Advertisement
E-Paper

শিশু পালনের ছুটি আদায়ে হাইকোর্টের পথে শিক্ষিকারা

সরকারি কর্মী হোন বা সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষিকা, সকলেই বেতন পান সরকারি কোষাগার থেকে। কিন্তু ছুটির ক্ষেত্রে দু’পক্ষের জন্য দু’রকম ব্যবস্থা। সরকারি মহিলা কর্মীরা ‘চাইল্ড কেয়ার লিভ’ বা শিশু-পালন ছুটি পান। স্কুল-কলেজের শিক্ষিকারা পান না। চাকরি সামলে সন্তানের দেখভাল তো করতে হয় দু’পক্ষকেই! তবু বৈষম্য কেন?

সাবেরী প্রামাণিক

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৫ ০৫:৩৪

সরকারি কর্মী হোন বা সরকারের সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষিকা, সকলেই বেতন পান সরকারি কোষাগার থেকে। কিন্তু ছুটির ক্ষেত্রে দু’পক্ষের জন্য দু’রকম ব্যবস্থা। সরকারি মহিলা কর্মীরা ‘চাইল্ড কেয়ার লিভ’ বা শিশু-পালন ছুটি পান। স্কুল-কলেজের শিক্ষিকারা পান না। চাকরি সামলে সন্তানের দেখভাল তো করতে হয় দু’পক্ষকেই! তবু বৈষম্য কেন?

প্রশ্ন তুলে কলকাতা হাইকোর্টের দ্বারস্থ হতে চলেছেন কেউ কেউ। যেমন কালিয়াচকের মোজামপুর এইচএসএফবি হাইস্কুলের শিক্ষিকা তমন্না দে। গত বছরের গোড়ায় অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকেই নানা ধরনের শারীরিক সমস্যা ছিল তাঁর। চিকিত্‌সকের পরামর্শে তখন থেকেই স্কুলে ছুটি নিয়ে বিশ্রাম নিতে হয় তাঁকে। সেপ্টেম্বরে তাঁর সন্তান জন্মায়। সন্তানের যখন আড়াই মাস, তিনি ফের কাজে যোগ দেন। তত দিনে তাঁর মাতৃত্বকালীন ছুটি-সহ সব ছুটি শেষ।

কিন্তু তার পরেও শিশুর খেয়াল রাখতে গিয়ে নিয়মিত স্কুলে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না তমন্নাদেবীর পক্ষে। আপাতত ছুটিতেই আছেন তিনি। কিন্তু পাওনা ছুটিছাটা সবই গিয়েছে ফুরিয়ে। তমন্নাদেবী এখন ‘লিভ উইদাউট পে’ বা বিনা বেতনের ছুটিতে রয়েছেন। সরকারি কর্মীদের মতো সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষিকাদের শিশু-পালন ছুটির দাবিতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হওয়ার তোড়জোড় করছেন ওই শিক্ষিকা। শীঘ্রই মামলা দায়ের করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি।

আইনজীবীদেরও প্রশ্ন, সরকারি কর্মীরা পেলে সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষিকা ও মহিলা শিক্ষাকর্মীরা শিশু-পালন ছুটি কেন পাবেন না? সমাজের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত মহিলাদের দাবি, এই ছুটি প্রত্যেকেরই পাওয়া উচিত। এমনকী বেসরকারি বা অসংগঠিত ক্ষেত্রের মহিলা কর্মীদের শিশু-পালন ছুটি দেওয়া যায় কি না, তা-ও বিবেচনা করার দাবি জানাচ্ছেন তাঁরা।

তমন্নাদেবীর হয়ে হাইকোর্টে ওই মামলা লড়ার কথা আইনজীবী এক্রামুল বারির। তিনি জানান, সরকারি কোষাগার থেকে বেতন দেওয়া হলেও সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে কিছু কর্মীকে বঞ্চিত করা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়। সন্তান পালনের ছুটি পাওয়া উচিত সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত স্কুল-কলেজের শিক্ষিকাদেরও।

