E-Paper

খেত থেকে মাধ্যমিকে ছাত্রী, পাশে শিক্ষকেরা

সব পরীক্ষার্থী ঠিক ভাবে কেন্দ্রে পৌঁছেছে কি না, খোঁজ নিচ্ছিলেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। জানতে পারেন, সবাই পৌঁছলেও, এক ছাত্রী গরহাজির। জনা ছয়েক শিক্ষক-শিক্ষিকা দ্রুত পৌঁছন তার বাড়িতে।

প্রদীপ মুখোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫৩

—প্রতিনিধিত্বমূলক চিত্র।

ঘণ্টা বেজে গিয়েছে। প্রশ্নপত্র দেওয়া শুরু হয়েছে। খাতা-কলম গুছিয়ে মনোযোগী হচ্ছে সহপাঠীরা। মেয়ে তখন ব্যস্ত মাঠে ধান বোনায়।

সব পরীক্ষার্থী ঠিক ভাবে কেন্দ্রে পৌঁছেছে কি না, খোঁজ নিচ্ছিলেন স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। জানতে পারেন, সবাই পৌঁছলেও, এক ছাত্রী গরহাজির। জনা ছয়েক শিক্ষক-শিক্ষিকা দ্রুত পৌঁছন তার বাড়িতে। জানা যায়, সকালে বাবা-মায়ের সঙ্গে চাষের কাজে গিয়েছে মন্দিরা মার্ডি। জমিতে হাজির হয়ে তাকে মোটরবাইকে তুলে শিক্ষকেরা যখন কেন্দ্রে পৌঁছে পরীক্ষায় বসালেন, তখন আধ ঘণ্টা সময় পার। পরীক্ষা শেষে, পূর্ব বর্ধমানের আউশগ্রামের কয়রাপুর বিদ্যাসাগর বিদ্যাপীঠের ওই ছাত্রী অবশ্য বলে, ‘‘সময়ের জন্য একটা প্রশ্নের উত্তর লিখতে পারিনি। বাকি ভালই হয়েছে।’’

আউশগ্রামের বিল্বগ্রামের একপেড়েডাঙার বাসিন্দা মন্দিরার বাবা-মা অন্যের তিন বিঘা জমিতে ভাগ চাষ করেন। মাটির বাড়িতে বাস। পড়াশোনার পাশাপাশি, বাবা-মাকে চাষের কাজে সাহায্য করে মন্দিরা। স্কুল সূত্রে জানা যায়, টেস্ট পরীক্ষায় প্রায় ৫০ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল সে। তার পরে স্কুলে তিনটি প্রস্তুতি-পরীক্ষায় ভাল ফল করে। এ দিন ভাতারের মোহনপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পরীক্ষা কেন্দ্রে সে না পৌঁছনোয়, অবাক হন শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

মন্দিরার স্কুলের প্রধান শিক্ষক সতীনাথ গোস্বামী জানান, সাড়ে ১০টা বেজে গেলেও, সে না আসায় জনা দুই শিক্ষিকা ও তিন শিক্ষককে নিয়ে তিনি ছাত্রীর বাড়িতে যান। তাঁর কথায়, ‘‘অন্য দিনের মতোই মাঠে ধান বুনতে গিয়েছে শুনে, সেখানে পৌঁছই। ঘড়িতে তখন প্রায় ১১টা। এক শিক্ষকের মোটরবাইকে মন্দিরাকে কেন্দ্রে পাঠানো হয়। পরীক্ষা কেন্দ্রের আধিকারিকদের ঘটনাটি জানিয়ে রাখায়, দেরিতে ঢোকার বিষয়ে তাঁরা সহযোগিতা করেছেন।’’

ছাত্রীর মা মনিকা, বাবা সুকল মার্ডি জানান, অভাবের সংসার, তাই বাড়ির সবাইকেই কাজ করতে হয়। তাঁদের কথায়, ‘‘মেয়ে পড়াশোনায় ভাল। আমরা চাই, ও পড়াশোনা করুক। তবে এ দিন পরীক্ষার কথা ভুলে গিয়েছিল। শিক্ষকেরা মাঠ থেকে তুলে না পাঠালে, পরীক্ষা দেওয়া হত না।’’ তাঁরা জানান, সকালে চা-মুড়ি খেয়ে মন্দিরা মাঠে গিয়েছিল। সঙ্গে জলখাবার ছিল। তবে তা আর খাওয়া হয়নি মেয়ের। স্কুলের পোশাকও পরা হয়নি। শিক্ষিকাদের দেওয়া কলমেই পরীক্ষা দেয়। মন্দিরা বলে, “পাড়ায় এ বার আমি একাই পরীক্ষার্থী। বাড়িতে টিভি নেই। টিউশনও নেই। এ দিন থেকেই যে পরীক্ষা, খেয়াল ছিল না। ভাগ্যিস স্যর-ম্যাডামেরা এসেছিলেন!’’

মন্দিরার স্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ৫৪ জন। তাদের মধ্যে ১৮ জন জনজাতি সম্প্রদায়ের। প্রধান শিক্ষক বলেন, “শুধু মন্দিরা নয়, অনেককেই বাড়ির অবস্থার জন্য জমিতে কাজ করতে হয়।’’ জেলা স্কুল পরিদর্শক (মাধ্যমিক) দেবব্রত পাল বলেন, “কোনও নিয়মিত পড়ুয়া, বিশেষ করে ছাত্রী যদি পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে, সে দিকে নজর দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে প্রত্যেক স্কুলকে। এ দিন ওই ছাত্রী পরীক্ষা দিতে না পারলে, পরের বছর হয়তো পড়াশোনায় আগ্রহ হারাত। তাই এই উদ্যোগ খুব প্রশংসীয়।’’ বিডিও (আউশগ্রাম ১) বিমান করও বলেন, ‘‘শিক্ষকদের উদ্যোগকে সাধুবাদ।’’

মন্দিরা জানায়, পরের পরীক্ষায় মন দিয়েছে সে। বলে, ‘‘বাকি পরীক্ষা ভাল করেই দিতে চাই।’’

(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)

Madhyamik 2026 Madhyamik student Aushgram

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy