তাত্ত্বিক লড়াই তাঁর রাজনীতিতে গৌণ। বরাবরই মাঠ-ময়দানের রাজনীতি তাঁর বাহন। যে কোনও ঘটনাপ্রবাহে চমকপ্রদ ব্যক্তিগত সক্রিয়তা তাঁকে বার বার প্রতিপক্ষের চেয়ে কয়েক ধাপ করে এগিয়ে দিয়েছে। বুধবার সুপ্রিম কোর্টে যে বেনজির ছবি তিনি তৈরি করলেন, তা-ও সেই পথে হেঁটেই।
এসআইআর সংক্রান্ত টানাপড়েনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কি আরও একবার এগিয়ে গেলেন তাঁর প্রধান প্রতিপক্ষের চেয়ে? সেই প্রতিপক্ষ বিজেপির দাবি, সুপ্রিম কোর্টে যে মামলা মমতা করেছেন এবং তাতে সওয়াল করেছেন, তাতে বরং অচিরেই রাজ্য সরকারের অস্বস্তি বাড়তে চলেছে। কিন্তু দেশের সর্বোচ্চ আদালতে দাঁড়িয়ে মমতা যে দৃশ্যপট তৈরি করেছেন, তাতে আপাতত রাজনৈতিক লাভ যে তিনি নিজের ঘরেই তুলেছেন, সে কথা রাজ্য বিজেপি নেতারা একান্ত আলাপচারিতায় মানছেন।
বিজেপি ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি নিয়েছিল। সুপ্রিম কোর্টে মমতা ঠিক কী করেন, তা না-দেখা পর্যন্ত কেউ কোনও মন্তব্য করতে চাইছিলেন না। সমাজমাধ্যমে বিদ্রূপাত্মক পোস্ট করা থেকেও তারা বিরত ছিল। যেমন তৃণমূল শিবিরে ছিল ঠিক বিপরীত মেজাজ। মঙ্গলবার থেকেই আইনজীবীর পোশাক পরিহিতা মমতার ছবি পোস্ট করা শুরু করেছিলেন তৃণমূলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী। দেশের ইতিহাসে প্রথম বার কোনও মুখ্যমন্ত্রী তাঁর ‘রাজ্যবাসীর অধিকার রক্ষায়’ নিজে সর্বোচ্চ আদালতের এজলাসে গিয়ে দাঁড়াচ্ছেন— এই ভাষ্য তুলে ধরা হচ্ছিল। তাকে ‘ঐতিহাসিক’ আখ্যাও দেওয়া হচ্ছিল।
আরও পড়ুন:
বুধবার প্রধান বিচারপতির ডিভিশন বেঞ্চে মুখ্যমন্ত্রীর ‘সওয়াল’ শেষ হতেই না হতেই তৃণমূলের তরফ থেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ শুরু হয়। সুপ্রিম কোর্টে মমতার ‘সওয়ালে’ তৃণমূলের ‘বিরাট জয়’ হয়েছে বলে দাবি করাও শুরু হয়।
সুপ্রিম কোর্ট পর্ব শেষ হওয়ার পরে বিজেপি মাঠে নামতে দেরি করেনি। সর্বাগ্রে সমাজমাধ্যমে ভিডিয়ো পোস্ট করা হয়। সুপ্রিম কোর্টে বুধবার যে সওয়াল-জবাব হয়েছে, তার নানা অংশ কেটে পোস্ট করা শুরু হয়। কোনও অংশে আদালত মমতাকে বলছে, তাঁর আইনজীবী শ্যাম দিওয়ানজি যথেষ্ট দক্ষ। শ্যামকেই সওয়াল করতে দেওয়া হোক। কোনও ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, আদালতের নির্দেশ উপেক্ষা করে নির্বাচন কমিশন এসআইআর-এ আধার কার্ডকে মান্যতা দেয়নি বলে মমতা যে অভিযোগ করেছেন, প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত তা খণ্ডন করছেন। কমিশন যে ওই বিষয়ে আদালতের নির্দেশ অগ্রাহ্য করেনি, তা প্রধান বিচারপতিই স্পষ্ট করে দিচ্ছেন। বিজেপির আইনজীবী নেতা তরুণজ্যোতি তিওয়ারি সমাজমাধ্যমে ওই ভিডিয়ো পোস্ট করে লেখেন, ‘‘সুপ্রিম কোর্ট আধার কার্ড সম্পর্কে কী বলেছে, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আশা করি বুঝতে পেরেছেন। না-পারলে আইনজীবীর কাছ থেকে মানেটা বোঝার চেষ্টা করবেন।’’
শমীক ভট্টাচার্য এবং সুকান্ত মজুমদারের উপরে দলের বক্তব্য আনুষ্ঠানিক ভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব দিয়েছিল বিজেপি। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির সামনে মমতা যে ভাবে ‘গণতন্ত্রকে বাঁচানো’র আর্জি জানিয়েছেন, শমীক তাকে কটাক্ষ করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে কী ভাবে বিরোধী দলের ‘সমস্ত গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ’ করা হয়, কী ভাবে সভা-সমাবেশ করার অনুমতি পেতে বিরোধী দলনেতাকে বার বার আদালতে ছুটতে হয়, কী ভাবে কোভিড কালে সুকান্তকেও তাঁর নিজের এলাকায় ত্রাণ বিলি করতে ‘বাধা’ দেওয়া হয়েছিল, এমন নানা অভিযোগ তোলেন শমীক। পশ্চিমবঙ্গে গণতন্ত্রের উপরে সবচেয়ে বড় ‘আঘাত’ মমতাই হানছেন বলে তিনি দাবি করেন।
সুকান্তের কটাক্ষ, ‘‘নাটক করতে তো প্রপ (সরঞ্জাম) আর কস্টিউম (পোশাক) লাগে। তাই দিল্লিতে নাটক করার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কালো চাদর, কালো পোশাক ইত্যাদি নিয়ে হাজির হয়েছিলেন।’’ সুকান্তের কথায়, ‘‘পাঁচ মিনিট বলার অনুমতি পেয়েছিলেন। পুরো পাঁচ মিনিট ধরে রাজনৈতিক ভাষণ দিলেন। ফলে সুপ্রিম কোর্ট বলতে বাধ্য হল যে, আপনার আইনজীবী যথেষ্ট দক্ষ। তাঁর কথাই শুনব। এর চেয়ে খারাপ ভাবে একজন মুখ্যমন্ত্রীকে চুপ করতে বলা যায় না। সুপ্রিম কোর্ট খুব ভদ্র ভাবে মুখ্যমন্ত্রীকে শাট আপ বলেছে।’’ মুখ্যমন্ত্রীর ‘অভিনয়কে’ উত্তমকুমারের সঙ্গে তুলনা করে সুকান্ত বলেন, ‘‘উত্তমকুমারকে আমরা পশ্চিমবঙ্গের সবচেয়ে বড় সুপারস্টার বলি। তিনি মূলত বাংলা ছবিই করতেন। একটা হিন্দি ছবি করেছিলেন, ‘ছোটি সি মুলাকাত’। কোনও কারণে ফ্লপ হয়েছিল। মমতা দিল্লিতে এসে যে ‘ছোটিসি মুলাকাত’ করলেন, তাও ফ্লপই হয়েছে।’’
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী আবার মমতার সমালোচনা করেন সুপ্রিম কোর্টে তাঁর বলা ইংরেজির মান নিয়ে। শুভেন্দু বলেন, ‘‘বাংলা মাধ্যম থেকে গিয়েছেন, ইংরেজি যে পুরোটা ঠিকঠাক বলবেন, তা না হতেই পারে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে ভুলভাল ইংরেজি এবং শব্দ উচ্চারণ করছিলেন, পাশ থেকে কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় সেটাকে সংশোধন করছিলেন, তা দেখে পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসাবে আমাদের লজ্জা লেগেছে।’’ শুভেন্দুর মতে, পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা, মেধা ইত্যাদির ক্ষেত্রে সমৃদ্ধ রাজ্য। সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকে এমনটা মানায় না। বিরোধী দলনেতা বলেন, ‘‘সকলেরই সীমাবদ্ধতা থাকে। তিনি অনুবাদক রাখতে পারতেন। বাংলায় বলতে পারতেন। সুপ্রিম কোর্টের কাছে আবেদন করলে নিশ্চয়ই সে অনুমতি পেতেন।’’
কিন্তু বিজেপির এই সব ভাষ্যের পালে হাওয়া কতটা বাধছে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এজলাসে দাঁড়িয়ে মমতা যে ভাবে বলেছেন ‘আমি ধন্য’, যে ভাবে প্রশান্তির হাসি নিয়ে আদালত থেকে বেরিয়েছেন, যে ভাবে গোটা তৃণমূল ‘জয়’ উদ্যাপন করেছে, তাতে বিজেপির ভাষ্যকে খানিক কমজোরিই দেখিয়েছে। অন্তত বুধবার পর্যন্ত। বিজেপি নেতাদের মধ্যে কেউ বলছেন, ‘‘তৃণমূলের এই উল্লাস আগামী সোমবার পর্যন্ত।’’ কেউ বলছেন, ‘‘ভোটার তালিকায় যৌক্তিক গরমিল সংক্রান্ত সমস্যার নিরসনে কমিশনকে সাহায্য করতে কত জন আধিকারিক মমতা দিচ্ছেন, সে তালিকা সোমবারই আদালতে জমা দিতে হবে, তখনই সব জারিজুরি শেষ হয়ে যাবে।’’
বিজেপির দাবি, মমতা এই মামলা করে নিজের ফাঁদে নিজেই পড়তে চলেছেন। কিন্তু সে সব ভবিষ্যতের বিচার্য। ‘পশ্চিমবঙ্গের মানুষের হয়ে লড়তে’ তিনি সুপ্রিম কোর্টের এজলাসে ‘সওয়াল’ করছেন— এই চমকপ্রদ দৃশ্যপট তৈরি করা মমতার উদ্দেশ্য ছিল। বুধবার সে কাজটি যে তিনি সুচারু ভাবে করেছেন, একান্ত কথোপকনে তা বিজেপি নেতারা মেনে নিচ্ছেন।