কোমরে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল মেয়েটি। সামনে, কিছুটা দূরে ছেলেটি হেঁটে যাচ্ছে। বোধহয় ঝগড়া হয়েছে দু’জনের মধ্যে। মেয়েটি ভিড়ের মধ্যেই চিৎকার করে বলল, ‘আব্বে ইয়ার এরকম করলে চলে!’..ছেলেটি থামল। ঘুরে বলল, ‘আবার!
আবার আব্বে ইয়ার!’ মেয়েটি এবার হেসে ফেলেছে। হেসে জিভ কেটে বলল, ‘সরি সরি! প্লিজ!’ বলেই কান ধরল মেয়েটি। ছেলেটি ততক্ষণে গলে জল।
ধর্মতলা মেট্রো স্টেশনে দুই অল্পবয়সির কাণ্ডকারখানা দেখে অনেকের মুখেই তখন মুচকি হাসি। তাঁরাও স্বস্তির শ্বাস ফেললেন! যাক ঝামেলা মিটল তা হলে! অন্তত তখনকার মতো। কিন্তু ‘বন্ধু’র জায়গায় ‘ইয়ার’, ‘ওই’-এর জায়গায় ‘আব্বে’— এই ‘দ্বন্দ্ব’ বোধহয় মিটল না! আর প্রতিদিনের জীবনের এই যে দ্বন্দ্ব, ‘বন্ধু’র সঙ্গে ‘ইয়ারে’র, পাঞ্জাবির সঙ্গে কুর্তার, ঘোলের সঙ্গে লস্যির, দীপাবলির সঙ্গে দিওয়ালি-ধনতেরাসের সেই দ্বন্দ্ব, সেই সংঘাতকেই শুক্রবার আবারও উস্কে দিল ‘দেশ’-এর ‘বাঙালি এখন হিন্দির দাসত্ব করতেই স্বচ্ছন্দ’ শীর্ষক বিতর্কসভা।
শক্তি, ক্ষমতা ও ব্যবহার অনুসারে ভাষার নিজস্ব একটি মাৎস্যন্যায় চরিত্র রয়েছে, যা দ্রুত অন্য ভাষার অস্তিত্বকে বিপন্ন করতে পারে, বদলে দিতে পারে অন্য ভাষার নিজস্ব কাঠামো, বিন্যাস। বিশেষ করে সে ভাষা যদি হিন্দির মতো ‘রাষ্ট্রভাষা’ মর্যাদার বলে বলীয়ান হয়। হিন্দি ভাষার সেই ‘আগ্রাসনে’ বাংলা ভাষা কতটা অক্ষুণ্ণ থাকবে, বা আদৌ রয়েছে কি না, তা নিয়েই এদিন যুক্তি-বুদ্ধি-বিশ্লেষণ-তর্ক-প্রতি তর্কের ময়দানে নেমেছিলেন ছ’জন বক্তা। সভার মতের পক্ষে বক্তা ছিলেন চিত্রশিল্পী রামানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায়, লেখক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও গায়ক রূপম ইসলাম। আর বিপক্ষের বক্তারা ছিলেন কবি কৃষ্ণা বসু, নাটক-সঙ্গীত গবেষক দেবজিত্ বন্দ্যোপাধ্যায় ও কবি বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়।
কখনও ঝো়ড়ো ব্যাটিং, কখনও শ্লেষ, কখনও রসিকতা, আবার কখনও নিখাদ যুক্তি সাজিয়ে এদিন পরস্পরকে বিদ্ধ করলেন তাঁরা। পরস্পর-বিরোধিতার মুখে দাঁড়িয়েও পরস্পরের যুক্তি ছুঁয়ে গেলেন তাঁরা।
সভার পক্ষে বলতে উঠে স্বভাবজাত বিনম্র ভঙ্গিতে শুরু করলেন রামানন্দবাবু। বিহারে নিজের বড় হওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে বর্তমান জীবনের ধারাভাষ্য মিশিয়ে তিনি বললেন, ‘‘বিহারি হিন্দিভাষার কথা বলছি না। কিন্তু নিজেরা সমীক্ষা করলেই দেখা যাবে যে, অফিস-কাছারিতে বাঙালিরা হিন্দির দাসত্ব করার মতোই কথা বলছেন।’’ যে কথাকে সদর্পে উড়িয়ে দিলেন পরবর্তী বক্তা কবি কৃষ্ণা বসু বললেন, ‘‘বাংলায় হিন্দি শব্দ, ইংরেজি শব্দ, আরবি-ফারসি শব্দ, কত যে শব্দ ঢুকেছে, তার ইয়ত্তা নেই। বাংলা ভাষায় সে বৈচিত্র্য রয়েছে। বিনোদনের জন্য মাঝেমধ্যে আমরা হিন্দির কাছে যাচ্ছি বটে, কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, হিন্দির দাসত্ব করছি।’’
পরবর্তী বক্তা রূপম তথ্য দিয়ে বললেন, কী ভাবে বাংলা মাধ্যম স্কুল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে! অনেকে তো বাংলা তুলেও দিতে বলছেন। রূপম প্রাসঙ্গিক চিন্তার খোরাকও দিয়ে গেলেন যখন বললেন, ‘‘কখন ঢেঁড়স ভেন্ডি হয়ে গেল তা বুঝলাম না। অথচ বরাবর আমরা ঢেঁড়স হিসেবেই জেনে এসেছি!’’ যখন কেউ কিছু না পারে, তখন তাঁকে বাঙালিরা ঢেঁড়স-ই বলে এখনও। ভেন্ডি নয়! রূপমের পাল্টা বলতে উঠে মন্তব্য দেবজিত্বাবুর, যা শুনে হাস্যরোল উঠল সভাঘরে। দেবজিত্বাবু জানালেন, হিন্দির দাসত্ব তো দূর, বরং বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি থেকে ‘ধার করেই’ সমৃদ্ধ হচ্ছে হিন্দি বলয়।
হিন্দির রাজনৈতিক আগ্রাসনের কথা আবার মনে করিয়ে দিলেন লেখক সঙ্গীতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বললেন, হিন্দি ভাষার স্বাভাবিক কর্তৃত্বের ক্ষমতা রয়েছে। বাংলা ভাষায় সেখানে মায়া-মমতা বেশি। কর্তৃত্বের ক্ষমতা যেহেতু বেশি, তাই ভয়ও বেশি। রাম নবমীর প্রসঙ্গ তুলে সঙ্গীতা বললেন, ‘‘হিন্দি বলয়ের রাজনৈতিক আগ্রাসন হলে কিন্তু তা গ্রহণ করতে পারব না।’’ বিতর্কের শেষ বক্তা বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অবশ্য সাফ যুক্তি, বাঙালিরা হিন্দিকে শুধুমাত্র ব্যবহার করছেন। অবাঙালিদের নিরামিষ খাবার প্রথা বাঙালিরা অনুসরণ করেছেন, সে খাদ্য-তত্ত্ব সপাটে উড়িয়ে দিয়ে বিনায়ক জানালেন, শ্রীচৈতন্যের আমলে বাঙালিদের নিরামিষ খাবারের বহুল আয়োজনের কথা।
হিন্দির আগ্রাসনে বাংলার বিপন্নতা নতুন কিছু নয়। তখনও কলকাতা বিমানবন্দরের অত্যাধুনিক টার্মিনালের উদ্বোধন হয়নি। ২০১২ সাল। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আক্ষেপ করেছিলেন, তাঁর মন ‘কু-ডাক’ ডেকেছিল, ইংরেজি-হিন্দির পাশাপাশি ‘কলকাতার নতুন বিমানবন্দরে কি একটাও বাংলা অক্ষর দেখা যাবে?’
ফলে সংশয় রয়েছে। দ্বিধা রয়েছে। কিন্তু পুরোপুরি হিন্দির পরাধীন বাংলা? মনে হয় না! কারণ, বক্তাদের পারস্পরিক যুক্তি-স্ফূলিঙ্গে যতই প্রাক্-বর্ষার সন্ধ্যার উত্তাপ বাড়ুক না কেন, তাঁরাও মোটামুটি একমত, যে ভাষা শ্বাস-প্রশাসের সঙ্গে মিশে রয়েছে, সে ভাষা এত সহজে ছিন্ন হয় নাকি! তাই সঞ্চালক লেখক-গবেষক সুধীর চক্রবর্তী যখন কোন পক্ষ জিতল জানার জন্য দর্শকদের হাত তুলতে বললেন, তখন দেখা গেল সিংহভাগ হাতই উঠেছে সভার মতের বিপক্ষে। অর্থাৎ, বাঙালি হিন্দির দাসত্ব করতে স্বচ্ছন্দ নয়!
হিন্দি আছে, নিজের প্রবল আগ্রাসন নিয়েই আছে! কিন্তু একইভাবে মাটির কাছাকাছি রয়ে গিয়েছে, থাকবেও, আবহমানের ‘বৃষ্টিভেজা বাংলাভাষা’!