প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সম্মুখ সমরের মাঝেই রাজ্যপালের সঙ্গে সংঘাত তুঙ্গে উঠছে শাসক শিবিরের!
শাসক দল তথা সরকার পক্ষের লাগাতার কটাক্ষেও বিচলিত না হয়ে রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী রাজ্য প্রশাসনকে ‘রাজধর্ম’ পালনের পরামর্শ দিচ্ছেন। সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায় গ্রেফতার হওয়ার পরে কলকাতায় রাজ্য বিজেপি-র দফতরে তৃণমূলের অবরোধের জেরে যে তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছিল এবং সেখানে পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রককে কড়া রিপোর্ট পাঠানোর তোড়জোড় চলছে রাজভবনে। পক্ষান্তরে, তৃণমূলের তরফে হুঁশিয়ারি দেওয়া হচ্ছে, সাংবিধানিক পদে বসেও রাজ্যপালের গলায় এ ভাবে রাজনীতির সুর শোনা গেলে তা বরদাস্ত করা হবে না!
নতুন করে সংঘাতের সূত্রপাত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় বিজেপি-র দফতরে তৃণমূলের বিক্ষোভ ঘিরে। বিজেপি-র কেন্দ্রীয় সম্পাদক রাহুল সিংহ সে দিন রাজ্যপালকে ফোন করে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁদের দলের কর্মীরা আক্রান্ত। রাজ্যপাল তখন রাজ্যের মুখ্যসচিব, স্বরাষ্ট্রসচিব, ডিজি এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনারকে ফোন করেন। বিজেপি সূত্রের দাবি, সিপি-র সঙ্গে সে দিন রাজ্যপালের এক প্রস্ত বাদানুবাদ হয়। যে ভাবে কলকাতার সিপি রাজ্যপালের সঙ্গে কথা বলেছিলেন, তা একেবারেই সঙ্গত নয় বলে বিজেপি-র মনে হয়েছে। রাজ্যপাল সে দিনের ঘটনা নিয়ে কথা বলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের সঙ্গেও। তার পরেই রাজনাথের মন্ত্রক রাজ্যপালের কাছে রিপোর্ট চেয়েছে।
সেই রিপোর্ট প্রসঙ্গেই শুক্রবার আলিপুরে পুষ্প প্রদর্শনীর একটি অনুষ্ঠানে প্রশ্ন করা হয়েছিল রাজ্যপালকে। জবাবে রাজ্যপাল বলেন, ‘‘আমি এর উত্তর দেব কেন? গোপনীয় কোনও রিপোর্ট প্রকাশ করা বা না করা এবং তা পাঠানো হয়েছে কি হয়নি, তা বলতে যাব কেন?’’
অনুষ্ঠান শেষে ফের তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, শহর জুড়ে যে অবরোধ-অশান্তি চলছে, তা নিয়ে কলকাতার সিপি-কে তিনি কিছু বলেছেন কি না? সরাসরি জবাব এড়িয়ে রাজ্যপাল শুধু বলেন, ‘‘রাজনৈতিক অবস্থান দূরে সরিয়ে প্রতিটি রাজ্যের উচিত, শান্তি বজায় রাখা এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করা।’’
রাজ্যপালের এই জবাবের মধ্যেই প্রচ্ছন্ন ভাবে রাজ্য প্রশাসনকে ‘রাজধর্ম’ পালনের পরামর্শ আছে। গুজরাত দাঙ্গার সময়ে সে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে যে পরামর্শ দিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী। এবং রাজ্যপালের এই ভূমিকাকেই ভাল চোখে দেখছে না রাজ্যের শাসক দল। তৃণমূলের মহাসচিব তথা শিক্ষামন্ত্রী পার্থ চট্টোপাধ্যায় যেমন এ দিন মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘‘রাজ্যপালের সাংবিধানিক পদ। কিন্তু ওঁর কথায় রাজনীতির সুর পাওয়া যাচ্ছে। আমরা এটা মেনে নেব না!’’
রিপোর্টে রাজ্যপাল শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রকে যা-ই জানান, সিপি-র সঙ্গে তাঁর ফোনালাপ-কাণ্ডের রেশ এখনও টাটকা! রাজ্য বিজেপি-র তরফে এ দিন সভাপতি দিলীপ ঘোষ, রাহুলবাবু, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়, সাংসদ জর্জ বেকার, রাজ্যের দুই পর্যবেক্ষক কৈলাস বিজয়বর্গীয় ও সিদ্ধার্থনাথ সিংহ দিল্লিতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথের সঙ্গে দেখা করে রাজ্যের গোটা পরিস্থিতির বিবরণ দিয়েছেন। দিলীপবাবুর কটাক্ষ, ‘‘মুখ্যমন্ত্রীর তাঁবেদার পুলিশ কমিশনারের কাছ থেকে এর চেয়ে উন্নত আচরণ আশা করা যায় না!’’ আর রাহুলবাবুর বক্তব্য, ‘‘রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের সঙ্গে তাঁর অধীনস্থ কর্মচারী ওই সুরে কথা বলতে পারেন না!’’ যার প্রেক্ষিতে পার্থবাবু আবার পাল্টা বলছেন, ‘‘সিপি-কে কেন ফোন করবেন রাজ্যপাল? তিনি তো কথা বলবেন মুখ্যসচিবের সঙ্গে!’’
পরিস্থিতির ফেরে রাজ্য বিজেপি ঠিক করেছে, মুখ্যমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ দুই আইপিএস— ডিজি সুরজিৎ কর পুরকায়স্থ ও কলকাতার সিপি রাজীব কুমারকে এ বার আঁটঘাট বেঁধে ব্যতিব্যস্ত করে তোলা হবে! কারণ, দুই পুলিশকর্তা বিজেপি-কে প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন। বিজেপি-র রাজ্য পদাধিকারীদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে, মোদী যাতে ডিজি-র নিয়োগপত্র সই না করেন, তাঁকে অনুরোধ করা হবে। সুরজিৎ ডিজি হলেও তাঁর নিয়োগ এখনও পাকা নয়। তিনি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন বলে প্রধানমন্ত্রীর সই ছাড়া ডিজি পদে তাঁর নিয়োগ পাকা হবে না। রাজনাথদের মাধ্যমে মোদীর কাছে দিলীপবাবুরা ওই অনুরোধ পৌঁছে দেবেন। রাজভবনে বুধবার যখন দেখা করতে গিয়েছিলেন দিলীপবাবু, শমীক ভট্টাচার্য, লকেট চট্টোপাধ্যায়েরা, রাজ্যপাল তখন দিলীপবাবুর নিরাপত্তার কথা জানতে চান। দিলীপবাবু বলেন, তাঁদের অন্য দুই বিধায়ক স্বাধীন সরকার ও মনোজ টিগ্গার নিরাপত্তা বেশি প্রয়োজন। এ দিনই কাদাপাড়ায় দিলীপবাবুর বাড়ি তৃণমূল ঘেরাও করে বলে অভিযোগ। দিলীপবাবু দলীয় বৈঠকের জন্য দিল্লিতে। তাঁর মন্তব্য, ‘‘আমি থাকলে ওঁদের ডেকে চা খাওয়াতাম!’’