×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২১ জুন ২০২১ ই-পেপার

মনোজ আমার কঠিন সময়ের বন্ধু: শুভ্রা

সুনন্দ ঘোষ
কলকাতা ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ০২:৪১
মনোজ কুমার ও শুভ্রা কুণ্ডু

মনোজ কুমার ও শুভ্রা কুণ্ডু

গত কয়েক দিন ধরে তাঁর ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক আলোচনা হয়েছে। এবং তা হয়েছে খবরের কাগজের পাতায়, টিভির পর্দায়। লক্ষ-কোটি মানুষ তা দেখেছেন এবং পড়েছেন।

রবিবার সকালে টেলিফোনের অন্য প্রান্ত থেকে ধরা গলায় সেই শুভ্রা কুণ্ডু বলেন, ‘‘আমার স্বামী জেলে। আমি দু’টি ছেলেমেয়েকে নিয়ে কী ভাবে বেঁচে আছি, কতটা লড়াই চালাতে হচ্ছে, আমিই জানি। আমার পাশে না হয় কেউ না-ই থাকল। কিন্তু, এ ভাবে কেন চরিত্রহনন করা হচ্ছে?’’

সম্প্রতি শুভ্রার সঙ্গে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)-র অফিসার মনোজ কুমারের কিছু ছবি প্রকাশ্যে আসার পরে হইচই শুরু হয়। মনোজ তখন রোজ ভ্যালি কাণ্ডে তদন্ত করছিলেন। অন্যতম মূল অভিযুক্ত গৌতম কুণ্ডুর স্ত্রীর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা কতটা, এর ফলে তদন্তে ব্যাঘাত ঘটবে কি না, এই নিয়ে আলোচনা শুরু হয়ে যায়। মনোজকে দ্রুত তদন্ত থেকে সরিয়েও দেওয়া হয়। এ দিন এই প্রসঙ্গ উঠতেই শুভ্রা বলেন, ‘‘মনোজবাবু আমাকে বেশ কয়েক বার জেরা করেছেন। আমার যা বলার আমি ওঁকে বলেছি। ওঁকে যা বলেছি, সিবিআইকেও ঠিক তা-ই বলেছি।’’

Advertisement

এর সঙ্গেই তিনি যোগ করেন, ‘‘আপনারা যদি জানতে চান, আমার বলতে অসুবিধা নেই, গত কয়েক মাস ধরে জীবনের কঠিনতম সময়ের মধ্যে দিয়ে চলেছি। এই সময়ে হাতে গোনা যে কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে এঁরা আমার ক্ষতি চান না, মনোজবাবু তাঁদের অন্যতম।’’ শুভ্রার অভিযোগ, অনেকেরই তো বাইরে বন্ধু হয়। তা হলে কেউ তাঁর বন্ধু হলে সেটা নিয়ে এত হইচই, এত চরিত্রহনন করা হবে কেন?

রোজ ভ্যালির কর্ণধার গৌতম কুণ্ডুর স্ত্রী, মধ্য তিরিশের শুভ্রা এখন দক্ষিণ কলকাতার একটি ফ্ল্যাটে ৪ বছরের মেয়েকে নিয়ে রয়েছেন। পড়াশোনার জন্য ১৪ বছরের ছেলে রয়েছে দূরে। স্বামী জেলে যাওয়ার পরেও কী ভাবে চালাচ্ছেন এমন জীবনযাত্রা? রবিবার সকালে ফোনে শুভ্রা বলেন, ‘‘সবাইকে বলে দিন, মাত্র মাস দু’য়েক আগে ইডি এবং সিবিআই-এর কাছ থেকে লিখিত অনুমতি নিয়ে আমি রোজ ভ্যালির-ই সংস্থা অদ্রিজা-র পরামর্শদাতা হিসেবে কাজ শুরু করেছি। সেটাই আপাতত আমার একমাত্র রোজগার।’’

তার আগে কী করে চলছিল? শুভ্রা জানিয়েছেন, ২০১৫ সালের মার্চ মাসে ইডি-র হাতে গ্রেফতার হন গৌতম। তার পরেই তাঁদের হোটেল ব্যবসার নাম বদলে ফেলা হয়। নতুন চকোলেট হোটেল গ্রুপের অন্যতম ডিরেক্টর হিসেবে মা বিভা কুণ্ডুকে নিয়োগ করতে বলেন গৌতমই। তিনি জেলে থাকলেও যাতে বাইরে তাঁর বাবা-মা, স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়ের কোনও সমস্যা না হয়, তার জন্যই এই ব্যবস্থা। বিভাদেবী ব্যবসার কিছুই বোঝেন না। শুধু মাসের শেষে এক গুচ্ছ টাকা পৌঁছে যেত বাড়িতে। শুভ্রার কথায়, ‘‘ওই টাকাতেই আমাদের সব খরচ চলতো। এর মধ্যে শ্বশুর মারা যান।’’ রোজ ভ্যালি সূত্রের খবর, কাছাকাছি দু’টি আলাদা ফ্ল্যাটে গৌতমের মা এবং স্ত্রী থাকলেও ইদানীং সেই সম্পর্কের অবনতি হয়েছে। ফলে, যে টাকা শাশুড়ি-বৌমা ভাগ করে নিচ্ছিলেন, তা আর সম্ভব হচ্ছিল না। আর তাই নিজের ছেলেমেয়ের খরচ চালানোর কথা নিজেকেই ভাবতে হয়েছে বলে দাবি করেন শুভ্রা।

এ দিন ফোনে বলেন, ‘‘আমি লিখিত ভাবে ইডি ও সিবিআইয়ের অনুমতি নিয়েছি। অদৃজা এখন যাঁরা চালান, তাঁরাই বলেছেন, সংস্থার কর্মী হিসেবে নয়, আপনি পরামর্শদাতা হিসেবে থাকুন। অন্তত সেইটুকু সম্মান ওঁরা এখনও আমাকে দিচ্ছেন।’’

বেশি দিন আগের কথায় নয়। বাগুইআটির ফ্ল্যাটে বসে হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেছিলেন পিয়ালি সেন। তিনিও ছিলেন দুই সন্তানের মা এবং অভিযুক্ত এক কোটিপতির স্ত্রী। গৌতম কুণ্ডুর মতো সেই কোটিপতি, সারদা কর্তা সুদীপ্ত সেন-ও এখন জেলে। ঠিক শুভ্রার মতো সে দিন পিয়ালিও অভিযোগ করেছিলেন যে, সুদীপ্ত-র দুর্দিনে বেশিরভাগ লোকই তাঁর পাশে এসে দাঁড়াননি। দুই ছেলেমেয়ের হাত ধরে কার্যত কাঁদতে কাঁদতে শহর ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন পিয়ালি।

শুভ্রার কথায়, ‘‘সমাপতন বলতে পারেন। আমার স্বামীও একই অভিযোগে জেলে এবং আমারও দুই সন্তান। কিন্তু, পিয়ালির মতো আমি হেরে যাব না।’’ ছেলেকে কাছে এনে রাখতে ভয় পাচ্ছেন, পাছে শহরের স্কুলে ভর্তি হলে সেখানে সহপাঠীদের গঞ্জনা সইতে হয়! মেয়ে অনেক ছোট। বললেন, ‘‘ওকে নিয়ে এত কিছু ভাবার সময় এখনও আসেনি।’’

যে ফ্ল্যাটে এখন থাকেন, সেটি রোজ ভ্যালির নামে। যে কোনও দিন সেই ফ্ল্যাটটিও বাজেয়াপ্ত করতে পারে ইডি। শুভ্রা জানিয়েছেন, শুধু তো মনোজ নন, সিবিআইয়ের অনেক অফিসারও আশ্বাস দিয়ে বলেছেন, এখনই ফ্ল্যাট ছাড়তে হবে না।

আর ছাড়তে হলে? ‘‘দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে পিয়ালির মতোই হয়তো আমাকেও রাস্তায় নামতে হবে,’’ বলেন শুভ্রা।

Advertisement