Advertisement
E-Paper

মন্দারমণিতে মুখোমুখি সংঘর্ষ দুই গাড়ির

সবে ভোরের আলো ফুটেছে। হঠাৎই তিরবেগে মন্দারমণির বেলাভূমিতে নেমে এল একটি গাড়ি। ভিতরে তিন তরুণ। আরও একটি গাড়ি তখন দাঁড়িয়ে সেখানে। তাতে চেপে আসা চার তরুণ আগেই সৈকতে নেমে পড়েছেন। দু’দলের আলাপ জমতে দেরি হল না।

সুব্রত গুহ

শেষ আপডেট: ২২ অগস্ট ২০১৬ ০৩:১৯
দুমড়ে-মুচড়ে এসইউভি। রবিবার মন্দারমণিতে সোহম গুহের তোলা ছবি।

দুমড়ে-মুচড়ে এসইউভি। রবিবার মন্দারমণিতে সোহম গুহের তোলা ছবি।

সবে ভোরের আলো ফুটেছে। হঠাৎই তিরবেগে মন্দারমণির বেলাভূমিতে নেমে এল একটি গাড়ি। ভিতরে তিন তরুণ। আরও একটি গাড়ি তখন দাঁড়িয়ে সেখানে। তাতে চেপে আসা চার তরুণ আগেই সৈকতে নেমে পড়েছেন। দু’দলের আলাপ জমতে দেরি হল না। তূরীয় মেজাজে শুরু হল বেলাভূমিতে সজোরে গাড়ি চালানোর হুল্লোড়। গতি বাড়তে বাড়তে দেড়শোর কাঁটা ছুঁল। একেবারে সিনেমার কায়দায় বালির বুকে চক্কর খেতে খেতেই দু’টি গাড়ির একেবারে মুখোমুখি সংঘর্ষ। বিকট শব্দে চারদিক খানখান।

রবিবার ভোর সওয়া ৫টা নাগাদ এমনই ভয়াবহ দুর্ঘটনার সাক্ষী রইল মন্দারমণি। এ দিনের বলি কলকাতার তিন তরুণ। পুলিশ জানিয়েছে, মৃতেরা হলেন বৈভব শাণ্ডিল্য (২১), সুরজ দাশগুপ্ত (২২) এবং শিবরাজ নস্কর (২২)। বৈভব রাজারহাট, সুরজ সন্তোষপুর আর শিবরাজ বেলেঘাটার বাসিন্দা। অন্য গাড়িটির সওয়ার দীপেশ রঞ্জনও জখম হয়ে হাসপাতালে ভর্তি।

উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানদের মধ্যে এমন বেপরোয়া উল্লাসে মাতার প্রবণতা সাম্প্রতিক কালে বারবারই বিপদ ডেকে আনছে। ক’দিন আগেই অভিজাত বহুতলে স্কুলপড়ুয়া আবেশ দাশগুপ্তের অপমৃত্যু ঘিরে আলোড়ন তৈরি হয়েছিল। মন্দারমণিতে মৃত তিন যুবক সাবালক হলেও আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে তাঁদের হুল্লোড়ের ধরন নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। কলকাতা শহরের বুকে রাতের দিকে হেলমেটহীন বাইক দৌড় যে ভাবে নিত্যনৈমিত্তিক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে, যে ভাবে রেড রোডে উন্মত্ত গাড়ি পিষে দিয়েছিল সেনা জওয়ানকে— মন্দারমণিতে এ দিনের ঘটনা চরিত্রে যেন তারই কাছাকাছি। সেই উদ্দাম গতির লড়াই, আইনকানুনের তোয়াক্কা নেই, নেশায় চুর যৌবন। দেশ জুড়েই উন্মত্ত গাড়ির ছুট থেকে বিপদ দিনদিন বাড়ছে। মন্দারমণির স্থানীয়দেরও অভিযোগ, বেলাভূমিতে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় জোরে গাড়ি চালানোর জন্য একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটেই চলেছে। কাঁথির সাংসদ তথা দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান শিশির অধিকারীও বলছেন, ‘‘মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালাতে গিয়েই এ দিনের দুর্ঘটনা। ওই কাকভোরে কেউ গাড়ি নিয়ে সৈকতে নামে নাকি?’’ আইন অবশ্য বলছে, শুধু কাকভোর নয়। দিনের কোনও সময়েই বেলাভূমিতে গাড়ি ছোটানোর কথা নয়।


শিবরাজ নস্কর সুরজ দাশগুপ্ত বৈভব শাণ্ডিল্য

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে খবর, ভোর চারটে নাগাদ বৈভব, সুরজ ও শিবরাজ সরাসরি মন্দারমণির সৈকতে পৌঁছন। ফোর্ড ইকো-স্পোর্টস গাড়িটি চালাচ্ছিলেন বৈভব। সৈকতে তখন দাঁড়িয়ে ছিল দীপেশদের বিএমডব্লু গাড়িটি। ওই দু’টি গাড়ি নিয়েই শুরু হয় বেপরোয়া গতির খেলা। গাড়ির কোন মডেলটি জেতে, সেটাই দেখার নেশা। কয়েক মুহূর্ত পরেই দুর্ঘটনা। বিকট শব্দ শুনে ছুটে আসেন সৈকত লাগোয়া একটি হোটেলের কর্মীরা। তাঁরাই পুলিশে খবর দেন। মিনিট পনেরোর মধ্যে আসে পুলিশ। কিন্তু বৈভবদের গাড়ি এতটাই দুমড়ে-মুচড়ে গিয়েছিল যে শেষে ক্রেন এনে থানায় নিয়ে যাওয়া হয় গাড়িটি। তারপর গ্যাস কাটার দিয়ে কেটে তিনটি মৃতদেহ বের করা হয়। বিএমডব্লু গাড়িটির খুব বেশি ক্ষতি হয়নি। জানা গিয়েছে, কৈখালির বাসিন্দা দীপেশ একাই গাড়িটি চালাচ্ছিলেন। তাঁর তিন বন্ধু সৈকতে দাঁড়িয়েছিলেন। আহত দীপেশকে নিয়ে যাওয়া হয় কাঁথি মহকুমা হাসপাতালে। ওঁদের চার জনকেই জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। পূর্ব মেদিনীপুরের জেলা পুলিশ সুপার অলোক রাজোরিয়া বলেন, ‘‘বৈভবদের গাড়িতে গাঁজার পাউ়চ পাওয়া গিয়েছে।’’

বৈভবরা তিন জনেই অভিজাত বাড়ির ছেলে। শিবরাজ এবং সুরজ ব্রিটেনে পড়াশোনা করছিলেন। ছুটিতে দেশে এসেছিলেন। তাঁরা তিন বন্ধু শনিবার রাতে কলকাতা থেকে মন্দারমণি রওনা হন। যদিও তিন পরিবারেরই দাবি, ছেলেরা যে এত দূর বেড়াতে এসেছে, সে কথা তাঁদের জানা ছিল না। তবে এ দিনের ঘটনায় বেলাগাম হুল্লোড়ের সঙ্গেই সামনে আসছে সৈকতে যথাযথ নজরদারির খামতিও। নিয়মমাফিক মন্দারমণির বেলাভূমিতে গাড়ি নিয়ে নামা একেবারে বারণ। ২০১৪-র জুন মাসেই পূর্ব মেদিনীপুর জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দিঘা, মন্দারমণি ও তাজপুরের সৈকতে গাড়ি চলাচলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কিন্তু শুনছে কে! দেখছেই বা কে! গত মে মাসেই মন্দারমণির সৈকতে গাড়ি উল্টে মৃত্যু হয়েছিল এক যুবকের। জখম হয়েছিল দুই শিশু-সহ তিনজন। তখন এক বার সৈকতে গাড়ি চালানো নিয়ে কড়াকড়ি হয়। কিন্তু সেই তৎপরতা স্থায়ী হয়নি। এলাকার মানুষের অভিযোগ, ‘সৈকতে গাড়ি চালানো নিষেধ’ লেখা বোর্ড ঝোলানোর বাইরে কার্যত আর কোনও নজরদারিই নেই গোটা তল্লাটে। এ দিনের ঘটনায় এই খামতিই ফের বেআব্রু হয়েছে। স্থানীয় বিধায়ক তথা দিঘা-শঙ্করপুর উন্নয়ন পর্ষদের সহ-সভাপতি অখিল গিরিও সে কথা মানছেন। তাঁর কথায়, ‘‘নজরদারির ঘাটতি তো রয়েছেই। সৈকতে নামার আগে একটা চেক পোস্ট খুব জরুরি।’’ শিশিরবাবু বলেন, ‘‘মন্দারমণিতে দু’টো ড্রপ গেট করা হয়েছে। যেখানে দুর্ঘটনা হয়েছে, ওই জায়গাটা ফাঁকা ছিল। ওখানেও ড্রপ গেট করা হবে।’’

মন্দারমণিতে বেশ কিছু হোটেলে পৌঁছতে অবশ্য বেলাভূমি দিয়েই গাড়ি নিয়ে যেতে হয়। অখিলবাবু জানান, হোটেলে পৌঁছনোর বিকল্প রাস্তা তৈরির কাজ শেষের পথে।

accident Death
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy