Advertisement
০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৩
মিনাখাঁয় সিলিকোসিসে আক্রান্ত বহু

‘কেমন ভাবে বাঁচি, ফিরে দেখে না কেউ’

সিলিকোসিসে আক্রান্ত মিনাঁখার মানুষ তাই ভোট নিয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহী নন। উৎসাহ তো দূরের কথা, সকলেই ভোট নিয়ে উদাসীন।

ভোটের উত্তাপ পৌঁছয়নি গ্রামে। নিজস্ব চিত্র

ভোটের উত্তাপ পৌঁছয়নি গ্রামে। নিজস্ব চিত্র

নির্মল বসু
মিনাখাঁ শেষ আপডেট: ০৯ এপ্রিল ২০১৯ ০৪:৩৯
Share: Save:

প্রতিশ্রুতি পেয়েছেন অঢেল। সাহায্য পাননি কার্যত ছিটেফোঁটাও।

Advertisement

সিলিকোসিসে আক্রান্ত মিনাঁখার মানুষ তাই ভোট নিয়ে বিন্দুমাত্র উৎসাহী নন। উৎসাহ তো দূরের কথা, সকলেই ভোট নিয়ে উদাসীন।

উদাসীনতার এই চেহারাটা রাস্তাঘাটেও স্পষ্ট। এই সর্বব্যাপী ভোট-আবহে এলাকার কয়েকটি গ্রামে কোনও রাজনৈতিক দলের দেওয়াল লিখনই নেই। রাস্তার পাশে উড়তে দেখা যাচ্ছে না কোনও ঝান্ডা। সুনসান রাস্তার পাশে কেবল একটাই হোর্ডিং— যাতে নানা দাবিদাওয়ার কথা লেখা সিলিকোসিস আক্রান্ত সংগ্রামী শ্রমিক কমিটির পক্ষে।

মিনাখাঁর ধুতুরদহ পঞ্চায়েতের দেবীতলা, গোয়ালদহ, ধুতুরদহ গ্রামের শতাধিক সিলিকোসিসে আক্রান্ত পরিবারের মানুষ। সিলিকোসিসে একের পর এক মৃত্যু হয়েছে। কোনও পরিবার সরকারি ক্ষতিপূরণ পেয়েছে, বেশির ভাগই পায়নি। প্রতি ভোটেই প্রতিশ্রুতি মেলে। কিন্তু হাতে আসে না কিছুই। প্রশাসনের অবশ্য দাবি, সিলিকোসিসে মৃত ৯ জনের পরিবার এককালীন ৪ লক্ষ টাকা করে সরকারি সাহায্য পেয়েছে।

Advertisement

আয়লায় মিনাখাঁ ব্লকের অধিকাংশ জমি নোনা জলে প্লাবিত হওয়ায় চাষের কাজে ভাটা আসে। তখন কাজের খোঁজে গ্রামের বহু যুবক আসানসোলের পাথর খাদানে চলে যান। ২০১১ সালে কয়েকজন অসুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরেন। তাঁদের টিবি হয়েছে মনে হলেও গোয়ালদহের বাসিন্দা হোসেন মোল্লার মৃত্যুর পরে জানা যায়, সিলিকোসিসে আক্রান্ত হয়েছেন সকলে। ২০১২ সালের অগস্ট মাসে মারা যান হোসেন। হোসেনের স্ত্রী খাদিজা বিবি বলেন, ‘‘স্বামীর মৃত্যুর পরে সরকার থেকে ৪ লক্ষ টাকা পেয়েছিলাম। তাতে কোনও রকমে সংসার চলছে।’’

সিলিকোসিসে আক্রান্তদের নিয়ে কাজ করা স্থানীয় সহিদুল পাইক, রিয়াজুল পাইক, শহিদুল মোল্লার দাবি, সিলিকোসিসে ইতিমধ্যে ২৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। তিনটি গ্রামে ২৩০ জন এই রোগে আক্রান্ত। ক’দিন আগে গোয়ালদহে মারা গিয়েছেন সালাউদ্দিন মোল্লা। মৃতের স্ত্রী আনোয়ারা বিবি তিন সন্তানকে নিয়ে দরমার ভাঙাচোরা ঘরে কোনও রকমে থাকেন। রোজগেরে মানুষটার মৃত্যুর পরে সন্তানদের নিয়ে দুরবস্থায় পড়তে হয়েছে তাঁকে। ভোটের কথা শুনে একরাশ ক্ষোভ উগরে দিয়ে আনোয়ারা বলেন, ‘‘ভোট দিয়ে কী হবে? স্বামী অসুস্থ হওয়ার পরে প্রতিশ্রুতি পেয়েছি ঠিকই, কোনও নেতাকে তো পাশে পাইনি! সন্তানদের নিয়ে কী ভাবে বাঁচব এখন, কেউ খোঁজ রাখে?’’

সালাউদ্দিনের ভাই নাসিরউদ্দিনও অসুস্থ। তাঁর কথায়, ‘‘তিন বেলা ওষুধ খেতে যে টাকা লাগে, তা পাব কোথা থেকে? তাই এক বেলাই ওষুধ খাই। টাকার অভাবে ইনহেলার কিনতে পারিনি। শ্বাসকষ্টে ভুগতে হয়।’’ ভোট দেওয়ার কথা শুনে জোরে টানা শ্বাসের সঙ্গে করুণ হাসি মিশিয়ে নাসিরউদ্দিন বলেন, ‘‘আমাদের জন্য কারও সহানুভূতি নেই। উদ্বেগও নেই। ভোট দিয়ে কী হবে?’’ এই রোগেই দুই দেওর মারা গিয়েছেন বলে দাবি হাসিনা বিবির। ভোটের কথা শুনে ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। হাসিনার কথায়, ‘‘ভোটের আগে নেতারা গ্রামে আসেন। চাল-চিঁড়ে, আটা, কাপড় দেন। যদিও প্রয়োজনের তুলনায় তা সামান্য।’’ এর পরেই তাঁর গলা সপ্তমে ওঠে। বলেন, ‘‘কিন্তু ও সব দিয়ে কী হবে? অক্সিজেন সিলিন্ডার বা চিকিৎসার খরচ দিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ানোর লোক কই? ভোট দেব কেন? কেমন ভাবে বেঁচে আছি, ফিরেও তো দেখে না কেউ।’’

একই রোগে কয়েক মাস আগে মারা গিয়েছেন নূর হোসেন মল্লিক। তাঁর দাদা রহমান আলি মোল্লাও আক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘‘গ্রামে একের পর এক মৃত্যু দেখেও দেখেন না নেতারা।’’

আক্রান্তদের পরিবারের কথায়, ‘‘নেতাদের থেকে বেশি খোঁজ নেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তবে প্রয়োজনের তুলনায় সংখ্যায় অনেক কম তাঁরা। কিন্তু ওঁরাই অসুস্থদের পরিবারের জন্য সাধ্যমতো সাহায্য নিয়ে পাশে দাঁড়ান।’’

সিলিকোসিসে মৃত বিশ্ব মণ্ডল, বিশ্বজিৎ মণ্ডল, আবুল পাইক, জাকির পাইক-সহ ৯ জনের পরিবার সরকারি টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছে। তারা কিছুটা সন্তুষ্ট হলেও অকালমৃত্যুর শোকে ভোট নিয়ে কোনও উৎসাহই নেই গ্রামে। রমজান পাইক ও মর্জিনা বিবির দু’ছেলের মৃত্যু হয়েছে মারণরোগে। তাঁদের কথায়, ‘‘আমাদের কাছে সব দলই সমান। জোর না করলে কোনও দলকেই ভোট দেওয়ার ইচ্ছা নেই।’’

(সবচেয়ে আগে সব খবর, ঠিক খবর, প্রতি মুহূর্তে। ফলো করুন আমাদের Google News, Twitter এবং Instagram পেজ)
Follow us on: Save:
Advertisement
Advertisement

Share this article

CLOSE
Popup Close
Something isn't right! Please refresh.