ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরেই নানা ভাবে সমৃদ্ধ হয়েছে রায়দিঘি। যার পিছনে বরাবরই ভূমিকা ছিল নদীপথের।
প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিকদের মতে আদিগঙ্গার শাখানদীর তীরে বিভিন্ন শতকে গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট নদী বন্দর। আর এই বন্দরগুলিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ভাবে গড়ে উঠেছিল নগর, সমৃদ্ধ জনপদ ও বাণিজ্য কেন্দ্র। আদিগঙ্গার ছোট শাখা নদী মণি নদীর তীরে অবস্থিত রায়দিঘিও নৌপথে বাণিজ্যের সুবাদেই এখনও সুন্দরবন এলাকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। আদিগঙ্গার ধারা শুকিয়ে যাওয়ার পরেও মণি নদী তার নাব্যতা ধরে রেখেছে মূলত ঠাকুরান ও মৃদঙ্গভাঙা নদীর জোয়ারের জলে।
মণি নদীর তীরে কঙ্কনদিঘি ও গোরাগাছিতে পাওয়া গিয়েছে খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের ‘কাস্ট কয়েন’ ও খ্রিষ্টীয় প্রথম শতকের কুষাণরাজ কদফিসের ছবি-সহ মুদ্রা। পাওয়া গিয়েছে নৌকো আঁকা কুষাণ যুগের সিলমোহর। প্রত্নবস্তু ও ঐতিহাসিক বিভিন্ন দলিল থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গবেষকদের সিদ্ধান্ত, নবম ও দশম শতক থেকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দ্বীপগুলির বৌদ্ধ সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের যোগাযোগের অন্যতম স্থান ছিল আদিগঙ্গার তীরবর্তী এই অববাহিকা অঞ্চল। জানা যায়, রায়দিঘি থেকে মাত্র ছ’কিলোমিটার দূরে খাড়িতে ছিল নদীবন্দর। মধ্যযুগের এই নদী পথে বাণিজ্যের চিত্র পাওয়া যায় বিভিন্ন মঙ্গলকাব্যে সওদাগরদের বাণিজ্যযাত্রার অভিযানের আখ্যানেও। জেলার প্রত্নগবেষক দেবীশঙ্কর মিদ্যা বলেন, “গয়নার কাজে ব্যবহৃত বৈচিত্রপূর্ণ রঙিন পাথর ও পুঁতি এই এলাকায় এত পরিমাণে পাওয়া গিয়েছে যে, ধারণা করা যায় দক্ষ কারিগর ও শ্রমিকদের দিয়ে এই এলাকার সঙ্গে রীতিমতো সমৃদ্ধ বাণিজ্য হতো।
প্রাচীন ছত্রভোগের অন্তর্গত কাশীনগর এলাকায় সুতার বাগ নদী ও সাহেবের খালপথের মাধ্যমে মাইবিবির হাটের উত্থান ঘটে অষ্টাদশ শতকের গোড়ায়। উনবিংশ শতকের গোড়ায় গুরুত্ব বাড়তে থাকে রায়দিঘির। জলপথের নাব্যতা কমে যাওয়ায় গুরুত্ব হারাতে থাকে কাশীনগর। অন্য দিকে, ব্রিটিশ আমলে কলকাতার সঙ্গে সড়কপথে যুক্ত হয় রায়দিঘি।
প্রথম দিকে ‘মৎস্যঘাঁটি’ হিসাবে রায়দিঘির পরিচিতি পেলেও পরে সার্বিক স্থানীয় বাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে এলাকার শ্রীবৃদ্ধি ঘটে। পাথরপ্রতিমা, জয়নগর ২ ও কুলতলি ব্লকের একাংশ এখনও প্রাত্যহিক ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে রায়দিঘির উপরেই নির্ভরশীল। বর্তমানে রায়দিঘির আটটি জেটিঘাটে দিনভর আনাগোনা ট্রলার, নৌকো, ভুটভুটির। মালপত্র পরিবহণের পাশাপাশি যাত্রী পরিবহণও চলে দিনভর। নিত্য প্রয়োজন ছাড়াও দ্বীপাঞ্চলগুলিতে ব্যবসার জন্য রায়দিঘির পাইকারি বাজার ব্যবহার করেন তাঁরা। মূলত মাছ, ধান ও সব্জির প্রধান কেনাবেচার কেন্দ্র রায়দিঘি। তবে বৈদ্যুতিক ও ইলেকট্রনিক্স সরঞ্জাম, বস্ত্র, ভূষিমাল ও মনোহারি দ্রব্যেরও বড় বাজার হয়ে উঠেছে এই এলাকা। আবার ব্যবসার ক্ষেত্রে রায়দিঘির উপরে নির্ভরশীল দ্বীপাঞ্চল এলাকাগুলি রাস্তা ও সেতুর মাধ্যমে উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার সুফল পাওয়ায় নদীপথে বাণিজ্য কিছুটা হলেও কমছে।
দক্ষিণ সুন্দরবন মৎস্যজীবী ও মৎস্য কর্মচারী সংগঠনের রায়দিঘি শাখার সহ সম্পাদক হারাধন ময়রা জানান একশোটি ট্রলার, প্রায় আড়াইশো নৌকো ও বাইশটি যাত্রীবাহী ভুটভুটি রায়দিঘিকে কেন্দ্র করে ব্যবসার কাজে যুক্ত। প্রতিদিন তাঁদের মাধ্যমে গড়ে ৫০ লক্ষ টাকার মাছের ব্যবসা চলে।
তবে বাণিজ্যের এমন গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও সরকারি ভাবে পরিকাঠামো তেমন গড়ে তোলা হয়নি। রায়দিঘিতে মাছের জন্য কোনও হিমঘর না থাকায় অপেক্ষাকৃত অল্প দামে মৎস্যজীবীদের মাছ বিক্রি করে দিতে হয়। ফলে লাভ কমছে। সরকারি ভাবে কোনও বরফকলও নেই। ফলে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়ার পথে ব্যক্তি মালিকানার বরফকলগুলি থেকে চড়া দামে বরফ কিনতে হয়। নেই মৎস্যজীবীদের জন্য ভর্তুকিযুক্ত সরকারি ডিজেল পাম্প। হারাধনবাবু জানান, এখানে সরকারি ভাবে কোনও ‘ড্রাই ডক’ তৈরি না হওয়ায় সমস্যা হয়।
মৎস্য শ্রমিকরা জানালেন, দীর্ঘদিন পরে তাঁরা নোনা জল থেকে ডাঙায় উঠে এলেও রায়দিঘিতে এসে ফের নোনা জলেই স্নান করতে হয়। কারণ এখানে মিষ্টি জলে স্নানের কোনও ব্যবস্থা নেই। সমস্যা শৌচাগারের ক্ষেত্রেও। ফিস প্রসেসিং ও শুটকি মাছ তৈরির কেন্দ্রও সরকারি ভাবে গড়ে তোলা হয়নি। উন্নত জেটি-সহ আরও কিছু সমস্যা মেটানোর দাবি তুলেছেন মৎস্যজীবীরা।
অন্য দিকে, রায়দিঘি বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক বুদ্ধেশ্বর হালদার জানান, প্রথমে নদীতীরে পরিকল্পিত বাজার গড়ে উঠলেও পরে তা ঘিঞ্জি হয়ে যায়। আটটি ওয়ার্ডে বিভক্ত বাজার এলাকায় কয়েক হাজার দোকান রয়েছে। অভিযোগ, বাজার এলাকায় সরকারি ভাবে উন্নয়ন হয়নি বললেই চলে। ব্যবসায়ী সমিতির পক্ষ থেকেই মূলত রাস্তা, পানীয় জল, শৌচাগার, পথবাতি, নিকাশি ইত্যাদির ব্যবস্থা করা হয়। বাজারকে জঞ্জালমুক্ত করার ব্যবস্থা আজও না হওয়ায় নদীর পাড়েই তা ফেলা হয়। ফলে নাব্যতা কমছে নদীর। বাজার এলাকায় নর্দমা না থাকায় বর্ষায় আবর্জনাযুক্ত জলেই কেনাবেচা চলে। ছড়ায় দূষণ। এলাকায় উন্নতমানের প্রচুর পরিমাণ সব্জি উৎপাদন হলেও তা মজুত রাখার জন্য কোনোও হিমঘর নেই। প্রতিদিন হাজার হাজার কুইন্ট্যাল সব্জি কলকাতা-সহ বিভিন্ন জায়গায় রফতানি করেও চাষিরা কাঙ্ক্ষিত লাভ পান না। তিনি বলেন, “রায়দিঘিতে ব্যবসা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেলেও পরিকাঠামোর উন্নয়নে জোর দিচ্ছে না প্রশাসন। রাস্তা দখল করে বাড়ছে দোকান। মণি নদীর চরে পড়ে থাকা একরের পর একর জমিতে পরিকল্পির বাজার, মাছ ও সব্জির জন্য হিমঘর, উন্নতমানের জেটি ইত্যাদি তৈরির জন্য প্রশাসনের কাছে বারবার দরবার করেও লাভ হয়নি। ফলে ব্যবসা কেন্দ্র হিসাবে রায়দিঘির উন্নয়ন ধাক্কা খাচ্ছে।”
সুন্দরবন উন্নয়ন পর্ষদ সূত্রে জানা গিয়েছে, কয়েক বছর আগে রায়দিঘিতে যানবাহন ও দোকানপাটের জট কাটাতে পরিকল্পিত বাজার ও বাসস্ট্যান্ড তৈরির একটি প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছিল। কিন্তু এক শ্রেণির ব্যবসায়ীর বাধা ও রাজনৈতিক জটে তা বন্ধ হয়ে রয়েছে। স্থানীয় ভাবে প্রস্তাবগুলি পর্ষদের বিবেচনাধীন। সুন্দরবন উন্নয়ন মন্ত্রী মন্টুরাম পাখিরা বলেন, “হিমঘর, মাছ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র এবং ড্রাই ডক নিয়ে মৎস্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা হয়েছে। এগুলি গড়ার ব্যাপারে মৎস্য দফতরেরও পরিকল্পনা আছে। বাকি বিষয়গুলি নিয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও ব্যবসায়ী সমিতির সঙ্গে আলোচনা চলছে।”
(চলবে)