Advertisement
E-Paper

কারখানা বন্ধই, ভোটের আগে দোলাচলে কর্মীরা

কারখানা খোলার উদ্যোগ শুরু হয়েছে অনেক দিন ধরেই। পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোঁ বাজেনি এমএএমসি-তে। লোকসভা ভোটের পরে কেন্দ্রে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার কোনও প্রভাব কারখানা খোলার প্রক্রিয়ায় পড়ে কি না, সে নিয়ে এখন দোলাচলে দুর্গাপুরের বাসিন্দারা। কেন্দ্রীয় সরকারের ভারী শিল্প মন্ত্রকের অধীনে ১৯৬৫ সালে চালু হয় কারখানাটি। মূলত খনির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি হত এখানে। এক সময়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার শ্রমিক-কর্মী ছিলেন।

সুব্রত সীট

শেষ আপডেট: ২৬ মার্চ ২০১৪ ০০:১৭
এমএএমসি কারখানা। —ফাইল চিত্র।

এমএএমসি কারখানা। —ফাইল চিত্র।

কারখানা খোলার উদ্যোগ শুরু হয়েছে অনেক দিন ধরেই। পদ্ধতিগত প্রক্রিয়াও শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ভোঁ বাজেনি এমএএমসি-তে। লোকসভা ভোটের পরে কেন্দ্রে কী পরিস্থিতি তৈরি হয়, তার কোনও প্রভাব কারখানা খোলার প্রক্রিয়ায় পড়ে কি না, সে নিয়ে এখন দোলাচলে দুর্গাপুরের বাসিন্দারা।

কেন্দ্রীয় সরকারের ভারী শিল্প মন্ত্রকের অধীনে ১৯৬৫ সালে চালু হয় কারখানাটি। মূলত খনির কাজে ব্যবহৃত বিভিন্ন যন্ত্রপাতি তৈরি হত এখানে। এক সময়ে প্রায় সাড়ে সাত হাজার শ্রমিক-কর্মী ছিলেন। পরে নানা কারণে কারখানা রুগ্ণ হতে থাকে। ১৯৯২ সালে এমএএমসি চলে যায় বিআইএফআর-এ। বিআইএফআর কারখানা বন্ধের সুপারিশ করে। কলকাতা হাইকোর্ট তা অনুমোদন করে। ২০০১ সালের ৫ অক্টোবর পাকাপাকি ভাবে বন্ধ হয়ে যায় কারখানাটি। প্রায় দেড় হাজার শ্রমিক-কর্মী স্বেচ্ছাবসর নেন। ২০০৫ সালের ২৮ এপ্রিল কারখানা চলে যায় হাইকোর্ট নিযুক্ত লিক্যুইডেটরের অধীনে।

এমএএমসি নতুন করে চালুর সম্ভাবনা দেখা দেয় প্রথম ইউপিএ সরকারের আমলে। কারখানাটি অধিগ্রহণ করে তা নতুন করে চালু করার আগ্রহ দেখায় তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বিইএমএল, কোল ইন্ডিয়া এবং ডিভিসি। তিন সংস্থা ২০০৭ সালের ১ জুন ‘মউ’ স্বাক্ষর করে একটি কনসর্টিয়াম গড়ে। বিইএমএল-এর অংশীদারিত্ব ৪৮ শতাংশ। কোল ইন্ডিয়া এবং ডিভিসি-র ২৬ শতাংশ করে। ২০১০ সালের ১১ জুন হাইকোর্ট নিলামে সর্বোচ্চ ১০০ কোটি টাকা দর দিয়ে এমএএমসি-র দায়িত্ব নেয় কনসর্টিয়াম। ২০১০ সালের ১৮ অগস্ট কারখানার দায়িত্ব বুঝে নেয় কনসর্টিয়াম। তিন সংস্থার নিজেদের মধ্যে চুক্তি অনুযায়ী, এমএএমসি’র নতুন নাম ‘এমএএমসি ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড’। কারখানায় উৎপাদনের দায়িত্বে থাকবে বিইএমএল। উৎপাদিত খনির যন্ত্রাংশ কিনবে কোল ইন্ডিয়া। তাদের তোলা কয়লা কিনবে ডিভিসি। বাইরের বরাতের ভরসায় বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, শুরুতেই প্রতিযোগিতায় নামার মতো পরিস্থিতি নতুন সংস্থার থাকবে না বলে ধারণা তিন সংস্থার কর্তাদের। কারখানা খোলার সম্ভাবনা চূড়ান্ত হওয়ার আনন্দে আবির খেলায় মেতে ওঠেন কারখানার পুরনো শ্রমিক-কর্মী ও তাঁদের পরিবার। কিন্তু তার পর কেটে গিয়েছে প্রায় চার বছর। নানা জটিলতায় কারখানা এখনও চালু হয়নি।

