কেমন দেখতে হয় খনিগর্ভ? কেমন ছিল দ্বারকানাথ ঠাকুরের খনি? জৈন সভ্যতার এক টুকরো নিদর্শন থেকে বিদ্রোহী কবির জন্মভিটেআসানসোলকে ঘিরে এই সমস্ত বিষয়কে পর্যটনের মানচিত্র তুলে আনার চিন্তা-ভাবনা হয়েছে বারবার। তাতে পর্যটকদের আনাগোনায় উন্নতি হত শহরেরই। কিন্তু কাজের কাজ তেমন কিছু হয়নি। কোনও জায়গা এখনও পড়ে ধ্বংসস্তূপ হয়ে, কোথাও আগে নানা পরিকাঠামো গড়ে তোলা হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে তা ফের বেহাল।
খনিগর্ভ নিয়ে আগ্রহী পর্যটকদের কৌতূহল মেটাতে আসানসোল খনি অঞ্চলে একটি বিশেষ ধরনের পর্যটনের ভাবনা শুরু হয়েছিল কয়েক বছর আগে। আসানসোল বণিকসভার তরফে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, বন্ধ হয়ে যাওয়া অপেক্ষাকৃত নিরাপদ খনিগুলি পর্যটকদের ঘুরিয়ে দেখানো যেতে পারে। সরকারের কাছে তাঁরা এই প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে জানান বণিকসভার সভাপতি সুব্রত দত্ত। সরকারের তরফে এ নিয়ে চিন্তাভাবনার আশ্বাসও দেওয়া হয়। কিন্তু ওই পর্যন্তই। তার পরে আর বিষয়টি এগোয়নি।
১৭৭৪ সালে ব্রিটিশদের সঙ্গে যৌথ ভাবে কয়লা খনি তৈরি করেছিলেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর। সেই ‘কার অ্যান্ড টেগোর’ খনির ধ্বংসাবশেষ এখনও দেখতে পাওয়া যায় রানিগঞ্জের নারায়ণকুড়িতে। ভূগর্ভে সুড়ঙ্গ তৈরি করে কয়লা তোলার যে পদ্ধতি তাঁরা ব্যবহার করেছিলেন, সে ভাবে এখনও কয়লা তোলা হচ্ছে। খনি থেকে তোলা কয়লা বড় বড় নৌকায় চাপিয়ে দামোদর দিয়ে পরিবহণ করা হত। সেই জেটি আজও দামোদরের পাড়ে রয়েছে। খনি বিশেষজ্ঞেরা মনে করেন, গোটা জায়গাটি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। দ্বারকানাথের এই খনি ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র হলে এলাকার চেহারাই বদলে যাবে। কিন্তু জায়গাটি সংরক্ষণ বা তাকে ঘিরে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার কোনও উদ্যোগই এখনও পর্যন্ত হয়নি। ভেঙেচুরে পড়ে রয়েছে সেই খনি এলাকা। রানিগঞ্জ বণিকসভার সম্পাদক রাজেন্দ্রপ্রসাদ খেতান আবার জানান, শুধু দ্বারকানাথের খনি নয়, এলাকার প্রাচীন খনিগুলি নিয়ে পর্যটন শিল্প গড়ে তোলার প্রস্তাব রাজ্য সরকারের কাছে তাঁরা দিয়েছেন।
দ্বারকানাথের খনির ভগ্ন দশা।
আসানসোল শহর থেকে মাত্র কুড়ি কিলোমিটার গেলেই মেলে বহু প্রাচীন জৈন সভ্যতার নিদর্শন। বারাবনির পুঁচরায় এখনও রয়েছে প্রায় ৭০টি জৈন পরিবার। সেখানে মাটি খুঁড়ে পাওয়া গিয়েছে দেড় হাজার বছরের পুরনো জৈন দেবদেবীর মূর্তি। উদ্ধার হয়েছে পাঁচ চুড়াযুক্ত জৈন মন্দির। ১৯৭৫ সালের অগস্টে প্রথম বার এই সভ্যতা যাচাই করে যান রাজ্যের প্রাক্তন প্রত্নতত্ব অধিকর্তা পরেশচন্দ্র দাশগুপ্ত। এর পরে ১৯৮৩ সালের ৮ জুন ও ১৯৮৬ সালের ১৯ জুন দু’বার গ্রামে ঘুরে যান সরকারের প্রত্নতত্ত্ব দফতরের পশ্চিম চক্রের আধিকারিক প্রতীপকুমার মিত্র। এই গ্রামকে পর্যটন কেন্দ্রের মর্যাদা দেওয়ার দাবি তোলেন গ্রামবাসীরা। একই দাবি জেলা হেরিটেজ অ্যাসোসিয়েশনেরও।
