E-Paper

দুই স্কুলছুটকে শিক্ষার আলোয় আনলেন সঞ্জীব

টাপুরের লেখাপড়া শুরু হয় আবার। স্থানীয় দক্ষিণ নাংলা বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করান সঞ্জীব। একই সঙ্গে এক টাকার পাঠশালায় পাঠ নিচ্ছে সে।

সীমান্ত মৈত্র  

শেষ আপডেট: ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০০:৪৭
সঞ্জীব কাঞ্জিলাল।

সঞ্জীব কাঞ্জিলাল।

দারিদ্র্যের ঘেরাটোপে আটকে থাকা বহু শিশুর জীবনে পড়াশোনা যেখানে কেবল স্বপ্ন, সেখানেই ব্যতিক্রমী উদাহরণ তৈরি করছে হাবড়ার টুনিঘাটা এলাকার একটি ছোট উদ্যোগ— ‘এক টাকার পাঠশালা’। এই পাঠশালাই নতুন দিশা দেখিয়েছে স্কুলছুট কিশোরী টাপুর বিশ্বাস ও কিশোর শিবা সর্দারের মতো অনেকের জীবনে।

টুনিঘাটার নাংলা বিলের প্রান্তে টিনে মোড়া ছোট ঘরে বড় হয়েছে টাপুর। সংসারের অভাব এতটাই ছিল, যে ছোট থেকেই কখনও মাছ ধরেছে, কখনও বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাসন মেজেছে, আবার কখনও প্লাস্টিকের খেলনা তৈরির কাজে হাত লাগিয়েছে। টাপুরের মা সরলা গৃহসহায়িকার কাজ করেন। বাবা বিমল দিনমজুর। অনিশ্চিত রোজগারের সংসারে পড়াশোনা হয়ে উঠেছিল বিলাসিতা। বর্ষার রাতে চাল চুঁইয়ে পড়া জলের মধ্যে বসে টাপুর ভাবত— তার মতো মেয়েদের জন্য কি আদৌ স্কুলে ফেরার রাস্তা খোলা থাকে?

এই প্রশ্নের উত্তর হয়ে ওঠেন গ্রামেরই যুবক সঞ্জীব কাঞ্জিলাল। পেশায় নাবিক হলেও সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই তিনি শুরু করেন ‘এক টাকার পাঠশালা’। উদ্দেশ্য— স্কুলছুট, শ্রমিকের কাজ করতে থাকা শিশুদের আবার শিক্ষার আলোয় ফিরিয়ে আনা। তিনি ও তাঁর সহযোগীরা কার্যত পকেটের টাকা খরচ করে বিনামূল্যে পড়ান, জোগান প্রয়োজনীয় শিক্ষাসামগ্রী। প্রথম থেকে নবম শ্রেণির গরিব পরিবারের ছেলেমেয়েদের এখানে নিখরচায় পড়ানো হয়। সঞ্জীবই তাকে বই, খাতা, কলম, ব্যাগ দেন। টাপুরের লেখাপড়া শুরু হয় আবার। স্থানীয় দক্ষিণ নাংলা বালিকা বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করান সঞ্জীব। একই সঙ্গে এক টাকার পাঠশালায় পাঠ নিচ্ছে সে।

একই পাঠশালার আর এক লড়াইয়ের নাম শিবা। পাড়ুইপাড়ার এই কিশোরের এক সময়ে স্কুলের খাতায় নাম থাকলেও নিয়মিত স্কুলে যেত না। হাতে ছিপ, চোখে নদীর দিগন্ত— মাছ ধরাই ছিল তার সারা দিনের কাজ। বাবা কর্মসূত্রে বাইরে, মা ছেলের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা করতেন। সেই শিবাকে পাঠশালায় টেনে আনেন সঞ্জীব। শিবা আবার পড়াশোনায় ফিরলেও সঞ্জীব সমুদ্রে নাবিকের কাজে চলে গেলে ফের ফাঁকি শুরু হত শিবার। জানতে পেরে বাড়ি ফিরেই মধ্যরাতে শিবার বাড়িতে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন শিক্ষানুরাগী মানুষটি। কথায় জাদুতেই শিবার ভরসার পাত্র হন সঞ্জীব। সেই রাতেই আবার শুরু হয় নতুন অধ্যায়। অল্প দিনের মধ্যেই শিবা ফের স্কুলে ভর্তি হয়। সে এখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ছে।

‘এক টাকার পাঠশালা’য় পড়ার পাশাপাশি টাপুর এবং শিবা দু'জনেই স্কুলে যাচ্ছে। শিবা ও টাপুর পড়ে, লেখে, আর ভবিষ্যৎ নিয়ে স্বপ্ন দেখে। টাপুর বলে, “আমি কখনও ভাবিনি আবার স্কুলে যেতে পারব। সঞ্জীবকাকু পাশে না থাকলে আজ আর লেখাপড়া হত না।’’ টাপুরের মা সরলা বলেন, “আমরা গরিব মানুষ। উনি না থাকলে মেয়েটার লেখাপড়া হত না।’’ শিবার কথায়, “অনেকে কথা দেয়, কিন্তু সবাই থাকে না। সঞ্জীবকাকু ছিলেন বলেই আমি আবার মানুষ হওয়ার স্বপ্ন দেখছি।” সঞ্জীব বলেন, “শিশুদের শুধু একটু সময় আর বিশ্বাস দরকার। বাকিটা ওরাই করে নেয়।”

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Habra

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy