ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ হওয়ার নিয়ে অস্বস্তি রয়েই গেল কালীঘাট তৃণমূলের! ‘ফ্রিজ়’ হয়ে থাকা অ্যাকাউন্টগুলি খোলার আর্জি নিয়ে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল তারা। কিন্তু এখনই সেই আর্জির সুরাহা হল না। আপাতত ‘ফ্রিজ়’ হয়েই থাকছে তৃণমূলের তিনটি অ্যাকাউন্ট।
তৃণমূলের ‘ফ্রিজ়’ হওয়া অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত মামলার বৃহস্পতিবার শুনানি ছিল হাই কোর্টে। তাতে জোড়াফুলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ হওয়া নিয়ে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে হলফনামা তলব করলেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে নিজেদের বক্তব্য হলফনামা আকারে জানাতে নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি এ বিষয়ে তদন্ত কত দূর এগোল, সে বিষয়ে পুলিশকেও একটি রিপোর্ট জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি।
নির্বাচনে ভরাডুবির পরে ভাঙন ধরেছে তৃণমূলের সংসদীয় এবং পরিষদীয় দলে। দলের অভ্যন্তরীণ টানাপড়েনের কথা উল্লেখ করে তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করার আবেদন জানিয়েছিলেন প্রাক্তন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাস। যদিও ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে পাঠানো চিঠিতে তিনি দলের কোষাধ্যক্ষ হিসাবেই নিজের পরিচয় দেন।
পরে গত ১৮ জুন বিধাননগর সাইবার থানায় অভিযোগ দায়ের করেন
দক্ষিণ ২৪ পরগনার এক বিধায়ক। তাঁর অভিযোগ,
বড় ধরনের সাইবার প্রতারণার টাকা কিছু ব্যাঙ্কের
অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করেছে। তার মধ্যে তৃণমূলের কিছু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টও থাকতে
পারে বলে সন্দেহ করছেন তিনি। তার পরেই পুলিশ এফআইআর দায়ের করে। পরের দিন ব্যাঙ্ক
কর্তৃপক্ষকে তিনটি অ্যাকাউন্টের ডেবিট (টাকা তোলা) ‘ফ্রিজ়’ করার জন্য বলে পুলিশ।
পুলিশের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয় কালীঘাটপন্থী তৃণমূল।
কালীঘাট তৃণমূলের বক্তব্য, ওই তিনটি অ্যাকাউন্ট থেকেই তারা কর্মীদের বেতন দেয়। অফিসের খরচ দেয়। বিদ্যুতের বিল দেয়। রাজনৈতিক কর্মসূচির খরচও মেটানো হয় ওই অ্যাকাউন্টের থেকেই। এ অবস্থায় শুধুমাত্র আশঙ্কার ভিত্তিতে করা একটি অভিযোগের প্রেক্ষিতে দলের অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করা হয়েছে বলে আদালতে জানায় কালীঘাট তৃণমূল। তাদের বক্তব্য, পুলিশ পদক্ষেপ করলেও এই অভিযোগ সংক্রান্ত বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই। মামলায় প্রথমে তিনটি অ্যাকাউন্টের কথাই বলেছিল তারা। তবে বৃহস্পতিবারের শুনানিতে কালীঘাট তৃণমূলের তরফে দাবি করা হয়, মোট ৮টি অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ হয়েছে।
কালীঘাট তৃণমূলের আইনজীবী কিশোর দত্তের বক্তব্য, যে অভিযোগ জানানো হয়েছে, সেখানে কোথাও বলা হয়নি কত টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকেছে। কিসের টাকা এবং কে বা কারা পাঠিয়েছে, তা-ও উল্লেখ নেই। পুলিশ একটি সাধারণ অভিযোগের ভিত্তিতে পদক্ষেপ করছে বলে জানান তিনি। কিশোরের সওয়াল, অভিযোগকারী নিজেও জানিয়েছেন, টাকার উৎস তাঁর জানা নেই। সে ক্ষেত্রে পুলিশ তদন্ত না করেই তাড়াহুড়ো করে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে আদালতে জানান তিনি। কিশোরের বক্তব্য, যদি কোনও নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা নিয়ে সন্দেহ থাকে, তা হলে শুধু সেই পরিমাণ টাকা আটকে দিতে পারত। কিন্তু পুরো ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট কেন ফ্রিজ় করা হল, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
আরও পড়ুন:
কালীঘাট তৃণমূলের বক্তব্য, ভোটের পর থেকে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা দেওয়া হচ্ছে। এই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ়ের নেপথ্যেও সেই রাজনীতিক কারণই রয়েছে বলে মনে করছে তারা। এই এফআইআর বাতিল করে অ্যাক্যাউন্টে ‘ফ্রিজ়’ তুলে দেওয়ার জন্য আদালতে আর্জি জানায় তারা। আদালত যাতে কোনও অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয়, সেই আবেদনও করে কালীঘাট তৃণমূল।
কালীঘাটপন্থী শিবিরের অপর আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ভির প্রশ্ন, পুলিশ কি কোনও রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে এ ধরনের পদক্ষেপ করতে পারে? তাঁর সওয়াল, “একটি রাজনৈতিক দলকে পঙ্গু করে দিতেই এই পদক্ষেপ করছে পুলিশ।” সিঙ্ভি আদালতে বলেন, “যদি তৃণমূল দু’ভাগে বিভক্ত হয়, তবে তা নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবে নির্বাচন কমিশন। সেটার সিদ্ধান্ত নেবে আদালত। কিন্তু তার আগেই পুলিশ কী ভাবে তৃণমূলের দু’টো ভাগ আছে ধরে নিয়ে অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করে দিল?”
অন্য দিকে অভিযোগকারী বিধায়কের আইনজীবী নীরজকিশান কউলের সওয়াল, তৃণমূলের জাতীয় কর্মসমিতির মেয়াদ ২০২৫ সালেই শেষ হয়েছে। এ অবস্থায় তৃণমূলের মধ্যে বিভাজন হয়ে থাকলে, সে বিষয়ে কমিশনই সিদ্ধান্ত নেবে, তা-ও মেনে নেন তিনি। কিন্তু তাঁর সওয়াল, সিঙ্ভিও নিজের সওয়ালে একপ্রকার মেনে নিচ্ছেন যে দলের দু’টি ভাগ হয়ে গিয়েছে। সে ক্ষেত্রে তহবিলে কার অধিকার থাকবে, তা স্থির হওয়ার আগেই কী ভাবে এক পক্ষ তহবিলের অধিকার চেয়ে কোর্টে চলে এল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন অভিযোগকারীর আইনজীবী। কালীঘাট তৃণমূলের করা মামলার গ্রহণযোগ্যতা নিয়েই প্রশ্ন তোলেন তিনি। এই মামলা খারিজ করে দেওয়ার আর্জিও জানান নীরজ।
মামলার শুনানিতে সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাও উপস্থিত ছিলেন। তিনি আদালতে বলেন, “এক পক্ষ বলছে আমি সভাপতি। অপর পক্ষ বলছে আমি সভাপতি। এই পরিস্থিতিতে আদালতের এমন নির্দেশ দেওয়া উচিত যা কার্যকর করা সম্ভব।”
এ অবস্থায় অ্যাকাউন্ট ‘ফ্রিজ়’ সংক্রান্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষের বক্তব্য জানতে চাইছে আদালত। আগামী মঙ্গলবারের মধ্যে তা হলফনামা আকারে আদালতে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন বিচারপতি ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে পুলিশকেও তদন্তের রিপোর্ট জমা দিতে বলেছেন। আগামী বুধবার ফের এই মামলার শুনানির সম্ভাবনা রয়েছে।