কেন এই পরিস্থিতি? কনসর্টিয়াম সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রথম সমস্যা দেখা দেয়, কারখানার মোট ১৯৩ একর জমিই বিইএমএলের নামে রেজিস্ট্রেশন হওয়ায়। এমন পরিস্থিতিতে বাকি দুই সংস্থাকে থাকতে হবে বিইএমএলের অধীনে। তাতে আপত্তি জানায় কোল ইন্ডিয়া এবং ডিভিসি। সমস্যা মেটানোর প্রক্রিয়া শুরু হয় ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে। ডিভিসি এবং কোল ইন্ডিয়া নিজেদের ‘বোর্ড অফ ডিরেক্টর্স মিটিং’য়ে শেয়ার হোল্ডিং এগ্রিমেন্ট চূড়ান্ত করে। শেয়ার হোল্ডিং এগ্রিমেন্টের ড্রাফ্ট দুই সংস্থা জমা দেয় বিইএমএলের কাছে। অক্টোবরে বিইএমএল পুরো বিষয়টি জানায় প্রতিরক্ষা মন্ত্রককে। কারণ, বিইএমএল প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের অধীনস্ত সংস্থা। তাই ওই মন্ত্রকের ছাড়পত্র না পেলে তারা এগোতে পারবে না। সেই ছাড়পত্র এখনও আসেনি।

কারখানার সিটু নেতা তথা সংগঠনের জেলা সভাপতি বিনয়েন্দ্রকিশোর চক্রবর্তী অভিযোগ করেন, এনডিএ-র মতো ইউপিএ সরকারও চেয়েছিল এমএএমসি কারখানা বেসরকারি হাতে তুলে দিতে। কিন্তু তিন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা কনসর্টিয়াম গড়ে এগিয়ে আসায় তা আটকে যায়। তাঁর দাবি, “বামফ্রন্ট সরকারের আমলে মুখ্যমন্ত্রী, শিল্পমন্ত্রী কারখানা খোলার দাবিতে বারবার চিঠি দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীকে। লাভ হয়নি। আসলে না কেন্দ্রীয় সরকার, না বর্তমান রাজ্য সরকারকোনও পক্ষই এমএএমসি খোলার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। তাই রাজ্য সরকারও হাত গুটিয়ে বসে আছে।” অভিযোগ উড়িয়ে তৃণমূলের জেলা (শিল্পাঞ্চল) সভাপতি অপূর্ব মুখোপাধ্যায় বলেন, “কারখানা খোলার বিষয়টি তিনটি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থার হাতে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অনেক আগে থেকেই এমএএমসি খোলার ব্যাপারে উদ্যোগী ছিলেন। রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে পার্থ চট্টোপাধ্যায় শিল্পমন্ত্রী থাকাকালীন কনসর্টিয়ামের কর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।” বর্ধমান-দুর্গাপুর কেন্দ্রের সিপিএম প্রার্থী তথা সাংসদ সাইদুল হক বলেন, “আমাদের লোকসভার নেতা বাসুদেব আচারিয়াকে নিয়ে আমি প্রতিরক্ষা মন্ত্রী একে অ্যান্টনির সঙ্গে দেখা করে বিষয়টি জানিয়েছি। ফেব্রুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি চিঠি দিই। কিন্তু কোনও উদ্যোগ নজরে আসেনি।”

কারখানার প্রাক্তন শ্রমিক-কর্মীদের দাবি, এমএএমসি টাউনশিপ ছিল দুর্গাপুরের অন্যতম সেরা। স্কুল, হাসপাতাল, বাজার থেকে শুরু করে স্টাফ ক্লাব, সিনে ক্লাব, সুইমিং ক্লাবসব ছিল। কারখানা ফের চালু হলেও টাউনশিপের সেই সুদিন ফেরার সম্ভাবনা নেই। কারণ, কারখানা ও আবাসন এলাকা বহু আগেই পৃথক করে দিয়েছে কোর্ট। তবে কারখানায় উৎপাদন শুরু হলে এলাকার আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি যে বদলে যাবে সে ব্যাপারে সবাই একমত। কিন্তু কারখানা খোলা নিয়ে এত টানাপড়েন কয়েক বছর ধরে তাঁরা দেখেছেন, যে বিশেষ ভরসা করতে পারছেন না তাঁরা। এমএএমসি-র আইএনটিইউসি অনুমোদিত ‘হেভি ইঞ্জিনিয়ারিং ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন’-এর সাধারণ সম্পাদক অসীম চট্টোপাধ্যায় বলেন, “কনসর্টিয়াম দায়িত্ব নেওয়ার পরে চার বছর কেটে গিয়েছে। কারখানা খোলেনি। ভোটের পরে পরিস্থিতি কী হবে কেউ, জানে না। সকলেই তাই আশা-নিরাশায় ভুগছেন।”

factory lockout subrata shit durgapur mamc factory
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy