দেশের গণপরিবহণ ব্যবস্থাকে আরও উন্নত ও আধুনিক করে তুলতে নতুন পদক্ষেপ করেছে কেন্দ্র সরকার। এই প্রকল্পের অধীনে সমগ্র ভারতবর্ষে মোট ১০১টি শহরকে ‘মোবিলিটি সিটি’ হিসেবে গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সেই তালিকায় স্থান করে নিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। রাজ্যের যে পাঁচটি শহরকে 'মোবিলিটি সিটি' হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে, সেগুলি হল— কলকাতা, হাওড়া, আসানসোল, দুর্গাপুর এবং শিলিগুড়ি। এই শহরগুলিতে উন্নত মানের ও আধুনিক গণপরিবহণ ব্যবস্থা কীভাবে পরিচালনা করা সম্ভব, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই বিশদ পরিকল্পনা ও কাজ শুরু হয়ে গেছে। কেন্দ্রীয় পুর ও নগরোন্নয়ন মন্ত্রক এই পরিকল্পনা রূপায়ণের দায়িত্বে।
সম্প্রতি কলকাতার এজি বেঙ্গল অফিসে এই প্রকল্প সংক্রান্ত বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হয়। বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরপরই এই গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করা হয়েছিল। বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন দেশের বেশ কয়েকজন শীর্ষস্তরের আইএএস আধিকারিক। দেশের প্রধান প্রধান শহরগুলিকে সচল রাখাই এই প্রকল্পের প্রাথমিক এবং প্রথম শর্ত। পাশাপাশি, অত্যাধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে যানজট মুক্ত করা এবং ফুটপাথ সাধারণ মানুষের ব্যবহারের উপযোগী করে তোলাও এই প্রকল্পের অন্যতম দিক। কী উপায়ে শহরে ছোট ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা কমাতে হবে, সেই বিষয়েও ভাবনা চিন্তা করা হবে। উল্লেখ্য, কলকাতার মতো যানজটপূর্ণ শহরে ছোট গাড়ি না কমলে গণপরিবহণকে বাঁচানো এবং শহরকে দূষণমুক্ত করা অসম্ভব বলেও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। বৈঠকে আলোকপাত করা হয়েছে কলকাতা শহরের রাস্তা নিয়ে। বৈঠকে উপস্থিত এক আধিকারিকের কথায়, "দেশের অন্য যে কোনও বড় শহরে যেখানে ৩৫ থেকে ৪২ শতাংশে বড় রাস্তা রয়েছে, সেখানে কলকাতায় যান চলাচলের রাস্তার পরিমাণ পাঁচ থেকে সাত শতাংশ। তাই মোবিলিটি শহর গড়তে গেলে রাস্তা নিয়েও নতুন করে ভাবনা-চিন্তা করতে হবে বলেই ওই আলোচনায় উঠে এসেছে।"
আরও পড়ুন:
কলকাতার মতো জনবহুল শহরে ‘পার্ক অ্যান্ড রাইড’ ব্যবস্থা চালু করা অত্যন্ত জরুরি বলে মত প্রকাশ করেছেন উপস্থিত গণপরিবহণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনে জোড়-বিজোড় নিয়মে গাড়ি চালানোর বিষয়টি কার্যকর করা যায় কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তেমনই বর্তমানে ট্রাফিক ক্যামেরাগুলিকে সঠিক ভাবে কাজে লাগানোর কথাও বলা হয়েছে। বর্তমানে রাস্তায় পুলিশের দ্বারা লাগানো সিসিটিভিগুলিতে কেবল চোর ধরা বা ওভারটেক দেখার কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। এর পরিবর্তে সিঙ্গাপুরের মতো উন্নত দেশের প্রযুক্তি ব্যবহার করে ‘ভেহিকল লোকেট’ বা গাড়ি শনাক্ত করার জন্য বিশেষ আধুনিক ক্যামেরা বসানোর দাবি জানানো হয়েছে। বৈঠকে হাজির পরিবহণ দফতরের এক আধিকারিকের কথায়, "প্রধানমন্ত্রী যেখানে গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নতির ওপর জোর দিচ্ছেন, সেখানে গণপরিবহণকে টিকিয়ে রাখতে গেলে এই ধরনের ছোট যানের উপর নিয়ন্ত্রণ আনা জরুরি।" এই প্রকল্পটি পুর ও নগরোন্নয়ন দফতরের একটি অত্যন্ত বড় বিষয়ে । এই প্রকল্পের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গিয়েছে এবং নিয়মিত ভাবে রাজ্যগুলি থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিবহণ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি বদলে দিতে এই 'মোবিলিটি সিটি' প্রকল্প আগামী দিনে ভারতের তথা পশ্চিমবঙ্গের যাতায়াত ব্যবস্থায় নতুন দিগন্তের সূচনা করবে বলে আশা করা হচ্ছে প্রশাসনের তরফে।
এই বৈঠকে ‘জয়েন্ট কাউন্সিল অফ বাস সিন্ডিকেট’-এর সাধারণ সম্পাদক তপন বন্দ্যোপাধ্যায়কে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তপন বলেন, "পশ্চিমবঙ্গ-সহ দেশের এই ১০১টি শহরের পরিবহণ ব্যবস্থায় যাতে একটি অভিন্নতা বা ‘ইউনিফর্মিটি’ বজায় থাকে, সেই লক্ষ্যেই এই মোবিলিটি সিটি তৈরির প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এই শহরগুলির পরিবহণ ব্যবস্থার খোলনলচে বদলে দিতে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট দফতর ডেটা বা তথ্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিয়েছে।" তিনি আরও বলেন, "যানজট ও দূষণমুক্ত শহরের প্রস্তাবনা বৈঠকে পশ্চিমবঙ্গের শহরগুলির গণপরিবহণ ব্যবস্থার উন্নয়নে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব ও খসড়া জমা দেওয়া হয়েছে। দীর্ঘ ৫০ বছরের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে আমি বেশ কিছু বাস্তবসম্মত পরামর্শ দিয়েছি।"