চা-শ্রমিকদের দাবির পাহাড় জমে আছে। বাগান মালিকেরা যা করছেন, পুজোর মরসুমে কোনও আলোচনা না-করেই রাজ্যের শ্রম দফতর যে ভাবে এক তরফা বোনাসের ঘোষণা করেছে, সে সব নিয়ে শাসক দলের শ্রমিক সংগঠনেরও প্রশ্ন বিস্তর। বিধানসভা নির্বাচনের মরসুম পড়তে আলিপুরদুয়ারে চা-শ্রমিকদের সঙ্গে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত বিনিময়ের ব্যবস্থা করেছে তৃণমূল কংগ্রেস। শ্রমিকদের সমস্যা ও দুর্দশার কথা শুনতে সেই আয়োজনের জাঁক-জমক চোখ কপালে তুলে দিচ্ছে সব মহলের! আয়োজনের বহর এমনই যে, শাসক শিবিরের এক নেতাও বলে ফেলছেন, ‘‘বাংলা-বিরোধী দিল্লির জমিদারদের বিরুদ্ধে তোপ দাগা হচ্ছে রাজসূয় যজ্ঞ করে!’’
‘আবার জিতবে বাংলা’র স্লোগান সামনে রেখে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক এ বার যে রাজ্য-সফরে বেরিয়েছেন, তাতে নতুন সংযোজন হয়েছে মঞ্চের সঙ্গে র্যাম্প-সংস্কৃতি। বারুইপুরের সাগর সঙ্ঘের মাঠে বৃহস্পতিবার দু’শো ও দেড়শো ফুটের এক জোড়া র্যাম্পে নিজে হেঁটে হেঁটে বক্তৃতা করেছেন অভিষেক, নির্বাচন কমিশনের তালিকায় ‘মৃত’ হয়ে যাওয়া তিন ভোটারকেও সেখানে হাজির করেছেন। অভিষেক বলেছেন, এই কারণেই তিনি র্যাম্প করেছেন। এর পরে আজ, শুক্রবার চা-শ্রমিকদের নিয়ে তাঁর আসর আলিপুরদুয়ারের মাঝেরডাবরি চা-বাগানের ময়দানে। বিভিন্ন চা-বাগানের শ্রমিকেরা সেখানে থাকবেন। তৃণমূলের আলিপুরদুয়ার জেলা সভাপতি ও রাজ্যসভার সাংসদ প্রকাশ চিক বরাইকের মতে, ‘‘রাজ্যে এই প্রথম কোনও সভায় চা-শ্রমিকেরা সরাসরি আমাদের দলের নেতার সঙ্গে কথা বলবেন। চা-বাগানে রাজ্য সরকারের নানা প্রকল্পের পাশাপাশি শ্রমিকদের অভিযোগ ও দাবি নিয়েও কথা হবে।’’ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপস্থিতিতে চা-বাগানের বাচ্চাদের জন্য স্কুল বাস, ক্রেশ-সহ নানা আশ্বাসের অনেক কিছুই কেন এখনও পুরোপুরি বাস্তবায়িত হল না, সে প্রশ্ন রয়েছে শাসক শিবিরের অন্দরেই। কিন্তু চা-বাগানের সমস্যা নিয়ে আলোচনার সুবিশাল মঞ্চ ও র্যাম্প অন্য প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে। একটি সূত্রের খবর, মঞ্চ সাজানোর খরচ কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে।
দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরের মতো জনসভা মাঝেরডাবরিতে হচ্ছে না, বলা হচ্ছে মত বিনিময়ের আসর। তবে বারুইপুর থেকে যে ‘ঝলক’ শুরু হয়েছে, তা নিয়ে কটাক্ষ করে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলছেন, ‘‘তৃণমূলকে বিজেপি এখন র্যাম্পে হাঁটিয়ে ছাড়ছে! এর আগে র্যাম্পে হাঁটতে হাঁটতে প্রার্থী ঘোষণা (গত লোকসভা ভোটের আগে ব্রিগেডে) করেছিলেন, এ বার কী কী করেন দেখা যাক। তবে হাঁটাব আমরাই! যাওয়ার আগে মানুষ একটু হেঁটে নিতে পছন্দ করে।’’
তৃণমূলের উত্তরবঙ্গের নেতা তথা উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতরের মন্ত্রী উদয়ন গুহের পাল্টা দাবি, ‘‘এ প্রশ্ন বিজেপি করছে, যারা গত ১০ বছর ধরে চা-বাগানের শ্রমিকদের মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোট নিয়েছে। ভোটের পরে মানুষগুলিকে ভুলে গিয়েছে। আসলে উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত পেয়ে বিজেপি ভয় পেয়ে গিয়েছে!’’
শাসক দলের একটি সূত্রের বক্তব্য, আলিপুরদুয়ারে এ বার তৃণমূলের সম্ভাবনা গত বিধানসভা নির্বাচনের তুলনায় ভাল বলে মনে করছে তৃণমূল। সেই সম্ভাবনাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে প্রায় তিন হাজার শ্রমিকের উপস্থিতিতে খোলা মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। অভিষেক চাইছেন, তাঁদের প্রশ্ন ও প্রত্যাশা ধরে ধরে উত্তর দিতে। প্রয়োজনে লিখিত ভাবে তাঁদের সমস্যা নিয়ে মঞ্চ থেকেই নিজের মত জানাবেন তিনি।
উদয়নের আরও মন্তব্য, ‘‘চা-বাগানের শ্রমিকদের জন্য আবাস, জমি, রেশন, চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। চতুর্থ সরকারের কাছে তাঁদের প্রত্যাশার কথা জানতেই অভিষেক আসছেন। সে সব বিষয়েই শ্রমিকদের মত নেবেন।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)