‘প্রেজেন্ট স্যার’, ‘উপস্থিত’— ক্লাসে রোল কল হচ্ছে। একদল ছাত্র ক্লাস-নোট নিচ্ছেন জোরকদমে। বাড়ির প়ড়া করতে হবে যে! এমন ভাবেই ভাতারের সাহেবগঞ্জ ১ পঞ্চায়েতের সোনচালিন্দা গ্রামে সপ্তাহে দু’দিন করে এ ভাবেই চলছে ‘ফার্ম স্কুল।’ ছাত্ররা সকলেই চাষি। খরিফ শস্যের চাষের খরচ কী ভাবে কমানো যায়, তারই পাঠ দিচ্ছেন কৃষি দফতরের প্রশিক্ষকেরা।
প্রশাসনের সূত্রে জানা গিয়েছে, সোনচালিন্দা গ্রামের একটি কৃষি সমবায়ের ঘরে ওই ফার্ম স্কুল চলছে। সেখানে ছাত্রের সংখ্যা আপাতত ২৫ জন। প্রতি সপ্তাহে সোম ও শুক্রবার বেলা ১০টা থেকে ৪টে পর্যন্ত চলে স্কুল। মাঝে এক ঘণ্টার টিফিন। টানা তিন মাস ধরে চলবে ক্লাস। ক্লাসে পড়াশোনার পাশাপাশি চাষিদের খেতে নিয়ে গিয়ে দেখানো হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতির চাষ। তবে শুধু ভাতারই নয়, ‘আতমা’ প্রকল্পের অধীনে বর্ধমানের সবকটি ব্লকেই এমন ফার্ম স্কুল চলছে বলে জানান জেলার কৃষি অধিকর্তা জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘‘কী ভাবে আধুনিক প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে চাষ করা সম্ভব, সে বিষয়েই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে স্কুলে।’’
মূলত কী কী বিষয়ের প্রশিক্ষণ? প্রশাসনের সূত্রে জানা গিয়েছে, এই ধরনের স্কুলগুলি থেকে চাষের মরসুমে খেতে কোন সময়ে জৈব সার, কখন রাসয়ানিক সার ব্যবহার করলে ফলন ভাল হবে, তা জানাচ্ছেন প্রশিক্ষকরা। এ ছাড়াও ধান গাছে পোকার উপদ্রব কমানোর, বালি মাটিতেও ভাল ফলনের জন্য চাষের পদ্ধতিও জানানো হচ্ছে ক্লাসে। ভাতারের কৃষি আধিকারিক বিপ্লব পতি বলেন, “খরিফ চাষের মরসুমে কঠিন মুহূর্তগুলির মোকাবিলা কী ভাবে করা সম্ভব, কম জলে ও কম শ্রমিকে চাষের পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।’’ প্রতিদিন প্রশিক্ষণ শেষে থাকছে প্রশ্নোত্তর পর্বও।
এমন ক্লাসে যোগ দিয়ে খুশি চাষিরাও। কারণ ধানের দাম না মেলা নিয়ে শঙ্কায় রয়েছেন চাষিরা। ফার্ম স্কুলের নিয়িমিত ছাত্র বছর ষাটের দিলীপ মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘‘বাজারে ধানের দাম নেই। চাষের খরচ কমাতে না পারলে সমস্যা আরও বাড়বে। কী ভাবে চাষের খরচ কমানো যায়, তাই শিখছি।” ফার্ম স্কুলে যাওয়ার ফলও হাতেনাতে মিলছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেল। ওই গ্রামে এখন বেশ কয়েক জন চাষি স্বল্প শ্রমিকের সাহায্যে ‘ড্রাম সিডার’ পদ্ধতিতে চাষ করছেন। গোপালচন্দ্র ঘোষ নামে এক চাষি জানান, প্রচলিত পদ্ধতির চাষে একটা বড় অংশ খরচ হয় শ্রমিকদের পিছনে। তার উপরে থাকে শ্রমিক সমস্যা। চাষিরা জানান, গত বছর এই পদ্ধতিতে চাষ করে বিঘা প্রতি ১৪ বস্তা ধান মিলেছিল। সেখানে প্রচলিত পদ্ধতিতে চাষ করে ধান মেলে ১৫ বস্তা। এ ছাড়াও শ্রী, শূন্য কর্ষণ (জিরো টিলেজ) পদ্ধতিও চাষিদের শেখানো হচ্ছে বলে কৃষি দফতরের কর্তারা জানান। কৃষি প্রযুক্তিবিদ নবীনচন্দ্র সিংহ বলেন, ‘‘প্রশিক্ষণের পরে সফল চাষিদের কোনও স্কুলে প্রশিক্ষক করেও পাঠানো হবে। পাশাপাশি ভিন্ রাজ্যেও প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো হতে পারে।”
শুধু প্রশিক্ষণেই কৃষি-ক্লাসের শেষ নয়। তিন মাস পরে চাষিদের পরীক্ষাও দিতে হবে। তার প্রস্তুতিও জোরকদমে সারছেন দিলীপ সাধু, মহম্মদ ইউনিস শেখদের মতো চাষিরা। তাঁদের কথায়, ‘‘কৃষি দফতরের আধিকারিকদের কথা মতো চাষ করব। আমাদের ১১টি বই দেওয়া হয়েছে। জমির কাজ শেষে রাতে পড়তে বসি রোজ!’’