ্রমিক দিব্যেন্দু পালের প্রেমে পড়েন অনিমা। দুই বাড়ির অমতে লুকিয়ে বিয়েটাও সেরে ফেলেন। পরে ছেলের বৌকে শ্বশুরবাড়িতে মেনে নিলেও বাপের বাড়ির লোকজন আর সম্পর্ক রাখেননি। শ্বশুরবাড়়ি থেকে ঢিল ছোড়া দূরত্বে মা-বোনেরা থাকলেও কথাবার্তা হতো না অনিমার সঙ্গে। সামনে পড়ে গেলে মুখ ঘুরিয়ে চলে যেতেন দু’পক্ষই।
অনিমার বছর বারোর ছেলে সুমন পড়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে। মেয়ে সুমনা চতুর্থ শ্রেণির ছাত্রী। স্বামীর আয়ে সংসার ভালই চলত। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, সংসারে তেমন অশান্তি তাঁরা দেখেননি এই সে দিন পর্যন্ত।
কিন্তু মাস আটেক আগে থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে।
স্বামী দ্বিতীয় বার বিয়ে করে। দ্বিতীয় স্ত্রীকে নিয়ে থাকতে শুরু করে কাছেই প্রতিভা নগর গ্রামের ভাড়া বাড়িতে। তবে অনিমাদেবীর সঙ্গে যোগাযোগ ছিল। কয়েক মাস আগে ওই যুবকের বাবা-মা কমল ও মীরা পালের মধ্যস্থতায় দ্বিতীয় বৌকে নিজের ঘরেই এনে তোলেন দিব্যেন্দু। পাশাপাশি ঘরে থাকতে শুরু করেন অনিমা ও তাঁর সতীন।
কিন্তু সংসারে শান্তি উধাও হতে শুরু করে। প্রতিবেশীরা জানান, প্রায় প্রতিদিনই স্বামীর সঙ্গে এক রকম মারপিট বাধত অনিমার। তাঁকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টাও করে দিব্যেন্দু।
অনিমার মা নমিতা বেরা বিড়ি শ্রমিক। শনিবার প্রতিবেশীর বারান্দায় বসে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, ‘‘কী রকম শান্তশিষ্ট ছিল আমার মেজো মেয়েটা। হয় তো সম্পর্ক খারাপ হয়েছিল আমার সঙ্গে, কিন্তু নিজের পেটে তো ধরেছি। তাই বলছি, ও কোনও দিন নিজের বোনেদের সঙ্গেও গলা তুলে কথা বলেনি। তার মানে কত কষ্ট পেয়ে হয় তো এমন কাণ্ড ঘটিয়ে বসেছে, ভাবতে পারছি না।’’ মায়ের আক্ষেপ, ‘‘হয় তো যোগাযোগ থাকলে আমাকে নিজের কষ্টের কথা বলে একটু হালকা হতে পারত।’’
অনিমা পুলিশকে জানিয়েছেন, স্বামীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়েই তিনি এমন চরম সিদ্ধান্ত নেন। সতীনকে পাশের ঘরে এনে তোলার অপমানটাও আর হজম করতে পারছিলেন না। শনিবার ডায়মন্ড হারবার আদালতে তোলা হলে বিচারক অনিমাকে সাত দিন পুলিশি হেফাজতে রাখার নির্দেশ দিয়েছেন।
ঘটনার এটা যদি একটা দিক হয়, তা হলে অন্য দিকে আছেন দিব্যেন্দুর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী। পুলিশ কথা বলেছে তাঁর সঙ্গেও।
তরুণী মালদহের বাসিন্দা। ২০১৫ সালে মোবাইলে মিসড কলের সূত্রে দিব্যেন্দুর সঙ্গে তাঁর আলাপ হয়। ওই বছরের মাঝামাঝি তরুণীর নিজেদের সম্প্রদায়ের সভা উপলক্ষে কলকাতায় আসেন। দিব্যেন্দুও হাজির হয় সেখানে। নিজেকে অবিবাহিত বলে পরিচয় দিয়েছিল সে।
এরপরে কিছু দিন ফোনে প্রেমালাপ চলার পরে এক সময়ে মেয়েটিকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়ে কলকাতায় ডেকে আনে দিব্যেন্দু। কালীঘাটে গিয়ে বিয়েও করে। বাসা ভাড়া নেয় ফলতায়। বছর কুড়ির ওই বধূ কাঁদতে কাঁদতে এ দিন বলেন, ‘‘আমার পরিবারের কেউ বিয়েটা মেনে নেয়নি। বাবা-মায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। এই অবস্থায় আমি এখন কী করব!’’ তিনি জানান, বিয়ের কিছু দিন পরে জানতে পারেন, স্বামীর প্রথম পক্ষের স্ত্রী আছে। তাঁর দাবি, এ কথা জানতে পেরে বাপের বাড়ি ফিরে যেতে চেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দিব্যেন্দু তাঁকে ছাড়তে চায়নি।
তরুণী জানান, শুক্রবার খুনের সময়ে তিনি পাশের ঘরেই ছিলেন। কিন্তু কিচ্ছুটি টের পাননি।