×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২২ জুন ২০২১ ই-পেপার

নজরে রোজভ্যালি অ্যাকাউন্ট সিল ইডির, তদন্ত করবে সিবিআই

নিজস্ব সংবাদদাতা
কলকাতা ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০৩:৪৭
ইডি দফতরের বাইরে গৌতম কুণ্ডু। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র।

ইডি দফতরের বাইরে গৌতম কুণ্ডু। বৃহস্পতিবার। —নিজস্ব চিত্র।

অর্থলগ্নি সংস্থা রোজভ্যালির প্রায় আড়াই হাজার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সিল করে দিল এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি)। ওই সংস্থার ব্যাপারে সিবিআই-ও তদন্ত শুরু করবে বলে জানিয়েছে। সব মিলিয়ে সারদা ঘিরে তোলপাড়ের আবহে রোজভ্যালি নিয়েও নতুন করে চাঞ্চল্য শুরু হয়েছে।

উত্তেজনার পারদ বাড়িয়ে দিয়ে বৃহস্পতিবার ইডি দফতরে হাজির হওয়ার পরে সন্ধেবেলায় রোজভ্যালির কর্ণধার গৌতম কুণ্ডু প্রকাশ্যে স্বীকার করে নেন, উত্তরবঙ্গের ডেলোয় তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সারদা কেলেঙ্কারিতে গ্রেফতার হওয়া তৃণমূল সাংসদ কুণাল ঘোষ জেল থেকে ইডি-কে লেখা চিঠিতে গৌতম কুণ্ডুর পাশাপাশি সারদার কর্ণধার সুদীপ্ত সেনের সঙ্গেও মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকের কথা জানিয়েছিলেন।

গৌতম প্রকাশ্যে ডেলো বৈঠক নিয়ে মুখ খোলায় নানা জল্পনা শুরু হয়েছে। সর্বসমক্ষে ওই বৈঠকের কথা স্বীকার করে গৌতম প্রকারান্তরে কুণালের চিঠিকেই নতুন করে মান্যতা দিয়েছেন বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে এমন একটা সময়ে যখন সারদার বৃহত্তর ষড়যন্ত্র এবং তাতে প্রভাবশালীদের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত করছে সিবিআই। এবং রোজভ্যালিও তাদের নজরে রয়েছে।

Advertisement

ইডি সূত্রের খবর শুধু পশ্চিমবঙ্গ নয়, বিহার-ঝাড়খণ্ড-ওড়িশা-দিল্লি-পঞ্জাব-মহারাষ্ট্রের বিভিন্ন ব্যাঙ্কের শাখায় ছড়িয়ে রয়েছে রোজভ্যালির কয়েক হাজার অ্যাকাউন্ট। কয়েক হাজার কোটি টাকা রয়েছে এই সব অ্যাকাউন্টে। তার মধ্যেই প্রায় আড়াই হাজার অ্যাকাউন্ট সিল করে দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে আরও অ্যাকাউন্ট রয়েছে সংস্থার। ওই সংস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য জানতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া এবং সেবি-র (সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ বোর্ড অব ইন্ডিয়া) অফিসারদেরও ডেকে পাঠায় ইডি।

এ দিন দুপুরে একটি সাদা বিএমডব্লু-তে চেপে সল্টলেকে ইডি-র দফতরে হাজির হন সংস্থার চেয়ারম্যান গৌতম কুণ্ডু নিজেই। কেন? রোজভ্যালির পক্ষ থেকে বলা হয়, যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলি সিল করে দেওয়া হয়েছে, তার অনেকগুলি থেকে সংস্থার দশ হাজার কর্মীকে বেতন দেওয়া হয়। অ্যাকাউন্টগুলি বন্ধ করে দেওয়ায় পুজোর আগে বেতন পাবেন না কর্মীরা। সংস্থার দাবি, এই বিষয়টি নিয়েই গৌতমবাবু ইডি-র অফিসারদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছিলেন। ইডি সূত্রের খবর, গৌতমবাবুকে বলা হয়েছে, তিনি লিখিত ভাবে এ ব্যাপারে আবেদন করলে তা দিল্লির কর্তাদের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। এ দিন ইডি-র দফতর থেকে বেরিয়ে গৌতম দাবি করেন, তাঁকে ইডি-র তদন্তকারীরা ডেকে পাঠাননি। তাঁর মিডিয়া বিভাগের হিসেবরক্ষক তরুণ পণ্ডাকে ডাকা হয়েছিল। তিনি শুধু সঙ্গে এসেছিলেন।

রোজভ্যালি সূত্রের খবর, রোজভ্যালির অধীনে একাধিক সংস্থা রয়েছে। তার মধ্যে রোজভ্যালি রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন্স লিমিটেড নামে একটি সংস্থায় ‘আশীর্বাদ’ নামে একটি স্কিমে টাকা তোলা হচ্ছিল বাজার থেকে। ওই স্কিমটি বেআইনি বলে অভিযোগ করেছে ইডি এবং সেবি। সেবি-র সঙ্গে এ নিয়ে মামলা চলছে। অন্য দিকে, বেআইনি অর্থলগ্নি সংস্থাগুলি নিয়ে যে নজরদারি চালাচ্ছে ইডি, তারই সূত্রে এ দিন রোজভ্যালি রিয়েল এস্টেট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন্স লিমিটেড-এর আড়াই হাজার অ্যাকাউন্ট সিল করা হয়েছে।

শুধু ইডি বা সেবি নয়, এ রাজ্যে সিবিআই-ও এ বার রোজভ্যালির ব্যাপারে তদন্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সিবিআই সূত্রের খবর, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ওড়িশায় যে ৪৪টি অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে এফআইআর করা হয়েছে, তার মধ্যে রোজভ্যালির নামও রয়েছে। ওড়িশা ও অসমে অন্য অর্থলগ্নি সংস্থার বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই তদন্ত শুরু করেছে সিবিআই। পশ্চিমবঙ্গেও সেই পথে হাঁটবে তারা। তবে গৌতম বৃহস্পতিবার এ প্রসঙ্গে বলেন, “আমি জানি সিবিআই তদন্ত করবে। আমরা চাইছি তদন্ত হোক।” এর আগে শ্যামল সেন কমিশন এবং এসএফআইও-র (সিরিয়াস ফ্রড ইনভেস্টিগেশন অফিস) অফিসারদের সামনেও তিনি হাজির হয়েছেন বলে গৌতমবাবু জানান। তাঁর দাবি, “আমি কাউকে ভয় পাই না। ব্যবসা করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত অনুমতি আমার রয়েছে। ১৮ বছর ব্যবসা করছি। এক জন বিনিয়োগকারীও বলতে পারবেন না, তাঁর টাকা রোজভ্যালি ফেরত দেয়নি।”

বস্তুত সারদার সঙ্গে রোজভ্যালিকে গুলিয়ে ফেলা যাতে না হয়, সেটাই বারবার বলতে চাইছেন গৌতম। সংস্থার পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে রোজভ্যালি বেআইনি পথে টাকা তুলেছে নাকি আইনি পথে, সেটা বিচারাধীন বিষয়। এবং এটা আইনি লড়াই ছাড়া কিছু নয়। রোজভ্যালির দাবি, এখনও অবধি আমানতকারীরা তাঁদের বিরুদ্ধে কোনও রকম জাল-জুয়াচুরির অভিযোগ আনতে পারেননি। কিন্তু এই সব অ্যাকাউন্ট সিল হয়ে যাওয়ার পরে কি তাঁরা টাকা ফেরাতে পারবেন? সংস্থার দাবি, সারা দেশে রোজভ্যালির সম্পত্তির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকা। অন্যান্য অ্যাকাউন্টে ১৫০০ কোটির বেশি টাকা রয়েছে। ফলে আমানতকারীরা ঝামেলায় পড়বেন না। বৃহস্পতিবার রাতে গৌতম আনন্দবাজারকে বলেন, “আপনারা মুড়ি-মিছরি এক করে ফেলছেন। সুদীপ্ত সেন কী, আপনারা জানেন। আর আমি পাঁচ কোটি টাকার গাড়ি চড়ি। আমি যদি চোর হই, তবে জেলে যেতে আপত্তি নেই আমার।”

কিন্তু ২০১২-র মার্চ মাসে উত্তরবঙ্গের ডেলোয় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে সুদীপ্ত সেনের যে বৈঠক হয়েছিল, সেই একই সফরে গৌতমবাবুর সঙ্গেও দেখা করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এর আগে আনন্দবাজারের তরফে যখন তাঁকে ওই বৈঠকের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেছিলেন রোজভ্যালির এমডি শিবময় দত্ত এবং বোর্ড অব ডিরেক্টর্সের সদস্যদের সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেন। উত্তরবঙ্গে পর্যটনের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলাই ছিল উদ্দেশ্য, এমনই দাবি করেন গৌতম। এ দিন এবিপি আনন্দ চ্যানেলে তাঁকে ফোনে প্রকাশ্যে ডেলো বৈঠকের কথা স্বীকার করতে শোনা যায়।

যদিও গৌতম আনন্দবাজারকে রাতে বলেন, তা নিয়ে বাড়তি হইচই অর্থহীন। তাঁর দাবি, “মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আমার ডেলোতে বৈঠক হয়েছিল। সে বৈঠকে কুণালও ছিলেন। তাতে কী প্রমাণ হয়?” তাঁকে প্রশ্ন করা হয়, “আপনি কি ডেলোতে সুদীপ্ত সেনকে দেখেছিলেন?” তাঁর জবাব, “আমি ওঁকে দেখিওনি। চিনি-ও না।”

Advertisement