ফ্ল্যাট দাও, চাকরি নাও! শুধু টাকা নয়, খাস কলকাতায় মস্ত ফ্ল্যাটের বিনিময়ে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় প্রভাবশালী ঠিকাদারদের বিস্তর অস্থায়ী চাকরি পাইয়ে দেওয়ার কারবার ফেঁদে বসেছিলেন বলেও প্রাক্তন মন্ত্রী সুজিত বসুর নামে অভিযোগ। দক্ষিণ দমদম পুরসভার এক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারীর লিখিত বয়ান মারফত ইডির তদন্তে বিষয়টি উঠে এসেছে।
অতীতে লালু প্রসাদের নামে রেল মন্ত্রকের চাকরি জমির বিনিময়ে পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। এ ক্ষেত্রে প্রাক্তন দমকলমন্ত্রী তথা দক্ষিণ দমদম পুরসভার এক সময়ের ভাইস-চেয়ারম্যান সুজিতের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগে সেই‘লালু মডেল’-এরই ছাপ দেখছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।
সুজিতের খাসতালুক লেকটাউনের শ্রীভূমির মস্ত কিছু ফ্ল্যাটই এখন তদন্তকারীদের নিশানায়। ২০১৬ নাগাদ দক্ষিণ দমদম পুরসভায় ভাইস-চেয়ারম্যান থাকাকালীন সুজিত কী ভাবে, কিসের বিনিময়ে ওই ফ্ল্যাটগুলির দখল নেন, আদালতে তার সবিস্তার রিপোর্ট পেশ করেছে ইডি।
তদন্তে উঠে এসেছে, দক্ষিণ দমদম পুরসভার এক চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী ছাড়াও সুজিত ঘনিষ্ঠ কাউন্সিলর নিতাই দত্ত এবং অলক মজুমদার নামে আর এক ব্যক্তি-সহ ১১ জন অংশীদারের একটি নির্মাণ সংস্থা শ্রীভূমিতে একটি বহুতল আবাসন নির্মাণে হাত দেয়। তার এক তলা, তিন তলা, চার তলা, পাঁচ তলায় সুজিত ও তাঁর ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাট দেওয়া হয়েছিল। সূত্রের দাবি, প্রায় ১ কোটি ১১ লক্ষ টাকার বাজারদরের ওই ফ্ল্যাটগুলি টেনেটুনে এক-তৃতীয়াংশ দামে দখল করে নেন সুজিত।
তদন্তকারী অফিসারের দাবি, দক্ষিণ দমদম পুরসভার ওই চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী তথা নির্মাণ সংস্থার এক অংশীদারের লিখিত বয়ানে বলা হয়েছে, অনেকটা কম দামে ফ্ল্যাট নিয়ে সুজিত ওই নির্মাণ সংস্থার অংশীদারদের অনেকের পরিজনকে দক্ষিণ দমদম পুরসভায় চুক্তিভিত্তিক চাকরি পাইয়ে দেন। অর্থাৎ, তাঁদের পুরসভা মারফত মাস মাইনের বন্দোবস্ত করা হয়। তদন্তে উঠে এসেছে, ওই পুরকর্মীদের আদতে কিছুই করতে হত না। কিন্তু মাসে মাসে মাইনের টাকা পকেটে ঢুকত। আখেরে টাকা খরচ হলেও পুর পরিষেবা থেকে বঞ্চিত হতেন এলাকাবাসী।
তদন্তকারীদের সূত্রে দাবি, নির্মাণ সংস্থার একাধিক অংশীদারের পরিবারের তিন-চার জন করে চাকরি পেয়েছেন। অর্থাৎ, পুরসভার চাকরি বিক্রি করেই সুজিত নিজে ও তাঁর আত্মীয়দের নামে শহরে বেশ কয়েকটি ফ্ল্যাটের মালিক হয়ে ওঠেন বলে দাবি। এখানেই শেষ নয়! বাজারদরের পুরো টাকা লেনদেন না-হওয়ায় সুজিতের ওই সম্পত্তি তথা ফ্ল্যাটের সরকারি ভাবে রেজিস্ট্রি হয়নি। এবং পুরসভার কাছে ওই সম্পত্তি সুজিতের পরিজনের নামে নথিভুক্তও হয়নি।
তদন্তকারীদের সূত্রে দাবি, এক দিকে পুরো টাকা না-দিয়ে দখল করা ফ্ল্যাটের দাম পুরসভার মাধ্যমে বেআইনি চাকরি দিয়ে মেটানো হয়, অন্য দিকে, ফ্ল্যাটের রেজিস্ট্রি বাবদ সরকারি কোষাগারে টাকা জমা পড়েনি। তা ছাড়া, সম্পত্তির মিউটেশন (নামপত্তন) না হওয়ায় বার্ষিক কর থেকে বঞ্চিত হয়েছে পুরসভা। দাবি, ২০১৬ সালে ওই সব ফ্ল্যাট এবং দু’টি গ্যারাজের দখল নিয়েছিলেন সুজিত। এবং ২০১৬ থেকেই দক্ষিণ দমদম পুরসভায় কর বাবদ কোনও টাকা জমা পড়েনি। এক দিকে রাজ্য সরকার অন্য দিকে দক্ষিণ দমদম পুরসভা প্রাপ্য টাকা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। প্রাক্তন মন্ত্রীর বেআইনি ভাবে দখল করা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হতে পারে বলেও ইডির তদন্তকারীদের সূত্রে জানা গিয়েছে।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)