বারাবনিতেই পানিফলা উষ্ণ প্রস্রবণ কেন্দ্র ঘিরে এক সময়ে পর্যটনের উজ্জ্বল সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু এখন তা-ও ভেঙেচুরে পড়ে। উপযুক্ত যোগাযোগ ব্যবস্থার অভাবে সেখানে বাইরের মানুষজনের আসা-যাওয়া তেমন নেই। আসানসোল থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরেই রয়েছে চুরুলিয়া, যেখানে জন্মেছিলেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর জন্ম ভিটে, তাঁর ব্যবহার করা পোশাক, বাদ্যযন্ত্র, পাণ্ডুলিপি-সহ অনেক জিনিস এখানে সযত্নে সংরক্ষিত রয়েছে। নিয়মিত বহু লোকজনও এখানে যাতায়াত করেন। কিন্তু, রাজ্য সরকারের তরফে একটি যুব আবাস তৈরি করা ছাড়া পর্যটন কেন্দ্রের উপযুক্ত পরিকাঠামো গড়ে তোলার ব্যাপারে কোনও পদক্ষেপ করা হয়নি বলে আফশোস গ্রামবাসীদের। নজরুল অ্যাকাডেমির সম্পাদক তথা কবির ভাইপো মাজাহার হোসেনের আশা, আসানসোলের পর্যটন শিল্পের উন্নতি হলে এখানেও ভ্রমণার্থীদের আসা-যাওয়া বাড়বে।
দাবি রয়েছে মাইথনকে আরও সাজিয়ে তোলার।
প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছরের প্রাচীন মন্দির ও শিব মূর্তি সংরক্ষণ করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ বরাকরকে একপ্রকার ভ্রমণকেন্দ্রের মর্যাদা দিয়েছে। প্রায় সাড়ে তিনশো বছরের পুরনো কল্যাণেশ্বরী মন্দিরের টানেও বছরভর বহু পর্যটকের আনাগোনা হয়। রাজ্যের পর্যটন মানচিত্রে মাইথন উঠে এসেছে অনেক দিন আগেই। সেই পর্যটন কেন্দ্রের আরও উন্নতির পরিকল্পনার কথা সম্প্রতি শুনিয়েছে জেলা পরিষদ।
আসানসোলের আশপাশে এই সব ভ্রমণস্থলগুলিকে ঠিক মতো রক্ষণাবেক্ষণ ও পর্যটকদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার ব্যবস্থা হলে আখেরে শহরেরই লাভ হবে বলে মনে করেন বাসিন্দারা। তাঁদের মতে, সেক্ষেত্রে শহরের হোটেল ব্যবসা ও পরিবহণ ব্যবসার আরও উন্নতি হবে। শহরের চিকিত্সক অরুণাভ সেনগুপ্তের কথায়, “সরকার এখানকার পর্যটন শিল্পের দিকে খানিকটা নজর দিলে অর্থনৈতিক দিক থেকে আরও লাভবান হবে আসানসোল।” আয়ের পথ সুগম করতে এ দিকে সরকারের তরফে নজরের দরকার রয়েছে বলে মনে করেন আসানসোল বণিকসভার সভাপতি সুব্রতবাবুও।
আসানসোলের বিজেপি সাংসদ বাবুল সুপ্রিয় বলেন, “মাইথন, দ্বারকানাথের খনি, উষ্ণ প্রস্রবণ কেন্দ্রসবই সুন্দর করে সাজিয়ে তোলা দরকার। সেগুলি আমার নজরে রয়েছে। সাংসদ তহবিলের সাহায্যে এই কাজ করার চেষ্টা করব।”
(শেষ)
ছবি: শৈলেন সরকার।