আয়াদের দৌরাত্ম্যে রোগীর পরিজনদের নাভিশ্বাস দশা রাজ্যের বহু হাসপাতালে। দিন কয়েক আগেই আয়ার ধাক্কায় প্রসূতির মৃত্যুর অভিযোগ ঘিরে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটেছে কলকাতার আরজি কর হাসপাতালে। পরিস্থিতি ততটা খারাপ না হলেও আয়াদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম অভিযোগ উঠছে দুর্গাপুর মহকুমা হাসপাতালেও।
হাসপাতালে ঢোকার মুখে জ্বলজ্বল করছে আয়া নিয়ে নিষেধাজ্ঞার বোর্ড। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করেন, এক সময়ে আয়ারা ছিলেন। তবে এখন আর নেই। তাঁদের চতুর্থ শ্রেণির ঠিকাকর্মীর কাজ দেওয়া হয়েছে। অথচ, হাসপাতালের ভিতরে ঢুকে দেখা গেল, তাঁরা রয়েছেন বহাল তবিয়তেই! সংখ্যায় প্রায় ১৫ জন। নিজেরাই জানালেন, আগে ৩৩০ শয্যার এই হাসপাতালে প্রায় ৫০ জন আয়া ছিলেন। সব থেকে বেশি ছিলেন মহিলা ও প্রসূতি বিভাগে।
রোগী বা রোগীর পরিজনদের কাছে টাকা চেয়ে জোর খাটানোর অভিযোগ অবশ্য মানতে চাননি এখনকার আয়ারা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আয়া বলেন, ‘‘অভিযোগ ছিল বেশ কয়েক জনের বিরুদ্ধে। বিশেষ করে প্রসূতি বিভাগে এমন কয়েক জন ছিলেন। তবে কর্তৃপক্ষ তাঁদের সরিয়ে দিয়েছেন।’’ মিনা রায় নামে এক আয়া বলেন, ‘‘টানা ১২ ঘণ্টা রোগীর সেবা করে দেড়শো টাকা পারিশ্রমিক মেলে। সরকারি ভাবে কোনও সুবিধা মেলে না। পেটের দায়ে কাজ করি।’’
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেল, প্রসূতি বিভাগে আয়াদের রমরমা ‘রাজত্ব’ এখন আর নেই ঠিকই। তবে সুযোগ-সুবিধা বুঝে প্রসূতি বা মহিলা বিভাগের রোগীর পরিজনদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের ‘ট্র্যাডিশন’ রয়েছেই। রোগীর পরিজনেরা না চাইলেও অন্তঃসত্ত্বাকে ভর্তির সময় থেকেই এক জন আয়া নজরদারি শুরু করে দেন। অভিযোগ, ভর্তির পর থেকে টুকটাক কাজে সাহায্য করা, রাতে সঙ্গে থাকা এ সবের জন্য দৈনিক পারিশ্রমিক তো আছেই, সঙ্গে উপরি পাওনা আদায়ে জোর-জবরদস্তিও কম থাকে না। সদ্যোজাতকে পরিষ্কার করে দেওয়ার জন্য আয়াকে দিতে হয় কমপক্ষে দু’শো টাকা। সদ্যোজাতের ‘মুখ’ দেখার জন্য, সন্তান নিয়ে হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময়েও টাকা চান আয়ারা। মনের মতো না হলে দু’কথা শুনিয়ে দিতেও তাঁরা পিছপা হন না বলে অভিযোগ মহিলা ও প্রসূতি বিভাগে ভর্তি থাকা রোগীদের বাড়ির লোকজনের। সব মিলিয়ে আয়াদের পিছনে মোটা অর্থই ব্যয় করতে হয় বলে দাবি করেন তাঁরা। তবে হাসপাতাল সুপার দেবব্রত দাসের বক্তব্য, ‘‘আয়াদের বিষয়ে অতীতে কিছু অভিযোগ ছিল। তাঁদের ঠিকাকর্মী হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কেউ লিখিত অভিযোগ করেননি।’’
সরকারি হাসপাতালে নার্সের সংখ্যা পর্যাপ্ত না হলে শুধু নিয়ম করে আয়াদের উপস্থিতি আটকানো যাবে না বলেই মনে করেন রোগীর পরিজনেরা। তাঁদের মতে, এই সুযোগটাই কাজে লাগান আয়ারা। মহিলা রোগীকে শৌচাগারে আনা-নেওয়া, ঋতুস্রাব সংক্রান্ত সমস্যায় সাহায্য করেন তাঁরা। পরিষেবা পাওয়ার জন্য টাকা খরচ করতে আপত্তি জানান না অবস্থাপন্ন রোগীর পরিজনেরা। কিন্তু সমস্যায় পড়েন দুঃস্থ পরিবার থেকে আসা রোগীর বাড়ির লোকজন। কাঁকসার বিদবিহার এলাকা থেকে হাসপাতালে আসা মৌমিতা মণ্ডল বলেন, ‘‘আমাদের আর্থিক অবস্থা ভাল নয়। আয়াদের বায়নাক্কা মেটানো কি আমাদের পক্ষে সম্ভব? অথচ, দিতেও হল। কিছু তো করার নেই।’’ তাঁর দাবি, ৩০-৪০ জন রোগীর জন্য নার্স মাত্র দু’তিন জন। তাই শুধু নার্সদের উপরে ভরসা করা যায় না। সে কারণেই এ সব সহ্য করতে হয় রোগীর বাড়ির লোকজনকে।