পদত্যাগ করলেন রাজ্যের আরও এক কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। এ বার বসিরহাট কলেজ। মাস দু’য়েক আগেই ঘাটাল শতবার্ষিকী মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষও পদত্যাগ করেছিলেন। তারও আগে তৃণমূলের শাসন কালে রাজ্যের একাধিক কলেজের অধ্যক্ষ, ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষেরা পদত্যাগ করেছেন। সব ক্ষেত্রেই তাঁরা ‘ব্যক্তিগত কারণ’ বা ‘শারীরিক অসুস্থতা’র কথা উল্লেখ করেছেন পদত্যাগের কারণ হিসাবে। যদিও প্রতি ক্ষেত্রেই শাসক দলের নানা চাপের মুখে তাঁরা কাজ চালাতে অপারগ, এমনটাই ঠারেঠোরে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন পদত্যাগীরা।
বসিরহাটের কলেজের ঘটনাও ব্যতিক্রম নয়। এ ক্ষেত্রেও উঠেছে শিক্ষাঙ্গনে রাজনীতির ‘অনভিপ্রেত’ অনুপ্রবেশের অভিযোগের কথা। যার জেরে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত বিতশ্রদ্ধ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের। সে কথা মুখে বলছেন না ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ খায়রুল আলম। মঙ্গলবার পরিচালন কমিটির সভাপতির কাছে ফ্যাক্স মারফত পদত্যাগপত্র পাঠিয়েছেন তিনি। খায়রুলের কথায়, ‘‘শারীরিক অসুস্থতার জন্যই কলেজের কাজ চালানো আর সম্ভব হচ্ছে না। তাই পদত্যাগ করতে বাধ্য হলাম।’’ কোনও রাজনৈতিক চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে হয়নি বলেই দাবি তাঁর।
যদিও কলেজ পরিচালন কমিটির সভাপতি তথা বসিরহাটের সাংসদ ইদ্রিশ আলি বলেন, ‘‘পদত্যাগের কথা জানার পরে মোবাইলে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। কোনও রকম রাজনৈতিক চাপের কাছে যেন তিনি মাথা নত না করেন, সে কথাও বলেছি।’’ সাংসদের বক্তব্য, ‘‘অন্তত আগামী ১২ সেপ্টেম্বর জিবি মিটিং পর্যন্ত তিনি যেন পুরনো পদে বহাল থাকেন, সেই অনুরোধ করেছি। এখন আমার অনুরোধ উনি রাখবেন কিনা, সেটা ওঁর ব্যাপার।’’
ইদ্রিশের দাবি, গত ৮ মাস আগে বসিরহাট কলেজের অধ্যক্ষ ঠিক হয়ে গেলেও কেবল মাত্র রাজনীতির কারণে তিনি কাজে যোগ দিতে পারছেন না।
তবে কলেজে কোনও রকম রাজনীতির কথা মানতে রাজি হননি তৃণমূল পরিচালিত ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক তুহিন দে। তিনি বলেন, ‘‘আমরা চাই স্যার (খাইরুল) ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ থাকুন। আসলে সময় মতো শিক্ষকদের কলেজে আসা, পঠনপাঠনের উন্নতি, ক্যান্টিন ভাল করা-সহ আমরা কয়েকটি দাবির ভিত্তিতে আন্দোলন করছিলাম। উনি বলেছিলেন, জিবি মিটিংয়ে সব সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু দুটো দিন ধার্য করেও শেষ পর্যন্ত মিটিং হয়নি। তিনি যদি এখন অসুস্থতার জন্য পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন, তা হলে এর মধ্যে রাজনীতির কী থাকতে পারে?’’
বসিরহাটের বাতাসে ভাসছে অবশ্য অন্য খবর। নানা সূত্রে জানা যাচ্ছে, সম্প্রতি কলেজ, হাসপাতাল এবং পুরসভায় কয়েকটি খালি পদে কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে তৃণমূলের দু’টি গোষ্ঠীর মধ্যে প্রবল উত্তেজনার বাতাবরণ তৈরি হয়েছে। তারই জেরে মাস দু’য়েক আগে তৃণমূলের এক ছাত্র নেতাকে নানা ভাবে হুমকি দিয়ে ফোন করা হচ্ছিল। বিষয়টি এমন পর্যায়ে পৌঁছয় যে, ঘটনাটি থানা-পুলিশ পর্যন্ত গড়ায়। রাজনৈতিক মহলের দাবি, বসিরহাট কলেজে জিবি মিটিং করা হলে কর্মী নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে ঝড় উঠবে। পাশাপাশি স্থায়ী অধ্যক্ষ না থাকায় কলেজে বর্তমানে পঠনপাঠনের অবস্থা বিশেষ সুবিধার নয়। নানা রকম অনৈতিক কাজের অভিযোগ উঠছে। নানা কারণে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের ঘরে ঢুকে গত ২১ অগস্ট একদল ছাত্র তাণ্ডব চালায়। ছাত্রদের দাবি-দাওয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে বলে সে সময়ে মন্তব্য করেছিলেন খায়রুল।
এরপরেই ঠিক হয় ৩১ অগস্ট জিবি মিটিংয়ে পরিস্থিতি আলোচনা করে প্রযোজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কিন্তু বিশেষ কারণে ওই দিন বৈঠক হয়নি। পরে ৭ সেপ্টেম্বর বৈঠকের দিন ঘোষণা করেন খায়রুল। কিন্তু কর্মী নিয়োগকে কেন্দ্র করে আবহাওয়া উত্তপ্ত হওয়ার আঁচ করেন অনেকে। শেষমেশ ওই বৈঠকের দিনও বাতিল হয়। ছাত্রছাত্রীদের ক্ষোভ বাড়ে। তাঁদের দাবি, এ ভাবে একের পর এক মিটিং বাতিল করায় কলেজে পঠনপাঠনের ক্ষেত্রে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।
জেলা কংগ্রেসের (গ্রামীণ) সভাপতি অমিত মজুমদার বলেন, ‘‘কলেজে কারা চাকরি করবে, তা ঠিক করতে রাজনীতির অনভিপ্রেত অনুপ্রবেশ বন্ধ না করতে পারলে এমন ঘটনা বার বার ঘটবে।’’