সময়: ভোর সাড়ে চারটে।
ঘটনাস্থল: বারাবনির পাঁচগাছিয়া পঞ্চায়েতে এলাকার একটি গ্রাম।
রেল লাইনের ধারে ঘটি হাতে একটু ঝোপ-জঙ্গল দেখে সবে একটু বসেছিলেন এক প্রৌঢ়।
আচমকা ছন্দপতন! তাকিয়ে দেখেন কারা যেন হইহই করে এগিয়ে আসছেন। দলটা কাছে আসতে ঠাহর হল, সেই দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন বর্ধমানের জেলাশাসক সৌমিত্র মোহন স্বয়ং। নির্দেশ দিলেন, খোলা জায়গায় শৌচকর্ম! নৈব নৈব চ! — শুক্রবার এ ভাবেই বারাবনি ও জেলার বিভিন্ন প্রান্তে চলল অভিযান।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এ দিন ভোরে জেলাশাসকের নেতৃত্বে মহকুমা ও জেলা প্রশাসনের প্রায় আড়াইশো জনের একটি দল পাঁচগাছিয়ায় পৌঁছয়। প্রশাসনের সূত্রে জানা গিয়েছে, এলাকায় ঢোকার মুখে তিনটি দলে ভাগ হয়ে যান আধিকারিকেরা। এরপর রীতিমতো সাঁড়াশি অভিযান চলে কদমা গ্রাম, রেললাইন লাগোয়া বস্তি ও সাইডিং এলাকায়।
কেমন অভিযান হয়েছে এ দিন? স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ভোরবেলা কাউকে ঘটি বা প্লাস্টিকের বোতল হাতে যেতে দেখলেই আর রেহাই মেলেনি। সেই ব্যক্তিকে দাঁড় করিয়ে পরিচ্ছন্নতার পাঠ শিখিয়েছেন জেলাশাসক ও অন্যান্য আধিকারিকেরা। ইতিমধ্যেই যাঁরা শৌচকর্ম সেরে ফেলেছেন, তাঁদের উদ্দেশে অনুরোধ করা হয়, ‘‘যান, নোংরা মাটি চাপা দিয়ে আসুন।’’ এমনকী ‘মাটি চাপা’ দেওয়ার কাজে হাত লাগিয়েছেন প্রশাসনের আধিকারিকেরাও। যেমন, কদমা গ্রামে সদ্য শৌচকর্ম সেরে ফিরছিলেন এক বৃদ্ধ। কিন্তু শারীরিক কারণে বৃদ্ধ নোংরা মাটি চাপা দিতে না পারায় এগিয়ে যান জেলাশাসকই। অন্যদেরও নির্দেশ দেন, ‘‘কেউ মাটি চাপা না দিতে চাইলে হাত লাগান।’’
তিন ঘণ্টা ধরে অভিযান চালিয়ে সৌমিত্রবাবু তাঁর দলবল নিয়ে পৌঁছন লাগোয়া বস্তি এলাকায়। এরপরে বাসিন্দাদের বাড়িতে শৌচাগার তৈরির প্রয়োজনীয়তা, শৌচাগার তৈরিতে পঞ্চায়েত থেকে কী কী সাহায্য মেলে ইত্যাদি জানানো হয়। পাঁচগাছিয়া লাগোয়া হনুমান মন্দির থেকে ব্যানার-ফেস্টুন হাতে বের করা হয় ‘লজ্জা-যাত্রা’র। অভিযানের শেষে সৌমিত্রবাবু বলেন, ‘‘সচেতনতা বাড়াতেই এমন অভিযান। অভিযান চলবে।’’
দুর্গাপুরকে ‘নির্মল মহকুমা’ হিসেবে গড়ে তুলতে অভিযান শুরু হয়েছে সেখানেও। সপ্তাহ খানেক ধরেই ব্লক প্রশাসনের আধিকারিক, এলাকার পড়ুয়া, শিক্ষক, চিকিৎসক, আশা কর্মী, জনপ্রতিনিধিরা নিজ নিজ এলাকায় নজরদারি চালাচ্ছেন বলে জানা গিয়েছে। অন্ডালের বিডিও মানস পান্ডা জানান, সম্প্রতি দক্ষিণখণ্ড গ্রামে যান আধিকারিকেরা। সেখানে ইসিএলের কয়েকটি পরিত্যক্ত আবাসনের বাসিন্দারা কয়েকটি পরিবার পিছু শৌচাগার তৈরি করে দেওয়ার দাবি জানান।
বাড়িতে শৌচাগার থাকলেও অভ্যাসবশত অনেকেই খোলা জায়গায় শৌচকর্ম করছেন বলে দাবি আসানসোলের মহকুমাশাসক প্রলয় রায়চৌধুরী, দুর্গাপুর-ফরিদপুর ব্লকের বিডিও শুভ সিংহ রায়দের। তবে যে সমস্ত এলাকায় শৌচাগার নেই, সেখানেও প্রশাসন পদক্ষেপ করছে বলে খবর। যেমন, বারাবনির বিডিও অনিমেষ মান্না জানান, চলতি বছরের ২ অক্টোবরের মধ্যে এলাকার ৮টি পঞ্চায়েতের সব বাড়িতেই শৌচালয় বানিয়ে দিয়ে ব্লককে নির্মল করা হবে। আগামী তিন মাসের মধ্যে পাঁচগাছিয়া গ্রাম পঞ্চায়েতে শতাধিক ও একটি কমিউনিটি শৌচাগার তৈরি হবে। ব্লকের আটটি পঞ্চায়েতে ৩ হাজারেরও বেশি শৌচাগার ও ১৩টি কমিউনিটি শৌচাগার তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে। স্বাধীনতা দিবসের আগে ‘নির্মল মহকুমা’ হিসেবে গড়ে তোলার জন্য পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে দুর্গাপুরেও। সেই পরিকল্পনায় গতি আনতে আজ, শনিবার থেকে টানা পাঁচ দিন ভোরবেলায় গ্রামে গ্রামে নজরদারি চালাবেন দুর্গাপুরের মহকুমাশাসক শঙ্খ সাঁতরাও।
কোথাও শৌচকর্ম করতে দেখলেই, সঙ্গে সঙ্গে বেজে উঠবে ঢাক! — খোলা জায়গায় শৌচকর্ম রুখতে এমনই পদক্ষেপ নিয়েছেন শঙ্খবাবু। তিনি জানান, এলাকার বিভিন্ন ক্লাবের সদস্যরাও প্রশাসনের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কেউ কেউ প্রথমে বলেছিলেন, মাঠে যাব না কোথায় যাব! তবে বোঝানোর পরে সেই মানুষই এখন অন্যকে বোঝাচ্ছেন।’’ তবে মহকুমা প্রশাসন সূত্রে খবর, দুর্গাপুর-ফরিদপুর, অন্ডাল, পাণ্ডবেশ্বরকে ‘নির্মল’ করার কাজ অনেকখানি এগোলেও গলসি ১ ব্লকের কাজ তেমন সন্তোষজনক নয়। তবে ওই ব্লকের জন্য বাড়তি সময় দেওয়া হবে বলে জানান মহকুমাশাসক।
‘লজ্জা যাত্রা’ ও শৌচ কর্ম রুখতে অভিযান হয় কাঁকসার গোপালপুর পঞ্চায়েত, বিরুডিহা, ত্রিলোকচন্দ্রপুর, মানকর, মাড়ো প্রভৃতি এলাকাতেও। ছিলেন অতিরিক্ত জেলাশাসক (শিক্ষা) রত্নেশ্বর রায়, বিডিও অরবিন্দ বিশ্বাস প্রমুখ। ‘লজ্জা যাত্রা’ হয় কাটোয়ার মুস্থূলি হাটতলাতেও। ছিলেন মহকুমাশাসক মৃদুল হালদার।