২০১২ সালে রাজ্যের অর্থ দফতর একটি নির্দেশিকা জারি করে জানায়, সরকারি মহিলা কর্মীরা দু’বছর পর্যন্ত (৭৩০ দিন) শিশু-পালন ছুটি পাবেন। দু’টি সন্তানের জন্য তাদের ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত ওই ছুটি নিতে পারবেন মায়েরা। সন্তানের অসুখ, পরীক্ষা-সহ যে-কোনও প্রয়োজনে শিশু-পালন ছুটি নিতে পারেন মহিলা সরকারি কর্মীরা। ওই ছুটি যে সবেতন, নির্দেশিকায় তা-ও জানানো হয়। সরকারি স্কুল-কলেজের শিক্ষিকারাও যে-হেতু সরাসরি সরকারি কর্মী, তাই তাঁরা এই সুবিধা পান। কিন্তু সরকারি সাহায্যপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষিকারা শিশু-পালন ছুটি থেকে বঞ্চিত।

তমন্নাদেবীর কথায়, “আমার বাড়ি থেকে স্কুলের দূরত্ব অনেক। স্বামী কলকাতায় থাকেন। বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরসায় শিশুকে রেখে বেরোতে হত। আর নির্দিষ্ট সময়ের আগেই জন্মানোয় আমার ছেলের বিশেষ নজরদারি দরকার। এই পরিস্থিতিতে চাইল্ড কেয়ার লিভের খুবই প্রয়োজন। বাধ্য হয়েই মামলার পথে যাচ্ছি।”

একই সমস্যা ছিল আসানসোলের একটি স্কুলের শিক্ষিকা সাহানা মৈত্রের। তিনি বলেন, “ছেলে যখন ছোট ছিল, তখন আমি কেতুগ্রামের একটি স্কুলে চাকরি করতাম। আসানসোলের শ্বশুরবাড়িতে ওকে রেখে কাটোয়ায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন চাকরি করেছি। সেই সময় চাইল্ড কেয়ার লিভের সুবিধা পেলে কী যে উপকার হত!”

তমন্নাদেবী, সাহানাদেবীর মতো ভুক্তভোগী শিক্ষিকার সংখ্যা কম নয়। যেমন বর্ধমানের একটি কলেজের শিক্ষিকা থাকেন কলকাতায়। রোজ সকাল সাড়ে ৭টায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে সাড়ে ১০টার মধ্যে কলেজে পৌঁছন তিনি। ফেরেন সন্ধ্যায়। তাঁর ছেলের বয়স মাত্র দেড় বছর।

এই পরিস্থিতিতে শিশু-পালন ছুটির দাবিতে সরব হয়েছে শাসক দলের শিক্ষক সংগঠন ওয়েবকুপা-ও। সংগঠনের সভানেত্রী কৃষ্ণকলি বসুর কথায়, “বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে একই রকম ‘স্ট্যাটিউট’ বা বিধি চালু করতে উদ্যোগী হয়েছে রাজ্য সরকার। সেই বিধিতেই সব বিশ্ববিদ্যালয় এবং তাদের অধীন কলেজের শিক্ষিকাদের জন্য শিশু-পালন ছুটির সংস্থান করার আবেদন জানিয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছে।” স্কুলশিক্ষকদের অন্যতম বড় সংগঠন নিখিলবঙ্গ শিক্ষক সমিতি (এবিটিএ)-র সাধারণ সম্পাদক উত্‌পল রায়ের বক্তব্য, তাঁরা বিভিন্ন সময়ে এই দাবি জানিয়েছেন। কিন্তু কোনও সাড়া মেলেনি।

কী বলছে রাজ্য সরকার?

উচ্চশিক্ষা দফতর সূত্রের খবর, সব বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য একই রকম বিধির যে-খসড়া জমা দেওয়া হয়েছে, তাতে শিক্ষিকাদের জন্য শিশু-পালন ছুটির প্রসঙ্গ রয়েছে। তবে সরকার এতে সায় দেবে কি না, তা নিয়ে দফতরের কর্তাদের অনেকেই সংশয়ে।

এই বিষয়ে স্কুলশিক্ষা দফতর অবশ্য কোনও রকম উচ্চবাচ্য করছে না। ওই দফতরের এক কর্তা বলেন, “এমনিতেই তো শিক্ষক-শিক্ষিকার অভাব। তার উপরে যদি শিক্ষিকাদের শিশু-পালন ছুটি দিতে হয়, তা হলে পঠনপাঠন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। সমস্যায় পড়বে ছাত্রছাত্রীরাই।”

শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় বিতর্কে ঢুকতেই চাইছেন না। তিনি বলেন, “এই বিষয়ে এখনও কোনও রকম ভাবনাচিন্তা হয়নি।”

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy