Advertisement
E-Paper

ঘুষের টাকার বস্তা বীরভূম থেকে আসত কালো গাড়ি চেপে! যেত এক তৃণমূল বিধায়কের ঠিকানায়: প্রাথমিকের চার্জশিটে সিবিআই

প্রাথমিকের মামলায় সিবিআই চূড়ান্ত চার্জশিট দিয়েছিল গত বছরের পুজোর সময়। এত দিনে তা প্রকাশ্যে এসেছে। অভিযোগ, চাকরিপ্রার্থীদের থেকে টাকা তুলে বীরভূম থেকে তা কলকাতায় পাঠানো হত কালো স্করপিও গাড়িতে।

সারমিন বেগম

শেষ আপডেট: ০২ জুলাই ২০২৬ ১০:০০

ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।

বীরভূম থেকে কলকাতা। ২০০ কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দিয়ে বস্তা বস্তা টাকা নিয়ে আসত কালো স্করপিও। গাড়ির পিছনে থাকত নোটের পাহাড়। সিবিআইয়ের দাবি, সবটাই ঘুষের টাকা! গন্তব্য যাদবপুর!

প্রাথমিকের মামলায় সিবিআই চূড়ান্ত চার্জশিট দিয়েছিল গত বছরের পুজোর সময়। সেখানেই ঘুষের টাকার কলকাতা অভিযানের বর্ণনা রয়েছে। এক বার নয়, টাকা এসেছে বার বার। একই ভাবে, একই পথে। অভিযোগ, চাকরি দেওয়ার নাম করে কোটি কোটি টাকা তোলা হত অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে। বীরভূমের কৃষ্ণপুরের একটি আশ্রমে ঘুষের লেনদেন হত। বস্তায় ভরে সেই টাকা পাঠানো হত কলকাতায় এক তৃণমূল নেতার ঠিকানায়। তিনি পলাশিপাড়ার তৎকালীন বিধায়ক মানিক ভট্টাচার্য। প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের প্রাক্তন চেয়ারম্যানও বটে।

সিবিআই চার্জশিটে জানিয়েছে, বীরভূমের নলহাটি-২ ব্লকের ব্লক প্রেসিডেন্ট ছিলেন বিভাস অধিকারী। মানিকের হয়ে ঘুষের টাকা তোলার প্রধান এজেন্ট ছিলেন তিনিই। ‘অল বেঙ্গল টিচার্স ট্রেনিং অ্যাচিভার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এর (এবিটিটিএএ) সহকারী সচিব ছিলেন বিভাস। এই মামলার অন্যতম অভিযুক্ত তাপস মণ্ডল ছিলেন ওই সংগঠনের সভাপতি। বিভিন্ন বেসরকারি বিএড, ডিএলএড কলেজের মালিকেরা এই সংগঠনে ছিলেন বলে জানতে পেরেছে কেন্দ্রীয় সংস্থা। অভিযোগ, সাব-এজেন্টদের শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন বিভাস। তাঁদের মাধ্যমেই অযোগ্য প্রার্থীদের কাছ থেকে টাকা তুলতেন। শুধু বীরভূম নয়, টাকা তোলা হত উত্তর দিনাজপুর, মালদহ, মুর্শিদাবাদ, হাওড়া, পূর্ব মেদিনীপুর থেকেও। ঘুষের হাতবদলের মাধ্যমেই মানিকের ‘কাছের লোক’ হয়ে উঠেছিলেন বিভাস।

আশ্রম-কথা

বীরভূমে তৃণমূল নেতা বিভাসের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র উদ্ধার করেছে সিবিআই। তদন্তে জানা গিয়েছে, অযোগ্য চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে ঘুষের টাকা এবং নথিপত্র জোগাড় করে বীরভূমের কৃষ্ণপুরের একটি আশ্রমে পাঠানো হত। সেখানেই সেগুলি তুলে দেওয়া হত বিভাসের হাতে। এ ছাড়া, শিয়ালদহে বিভাসের বাড়িতেও ঘুষের লেনদেন হত। চার্জশিটের ৪০ নম্বর পাতায় দাবি, নথি এবং নগদ বস্তায় ভরে তোলা হত বিভাসের কালো রঙের স্করপিও গাড়িতে। বীরভূম থেকে ২০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিয়ে টাকাভর্তি সেই গাড়ি চলে আসত কলকাতায়। যাদবপুরে মানিকের বাড়ি বা অফিসে তা পৌঁছে যেত যথাসময়ে। চার্জশিটে পলাশ, আপেল, নীলাদ্রি, পীযূষ নামে বিভাসের কয়েক জন এজেন্ট বা কর্মচারীর নাম উল্লেখ করেছে তদন্তকারী সংস্থা। তাঁদের মধ্যে বীরভূম থেকে কলকাতা পর্যন্ত আসা ঘুষের গাড়িটি চালাতেন আপেল।

বস্তায় দুর্নীতির জাল

সিবিআইয়ের চার্জশিটে দাবি, দুই থেকে তিনটি বস্তা একবারে গাড়িতে তোলা হত। এক-একটি বস্তায় ২০ থেকে ৩০ লক্ষ টাকা করে নগদ থাকত। এ ছাড়াও চাকরিপ্রার্থীদের নথিপত্র ভরা হত আলাদা বস্তায়। সিবিআই জানিয়েছে, এ ভাবে ১৪ থেকে ১৫ বার টাকাভর্তি গাড়ি বীরভূম থেকে কলকাতায় যাতায়াত করেছে। তারা সেই প্রমাণ পেয়েছেন। উল্লেখ্য, প্রাথমিক বা এসএসসির নিয়োগে পাহাড়প্রমাণ দুর্নীতি, চাকরিপ্রার্থীদের থেকে ঘুষের টাকা তোলার বিষয়টি নতুন নয়। আগেও বার বার তা প্রকাশ্যে এসেছে। তবে এ ভাবে জেলায় জেলায় ছড়িয়ে থাকা নেটওয়ার্ক এবং গাড়িতে বস্তাভর্তি টাকা কলকাতায় আনার কথা আগে শোনা যায়নি।

ঘুষের হিসাব

ডিএলএড এবং বিএড কলেজে রেজিস্ট্রেশনের জন্য ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকেও ঘুষ নেওয়া হত বলে অভিযোগ। তদন্তে দেখা গিয়েছে, মানিক ডিএলএড কোর্সের ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে অফলাইন রেজিস্ট্রেশনের জন্য ঘুষ নিয়েছিলেন। মানিকের জন্য পড়ুয়াপ্রতি পাঁচ হাজার টাকা করে নিতে বলা হয়েছিল কলেজগুলিকে। বাড়তি আরও এক হাজার টাকা করে তোলা হত পড়ুয়াদের থেকে। তা যেত তাপস, বিভাসদের সেই সংগঠন এবিটিটিএএ-তে। সিবিআই জানিয়েছে, প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদ চত্বরে বৈঠকে ডাকা হত বেসরকারি কলেজগুলির মালিকদের। বলা হত, যে সমস্ত চাকরিপ্রার্থী ঘুষ দিতে রাজি, তাঁদের টেটের মাধ্যমে প্রাথমিক বা উচ্চ প্রাথমিকে চাকরি নিশ্চিত করবেন মানিক স্বয়ং। এই ধরনের চাকরিপ্রার্থীর নাম প্রস্তাব করতে বলা হত কলেজ মালিকদের।

লাল-সবুজ খাতা

বিভাসের বাড়ি থেকে মিলেছে একটি সবুজ রেজিস্টার খাতাও। প্রাথমিক এবং উচ্চ প্রাথমিকে নিয়োগের জন্য কোন সাব-এজেন্ট কোথা থেকে কত টাকা তুলে দিয়েছেন, তার হিসাব ওই খাতায় লেখা ছিল। জানা গিয়েছে, প্রাথমিকের ২৪৬ জন এবং উচ্চ প্রাথমিকের ৩৩০ জনের কাছ থেকে সাব এজেন্টদের মাধ্যমে বিভাস তুলেছিলেন মোট ৩৫ কোটি ১৯ লক্ষ ১৬ হাজার ৭৩১ টাকা। তাঁর হয়ে ১৬২ জন সাব-এজেন্ট কাজ করতেন। এ ছাড়া, একটি লাল খাতাও সিবিআইয়ের নজরে রয়েছে। সেখান থেকে জানা যায়, কোনও এজেন্ট ছাড়া বিভাস নিজেই ৮৮ জনের কাছ থেকে মোট ১.০৯ কোটি টাকা তুলেছিলেন। তাঁদের প্রাথমিক শিক্ষক হিসাবে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এ ছাড়াও হাতে লেখা একটি চিরকুট পাওয়া গিয়েছে বিভাসের বাড়িতে। সেখানে লেখা আছে, তিনি উত্তর দিনাজপুরের আনিসুর রহমানের কাছ থেকে ২ কোটি ৯৮ লক্ষ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। সবুজ খাতায় পাওয়া ১৬২ জন সাব-এজেন্টের মধ্যে ২৬ জনকে শনাক্ত করেছে সিবিআই। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, প্রাথমিকে দুর্নীতির অভিযোগে মানিককে গ্রেফতার করেছিল কেন্দ্রীয় সংস্থা। দীর্ঘ দিন তিনি জেলে ছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ্যে আসার পর কলকাতা হাই কোর্ট তাঁকে পর্ষদ সভাপতির পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছিল। বর্তমানে মানিক জামিনে মুক্ত।

Primary Recruitment Case Manik Bhattacharya TMC CBI Birbhum

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy