Advertisement
E-Paper

নন্দীগ্রামের তৃণমূল ‘রাতে শুভেন্দু, দিনে জোড়াফুল’! শাসকশিবিরের গোষ্ঠীবিবাদ এখনও কাটেনি, জমি ‘শক্ত’, তবু আশাবাদী শাসকদল

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শেষমেশ শুভেন্দুর কাছে মমতাকে ১,৯৫৬ ভোটে হারতে হয়েছিল।

শোভন চক্রবর্তী • নন্দীগ্রাম

শেষ আপডেট: ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ ১০:৫৯
A section of party workers keep in touch with Suvendu Adhikari, there is an atmosphere of suspicion in the TMCs organization in Nandigram

গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

রোগ পুরনো। তা কাটাতে ওষুধও প্রয়োগ করা হয়েছে। কিন্তু সেই রোগ সারেনি। যে রোগে আক্রান্ত নন্দীগ্রামের তৃণমূল। রোগের নাম ‘রাতে শুভেন্দু, দিনে জোড়াফুল’।

রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর বিধানসভা কেন্দ্র নন্দীগ্রামে তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উদ্যোগে গত বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য পরিষেবা শিবির ‘সেবাশ্রয়’। দুই ব্লকের দু’টি জায়গার ‘মডেল ক্যাম্প’ উদ্বোধন করেছেন অভিষেক। কিন্তু অভিষেক পৌঁছোনোর আগে পর্যন্ত ‘সেবাশ্রয়’ তাঁবুর আশেপাশে তৃণমূল নেতাদের আলোচনা জুড়ে রইল সেই পুরনো রোগের কথা। যা থেকে স্পষ্ট, শুভেন্দু তৃণমূল থেকে বিজেপিতে চলে যাওয়ার পর পাঁচ বছর কেটে গেলেও নন্দীগ্রামের তৃণমূলে অবিশ্বাস এবং সন্দেহের বাতাবরণ কাটেনি।

নন্দীগ্রামের তৃণমূলে একটি অংশ শুভেন্দুর সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে বলে দলের অন্দরেই গুঞ্জন রয়েছে। জেলা তৃণমূলের এক প্রথম সারির নেতার কথায়, ‘‘শুভেন্দু বিজেপি-তে যাওয়ার সময়ে ১০ জনকে নিয়ে গেলে ৫০ জনকে রেখে গিয়েছেন। সেটাই আমাদের ভোগাচ্ছে।’’ পরিস্থিতি এমনই ‘গুরুতর’ যে, এই নেতার বিরোধী গোষ্ঠীর দাবি, ওই নেতাই শুভেন্দুর সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখেন। দলের ভিতরের খবর দিয়ে দেন বিরোধী দলনেতাকে। প্রত্যাশিত ভাবেই আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে তৃণমূল তা মানতে চায়নি। দলের তমলুক সাংগঠনিক জেলার সভাপতি সুজয় রায়ের বক্তব্য, ‘‘২০২১ সালে এই ধরনের সমস্যা ছিল। সেই অনুযায়ী পদক্ষেপ করা হয়েছে। এখন অনুগতরাই দলের পদাধিকারী। যার ফল মিলবে আগামী বিধানসভা নির্বাচনে।’’ বিজেপি অবশ্য কৌশলে তণমূলের অন্দরে সন্দেহের বাতাবরণই জিইয়ে রাখতে চাইছে। নন্দীগ্রামের বিজেপি নেতা প্রলয় পালের বক্তব্য, ‘‘শুভেন্দু অধিকারীর হাতে গড়া নন্দীগ্রামে অনেকেই বাধ্যবাধকতায় তৃণমূল করেন। তাঁদের সেটা বাইরে দেখাতে হয়। কিন্তু তাঁদের সঙ্গে ভিতরে ভিতরে নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে বিরোধী দলনেতার।’’

এই অবিশ্বাসের বাতাবরণ থেকেই নন্দীগ্রামের তৃণমূল গোষ্ঠীবিবাদে বিদীর্ণ। কেমন বিবাদ? নন্দীগ্রাম ২ নম্বর ব্লকের সংগঠন সম্পর্কে বলতে গিয়ে দলের রাজ্যস্তরের এক নেতা বলেন, ‘‘ওখানে সাতটা পঞ্চায়েত। কিন্তু আমাদের দলের গোষ্ঠী আটটা!’’ ১ নম্বর ব্লকে তুলনামূলক ভাবে সংগঠন ভাল জায়গায় রয়েছে বলেই তৃণমূল সূত্রের দাবি। ঘটনাচক্রে, বৃহস্পতিবার অভিষেকের কর্মসূচি ঘিরে ভিড়ের নিরিখেও এগিয়ে ছিল ১ নম্বর ব্লকই।

শুধু একটি ব্লকে একাধিক গোষ্ঠীই নয়। নন্দীগ্রামে তৃণমূলকে ভাবতে হচ্ছে ব্লক বনাম ব্লক দ্বন্দ্বের কথাও। ১ নম্বর ব্লকের সঙ্গে ২ নম্বর ব্লকের লড়াই। শাসকদলের নেতারা একান্ত আলোচনায় বলেই দিচ্ছেন, যা পরিস্থিতি তাতে এ বারও নন্দীগ্রামে স্থানীয় কোনও নেতাকে প্রার্থী করা হলে লড়াই শুরুতেই শেষ হয়ে যাবে। কেন? এক নেতার ব্যাখ্যা, ‘‘প্রার্থী ১ নম্বর ব্লকের হলে ২ নম্বর ব্লকের সংগঠন অন্তর্ঘাত করবে। আর প্রার্থী ২ নম্বর ব্লকের হলে ১ নম্বর শুইয়ে দেবে।’’

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নন্দীগ্রামে দাঁড়িয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বময় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু শেষমেশ শুভেন্দুর কাছে মমতাকে ১,৯৫৬ ভোটে হারতে হয়েছিল। মমতার হারের পরেও নন্দীগ্রামের ময়নাতদন্তে উঠে এসেছিল কোন্দলের কথা। অন্তর্ঘাতের প্রসঙ্গ। সেই ব্যবধান গত লোকসভায় আরও বেড়েছে। নন্দীগ্রাম তমলুক লোকসভার অন্তর্গত। তমলুকে তৃণমূল প্রার্থী দেবাংশু ভট্টাচার্যের তুলনায় বিজেপি প্রার্থী তথা প্রাক্তন বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় এগিয়ে ছিলেন ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে। সেই নিরিখে বিধানসভা ভোটে নন্দীগ্রামের জমি যে বেশ ‘শক্ত’, তা মানছেন তৃণমূলের প্রায় সব নেতাই। তবে পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের মাধ্যমে নন্দীগ্রামের জন্য বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষাও তৃণমূল করতে শুরু করেছে। তৃণমূলের একাংশের দাবি, বিজেপির মধ্যেও ‘সকালে শুভেন্দু, বিকেলে তৃণমূল’ বাতাবরণ তৈরি হতে শুরু করেছে। যত ভোট আসবে, তত এই বিষয়টা বাড়তে থাকবে।

তৃণমূলের অনেকের দাবি, নন্দীগ্রামের পরিবেশ থমথমে। ভয়ভীতির বাতাবরণ রয়েছে। সে কারণেই সঠিক ভাবে সমীক্ষা করা যাচ্ছে না। সাধারণ মানুষ তাঁদের মতামত খোলামেলা ভাবে জানাচ্ছেন না। পেশাদার সংস্থার দৌলতে তৃণমূলে এখন সমীক্ষা একটি অতীব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যা বিজেপি-ও করে থাকে। কিন্তু নন্দীদগ্রামের আসল ছবি কী, তা নিয়ে শাসকদলের অন্দরে ধোঁয়াশা রয়েছে। বিজেপি-র একটি অংশের মতে, অভিষেকের সেবাশ্রয়কে তৃণমূল নথি সংগ্রহের মঞ্চ হিসাবে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। সেবাশ্রয় থেকে প্রাপ্ত ‘ডাটা’কে ভোটের সময়ে ব্যবহার করার কৌশল নেবে। তৃণমূল অবশ্য সেটি ‘অবান্তর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে। তবে শাসকদলের নেতারা নন্দীগ্রামের রোগের ব্যাপারে একান্ত আলোচনায় কোনও লুকোছাপা করছেন না। রোগের নাম ‘সকালে জোড়াফুল, রাতে শুভেন্দু’।

Nandigram TMC BJP
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy