পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধের আঁচ পড়েছে এ দেশেও। চিন্তা বাড়ছে রান্নার গ্যাসের সরবরাহ নিয়ে। সিলিন্ডার মজুত থাকলেও বহু ক্ষেত্রেই ডিলারেরা স্বাভাবিক ভাবে সরবরাহ করছেন না বলে অভিযোগ। কোথাও দাম নেওয়া হচ্ছে বেশি। কোথাও সিলিন্ডার নিতে হচ্ছে ডিপো থেকে। স্কুলের মিডডে মিল, হোটেল, মিষ্টি ব্যবসায়ী, ক্যাটারেরাও উদ্বিগ্ন। তাঁদের দাবি, সিলিন্ডারের অভাব নেই, সেটা বোঝা যাচ্ছে। বাণিজ্যিক গ্যাস নিয়ে কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হয়েছে। এ সব কানে গিয়েছে জেলা পুলিশের দুর্নীতি দমন শাখা বা ডিইবি-র। জেলা পুলিশের এক আধিকারিক বলেন, “কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে কালোবাজারির চেষ্টা হচ্ছে। কোথায় কোথায় সিলিন্ডার মজুত রয়েছে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। হানা দেওয়ার নির্দেশও চলে এসেছে।”
প্রধান শিক্ষকদের সংগঠন ‘অ্যাডভান্স সোসাইটি ফর হেডমাস্টার অ্যান্ড হেডমিস্ট্রেস’-র তরফে জানানো হয়েছে, গলসির দিকে বেশ কিছু ডিলারেরা জানিয়েছে, সিলিন্ডার নেওয়ার জন্য লম্বা লাইন পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে স্কুলে স্কুলে গিয়ে মিড-ডে মিলের রান্নার গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব নয়। স্কুল কর্তৃপক্ষকে লাইনে দাঁড়িয়ে গ্যাস সিলিন্ডার নিতে হবে। সংগঠনের জেলা সভাপতি অনির্বাণ দাশগুপ্ত বলেন, “মিড-ডে মিল চালাতে জেলার স্কুলগুলিতে সপ্তাহে তিন থেকে ছ’টা সিলিন্ডার লাগে। বুকিং করতে সমস্যা হচ্ছে। স্কুল চালাব না সিলিন্ডার আনতে যাব?” তাঁদের প্রশ্ন, স্কুল থেকে ১০-১২ কিলোমিটার দূরে ডিপো। যাতায়াতের খরচ কী ভাবে পাওয়া যাবে?
ওই সংগঠনের জেলা সম্পাদক সৌমেন কোনার বলেন, “ডিলারেরা বর্ধমান শহরের স্কুলেও একই কথা বলেছেন। অথচ সিলিন্ডার নেই, এমন নয়। কালোবাজারি তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে।” ওই সংগঠনের তরফ থেকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশকে জানানো হয়েছে। একাধিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের দাবি, রান্নার গ্যাস মজুত না থাকলে মিড-ডে মিল চালানো নিয়ে চিন্তা থাকে। বুকিং করার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে রান্নার গ্যাস মিলত। কিন্তু গত সপ্তাহ থেকেই ডিলারদের মুখে ‘নেই, নেই’ শোনা যাচ্ছে।
‘বর্ধমান হোটেল ও রেস্টুরেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের’ সম্পাদক শুভ্রম সেনগুপ্ত বলেন, “বাণিজ্যিক রান্নার গ্যাসের কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করা হচ্ছে। গা-জোয়ারি করা হচ্ছে। পুরোটাই সাংগঠনিক ও পরিকল্পিত।’’ ক্যাটারার ব্যবসায়ী সত্যজিৎ দত্ত বলেন, “গুদামগুলিতে হানা দিলেই সব পরিষ্কার হয়ে যাবে।”
গ্যাসের বিকল্প পথের কথা ভাবছেন কালনার ব্যবসায়ীরা। শহরের একটি মিষ্টির দোকানের মালিক রনজিৎ মোদক জানান, চন্দনগরের একটি নামী সংস্থা জলভরা সন্দেশ তৈরির জন্য তাঁদের কাছে পাইকারি দরে বাটা সন্দেশ কেনেন। গ্যাসের অভাবে মিষ্টি গড়তে সমস্যা হচ্ছে বলে আপাতত সন্দেশ নেবেন না বলে জানিয়েছেন তাঁরা। কারখানায় উনুনের সংখ্যা বাড়িয়ে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা হচ্ছে বলে জানান তিনি।
শহরের পুরনো বাসস্ট্যান্ডের কাছে একটি রেস্তোরাঁর তরফে সাহেব সাহা জানান, প্রতিদিন তাঁদের তিনটি বাণিজ্যিক সিলিন্ডার প্রয়োজয় হয়। যত দিন গ্যাস থাকবে প্রতিষ্ঠান চলবে। মিষ্টি ব্যবসায়ী দেবরাজ বারুই বলেন, ‘‘এই পরিস্থিতিতে কোনও অনুষ্ঠানের জন্য মিষ্টির বরাত নিতে সাহসহচ্ছে না।’’
শুরু হয়েছে রাজনৈতিক বিতর্কও। জেলা পরিষদের শিক্ষা কর্মাধ্যক্ষ শান্তনু কোনারের দাবি, ‘‘কেন্দ্রীয় সরকার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেয়নি। যুদ্ধের আবহের মধ্যেই গ্যাস সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়েছে।’’ বিজেপির বর্ধমান-দুর্গাপুর সাংগঠনিক জেলার মুখপাত্র সৌম্যরাজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাল্টা দাবি, “তৃণমূল পরিকল্পিত ভাবে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। কৃত্রিম সঙ্কট ও কালোবাজারি রুখতে ব্যবস্থা নিচ্ছে না কেন রাজ্য সরকার?” জেলা প্রশাসন বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে বলেও জানানো হয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)