Advertisement
E-Paper

জনতার ‘আশীর্বাদ’ই চাপ বাড়াল বিজেপি নেতৃত্বের

ভোটে নাম ঘোষণার পরেই ঘাঁটি গেড়েছিলেন এদো গাঁয়ে। কখনও গাছে চড়ে আলকাতরা লেপ্টে দেওয়া ফ্লেক্স খুলে নতুন লাগিয়েছেন নিজে হাতে। কখনও মাটির ঘরে ঢুঁ মেরে একসঙ্গে দুপুরের আহার সেরেছেন গ্রামের কোনও পরিবারের সঙ্গে। তার পরেও দলের প্রত্যাশামতো ফল করতে পারেননি ময়ূরেশ্বরের তারকা বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়।

দয়াল সেনগুপ্ত

শেষ আপডেট: ২২ মে ২০১৬ ০২:১৫

ভোটে নাম ঘোষণার পরেই ঘাঁটি গেড়েছিলেন এদো গাঁয়ে। কখনও গাছে চড়ে আলকাতরা লেপ্টে দেওয়া ফ্লেক্স খুলে নতুন লাগিয়েছেন নিজে হাতে। কখনও মাটির ঘরে ঢুঁ মেরে একসঙ্গে দুপুরের আহার সেরেছেন গ্রামের কোনও পরিবারের সঙ্গে। তার পরেও দলের প্রত্যাশামতো ফল করতে পারেননি ময়ূরেশ্বরের তারকা বিজেপি প্রার্থী লকেট চট্টোপাধ্যায়। আশা জাগিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন জেলায় বিজেপি-র মুখ বলে পরিচিত দুধকুমার মণ্ডলও। দু’জনেই পেয়েছেন তৃতীয় স্থান। এত কিছুর পরেও কিন্তু, এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের হারের দিকে তাকিয়ে মোটেও নিরাশ নন বিজেপি নেতৃত্ব। বরং ফল ভালই হয়েছে বলে মনে করছেন জেলা সভাপতি রামকৃষ্ণ রায়।

ঘটনা হল, গত বিধানসভা ভোটে এই জেলায় মাত্র ৬.৫৪ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিজেপি। তেমন কোনও ছাপ ফেলতে পারেনি তারা। কিন্তু, সব হিসেব উল্টে দিয়ে গত লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি এই জেলায় ১৮.২৯ শতাংশ ভোট দখল করেছিল। তাতে যেমন জেলার বহু পুরসভায় শাসকদলের থেকেও এগিয়ে গিয়েছিল বিজেপি, তেমনই প্রায় প্রতিটি বিধানসভাতেও বাম ভোটের ঘাড়ে কাছে নিঃশ্বাস ফেলছিল তারা। তার পরেও গত পুরভোটে ফের মুখ থুবড়ে পড়ে বিজেপি। লোকসভা ফল অনুযায়ী আশানুরূপ ফল করতে ব্যর্থ হয় গেরুয়া শিবির। সেই বিজেপি-ই এ বার জেলায় পেয়েছে ১১.০৯ শতাংশ ভোট। লোকসভার থেকে ৭.২ শতাংশ কম, কিন্তু গত বিধানসভার থেকে ৪.৫৫ শতাংশ বেশি ভোট। আর এই হিসেব নিয়েই উচ্ছ্বসিত বিজেপি নেতৃত্ব।

রামকৃষ্ণবাবুর বক্তব্য, ‘‘গত লোকসভা ভোটে প্রবল মোদী হাওয়ায় দলের উত্থানকে সরিয়ে রেখে গত বিধানসভার নিরিখে বিচার করেই বলছি, যথেষ্ট ভাল ফল করেছে দল এ বার। দুবরাজপুর, সিউড়ি, সাঁইথিয়া বিধানসভা এলাকায় তো বটেই, এমনকী নানুর, লাভপুরের মতো দুর্বল সংগঠনের বিধানসভা ক্ষেত্রগুলিতেও উল্লেখযোগ্য ভোট পেয়েছে দল।’’ গত বিধানসভায় সাঁইথিয়ায় বিজেপি প্রার্থী পান ৮ হাজারের কিছু বেশি। এ বার সেটাই হয়েছে ২৪ হাজার ছাড়িয়েছে। একই ভাবে নানুরে ৪.৭ শতাংশ থেকে বিজেপি পৌঁছেছে প্রায় ৯ শতাংশ ভোটে। লাভপুরেও ৬.৪ শতাংশ থেকে বেড়ে হয়েছে ৯.১১ শতাংশ। তাৎপর্যপূর্ণ ভাবে বিজেপি-র কিছু প্রার্থী এ বার ১০ শতাংশ ভোটের কাছে পৌঁছে গিয়েছেন, এলাকায় যাঁরা তেমন পরিচিতি মুখই নন।

এই ফলের রহস্য কী?

