দ্বাপরে দুধ কেনার সামর্থ্য ছিল না দরিদ্র দ্রোণাচার্যের। জলে পিটুলি বা চালের গুঁড়ো মিশিয়ে দুধ বলে বালক পুত্র অশ্বত্থামাকে খাইয়েছিলেন তিনি।
এই কলিযুগে প্যাকেটবন্দি দুধ বলে সাধারণ মানুষ যা কিনে খাচ্ছেন, তার একাংশও ওই পিটুলি গোলা জলের চেয়ে বেশি কিছু নয়। এমনটাই অভিযোগ রাজ্য পুলিশের এনফোর্সমেন্ট শাখা (ইবি)-র। প্রাথমিক অনুসন্ধানের পরে ইবি জানাচ্ছে, প্যাকেটের অনেক দুধই ভেজাল। যা তৈরি হচ্ছে নষ্ট হওয়া দুধ, ছানার জল, অ্যারারুট, মেয়াদ-উত্তীর্ণ গুঁড়োদুধ, ইউরিয়া, পানিফলের গুঁড়ো, বটের আঠা ইত্যাদি মিশিয়ে। ইবি-র তদন্তকারীদের আশঙ্কা, না-জেনে এই ভেজাল দুধ খেয়ে বহু মানুষ ঠকছেন তো বটেই। সেই সঙ্গে নিঃশব্দেই তাঁদের শরীরে ঢুকছে বিষ।
সরকারি নথি অনুযায়ী রাজ্যের বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি প্ল্যান্ট থেকে রোজ গড়ে এক কোটি ৩৮ লক্ষ কিলোগ্রাম দুধ উৎপন্ন হয়। তার মধ্যে পশ্চিমবঙ্গ দুধ ফেডারেশন প্রতিদিন গড়ে দু’লক্ষ ২৪ হাজার কিলোগ্রাম দুধ কেনে সরকারি ও আধা-সরকারি সংস্থা এবং মিল্ক ইউনিয়নগুলির কাছ থেকে। ইবি-র দাবি, এর মধ্যে বিপুল পরিমাণ দুধ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। সেই দুধ নষ্ট করে ফেলার কথা। কিন্তু ঘুরপথে তা বাজারে চলে আসছে কিছু কিছু জিনিস মিশিয়ে।
‘‘এই বিষয়ে সকলকে সতর্ক করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি জেলায় খাদ্য সুরক্ষা আধিকারিক আছেন। তাঁরা খেয়াল রাখছেন,’’ বলেন প্রাণিসম্পদ উন্নয়ন দফতরের প্রতিমন্ত্রী (স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত) স্বপন দেবনাথ।
গত ২৫ ফেব্রুয়ারি উত্তর ২৪ পরগনার দত্তপুকুর থানার পুলিশ একটি নামী সংস্থার বাতিল করা এক গাড়ি দুধ বাজেয়াপ্ত করে। একটি মামলাও (কেস নম্বর ১১২) রুজু হয় ভেজাল পানীয় বিক্রির অভিযোগে। ওই মামলা হাতে নিয়ে পুরোদস্তুর তদন্তে নামছে ইবি। তাদের দাবি, ম্যাটাডর ভ্যান ভর্তি ওই দুধ কোনও বেসরকারি প্ল্যান্টে যাচ্ছিল। অফিসারেরা জেনেছেন, সরকারি ও আধা-সরকারি প্ল্যান্টে গৃহীত না-হওয়া ভেজাল দুধ কিনে প্রক্রিয়াকরণ ও প্যাকেটবন্দি করে বাজারে ছাড়ছে কয়েকটি বেসরকারি প্ল্যান্ট।
ইতিমধ্যেই ইবি হাওড়ার একটি বেসরকারি প্ল্যান্টকে চিহ্নিত করেছে।
ইবি-র বক্তব্য, দুধ পরীক্ষা হয় তিন ভাবে। দেখে, শুঁকে এবং শেষে ল্যাক্টোমিটার নামক যন্ত্রে। দুধে মাখন, জল ও চর্বি-বহির্ভূত কঠিন পদার্থ অর্থাৎ কেসিন-ল্যাকটোজ-ভিটামিন-খনিজ পদার্থ কতটা এবং কী অনুপাতে আছে, সেগুলোই যাচাই করে ওই যন্ত্র। তা হলে ইউরিয়া, পানিফলের গুঁড়ো, অ্যারারুট ও বটের আঠা দিয়ে তৈরি ভেজাল দুধ ওই যন্ত্রকে ফাঁকি দিচ্ছে কী ভাবে? ইবি-র অফিসারেরা জানাচ্ছেন, ওখানেই কেরামতি মেয়াদ-উত্তীর্ণ গুঁড়োদুধ ও ছানার জলের। কী ভাবে ওই দুধ ল্যাক্টোমিটারকে ফাঁকি দিচ্ছে কিংবা কেউ ইচ্ছে করেই ল্যাক্টোমিটার পরীক্ষার ভুল রিপোর্ট দিচ্ছে কি না, সেটা তদন্ত করে দেখবে ইবি। আর যে-সব জিনিস দিয়ে ভেজাল দুধ তৈরি হচ্ছে, সেগুলি শরীরে গেলে কী কী ক্ষতি হতে পারে, তা-ও সেন্ট্রাল ড্রাগ ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীদের দেখতে বলেছে ইডি।