বেশ কয়েকটি যুক্তি খাড়া করছেন জেলার রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা। এক, গত লোকসভা নির্বাচন থেকেই জেলায় নিজেদের নিশ্চিত ভোট-ব্যাঙ্ক বাড়িয়ে ফেলেছে। দুই, গত কয়েক বছরে জেলায় ঘটে যাওয়া কিছু ঘটনা স্পষ্ট রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি করেছে। কিছু নির্দিষ্ট এলাকার পাশাপাশি জেলার একটা বড় অংশে তা থেকে ফায়দা তুলেছে তারা। তিন, শাসকদল তৃণমূলের বিক্ষুব্ধদের একটা অংশের ভোটও গিয়েছে গেরুয়া শিবিরে। সব মিলিয়ে এই জেলায় তৃতীয় বড় শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে ফেলতে পেরেছে বিজেপি। কিছু ক্ষেত্রে জেতা-হারায় ‘ফ্যাক্টর’ও হয়ে উঠেছে তারা। উদাহরণ হিসেবে উঠে এসেছে মুরারই ও সিউড়ির কথা। মুরারইয়ে তৃণমূল প্রার্থী জিতেছেন মাত্র ২৮০ ভোটে। সেখানেই আবার বিজেপি প্রার্থী পেয়েছেন ৫ হাজার ভোট। আবার ৩১ হাজার ভোটের ব্যবধানে সিউড়ি দখল করেছে তৃণমূল। সেখানে কিন্তু বিজেপি প্রার্থী জয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাপ্ত ভোট ৩২ হাজার।

এত আশার মাঝেও বিজেপি-কে চাপে রেখেছে জেলায় দলের সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বেশ কিছু দুর্বলতা। বিজেপি-র শক্তঘাঁটি ময়ূরেশ্বরে দুধকুমার গত বিধানসভায় পান প্রায় ৩১ হাজার ভোট। সেখানে এ বার লকেটের মতো তারকা প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও দল কেন ৩৫ হাজারের বেশি ভোট পেল না, ভাবাচ্ছে নেতৃত্বকে। একই ভাবে কেন দাপুটে দুধকুমার ২৫ হাজারের বেশি ভোট পেলেন না, প্রশ্ন উঠছে সেখানেও। অথচ গত ভোটেও সেখানে ১৭ হাজারেরও বেশি ভোট ছিল বিজেপি-র। সেই আলোচনাতেই উঠে আসছে দলের অন্দরে থাকা চেনা কোন্দলের গল্পটা।

বিজেপি সূত্রের দাবি, গত লোকসভায় জেলায় যে বিজেপি হাওয়া এবং দলের মধ্যে যেমন সমন্বয় ছিল— গত পুরভোটের আগে থেকেই উধাও হতে শুরু করে তা। পুরভোটে আসন বণ্টন মেনে নিতে না পারায় জেলা সভাপতির পদে দুধকুমারের পদত্যাগের পরে তা আরও প্রকট হয়। অর্জুন সাহাকে প্রথমে জেলা আহ্বায়ক ও পরে জেলা সভাপতি করে দেওয়ার পরেও যা থামেনি। প্রকাশ্যে এবং আড়ালে একে অপরের দিকে কাঁদা ছোড়াছুড়ি অব্যাহতই ছিল। দলের এক জেলা স্তরের নেতার কথায়, ‘‘বিধানসভা ভোটের মুখে রামকৃষ্ণ রায়কে জেলা সভাপতি করার পরেও দল ছন্দ পেয়েছিল, এ কথা বলা যায় না। ‘সন্ন্যাস’ ভাঙিয়ে দুধকুমারকে ফের রামপুরহাট থেকে প্রার্থী করা হলেও বিজেপি নেতৃত্বের একটা বড় অংশের সঙ্গেই সমন্বয় দানা বাঁধেনি। একই ভাবে ময়ূরেশ্বরে লকেট চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করা, সেই একই সমন্বয়হীনতার ফল ছিল।’’

এত কিছুর পরেও এই বিধানসভার ফলকে দলের প্রতি মানুষের আশীর্বাদ বলেই মনে করছেন তিনি। এখন থেকেই হাল ধরলে আগামী দিনে দলের ঝুলিতে সেই আশীর্বাদ বাড়বে বলেই জেলার বিজেপি নেতৃত্বের একাংশের মত।

assembly election 2016 BJP
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy