ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর)-এর কাজে একগুচ্ছ অনিয়মের অভিযোগ তুলে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে ফের চিঠি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে এই নিয়ে দু’বার জ্ঞানেশকে চিঠি লিখলেন মুখ্যমন্ত্রী। এই নিয়ে মোট পাঁচটি চিঠি দিলেন মমতা।
মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, ভোটারদের অনেকে কাগজ জমা দিয়েছেন। তার পরেও তাঁদের নাম কাটা হচ্ছে। এসআইআরের শুনানিতে ভোটাররা নথি জমা দিলেও কোনও রসিদ বা প্রমাণ দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। তাঁর আরও অভিযোগ, কমিশনের তরফে পরে বলা হচ্ছে, ভোটারের কাগজ পাওয়া যায়নি। অথবা রেকর্ডে নেই। এই অজুহাতে ভোটারদের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর।
২০০২ সালের ভোটার তালিকা ‘ডিজিটাইজ়ড’ করতে গিয়েও ভুলভ্রান্তি হয়েছে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর বক্তব্য, ২০০২ সালের তালিকা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-র সাহায্যে ইংরেজিতে অনুবাদ করা হয়েছে। এর ফলে ভোটারদের নামের বানান, বয়স, পিতার নাম, সম্পর্ক, লিঙ্গপরিচয় চিহ্নিতকরণে ভুল হচ্ছে বলে অভিযোগ মুখ্যমন্ত্রীর। তাঁর বক্তব্য, এই সমস্ত ভোটারের ক্ষেত্রেই তথ্যগত ভ্রান্তি বা লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির কথা বলছে কমিশন।
এসআইআর নিয়ে জ্ঞানেশকে লেখা পঞ্চম চিঠিতেও মুখ্যমন্ত্রীর অভিযোগ, অযথা মানুষকে হয়রান করছে কমিশন। তাঁর বক্তব্য, সামান্য বানান ভুলের জন্যও নোটিস দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে সমস্যা খুব ছোট, যা অফিসে বসেই ঠিক করা যায়। তার বদলে মানুষকে শুনানির জন্য নোটিস পাঠিয়ে ডেকে নিয়ে গিয়ে সময় এবং টাকা নষ্ট করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশন নিজেদের পুরনো নির্দেশই মানছে না বলে অভিযোগ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। চিঠিতে তিনি লিখেছেন, “এর আগে কমিশন বলেছিল, পুরনো ভোটার তালিকার সঙ্গে না-মিললে ভোটারকে নোটিস দেওয়া হবে। কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, যাঁদের সব তথ্য মিলেছে, তাঁদেরকেও নোটিস পাঠানো হচ্ছে।’’
মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের কাছে মুখ্যমন্ত্রীর আর্জি, অযথা হয়রানি বন্ধ করতে, মানুষের ভোটাধিকার রক্ষা করতে ভুল পদ্ধতি অবিলম্বে সংশোধন করতে হবে। একই সঙ্গে তাঁর সংযোজন, ভোটার তালিকা সংশোধন করা দরকার, কিন্তু প্রকৃত ভোটারদের বাদ দিয়ে নয়।
গত শনিবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠিতে মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেছিলেন যে, এসআইআর প্রক্রিয়ায় সংবেদনশীলতার অভাব রয়েছে। কমিশন যে ভাবে সাধারণ মানুষকে হেনস্থা করছে, তাতে তিনি স্তম্ভিত এবং বিরক্ত বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। শনিবার টাইপ করা চিঠির শেষে তিনি হাতে দু’লাইন লিখে দেন। সেখানে মমতা লিখেছিলেন, ‘‘আমরা মনে হয় এই চিঠির উত্তর পাব না। তবে আমার কর্তব্য, বিষয়গুলি আপনার কাছে তুলে ধরা।’’
শনিবার মুখ্যমন্ত্রী মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দেওয়ার পরেও পাল্টা চিঠি দিয়েছিলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী। সেই চিঠিতে শুভেন্দু দাবি করেন, পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও স্বচ্ছ নির্বাচন নিশ্চিত করতে এসআইআর একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চিঠিতে দাবি করেছিলেন, এসআইআর প্রক্রিয়ার জেরে ৭৭ জনের মৃত্যু হয়েছে। বিরোধী দলনেতা লেখেন, মুখ্যমন্ত্রী দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ মনগড়া, এমন দাবির সপক্ষে কোনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। এসআইআর-এর সঙ্গে এই ধরনের মৃত্যুর যোগসূত্রের কোনও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। অমর্ত্য, দেব, শামি-সহ বিশিষ্ট ব্যক্তিদের শুনানির নোটিস পাঠানো নিয়ে বিরোধী দলনেতার যুক্তি, আইনের চোখে সকলেই সমান, সেখানে কোনও ব্যতিক্রমের সুযোগ নেই।
এসআইআর প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এর আগে ২০ নভেম্বর ২ ডিসেম্বর, ৩ জানুয়ারি এবং ১০ জানুয়ারি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি লিখেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী। সোমবার এই নিয়ে পঞ্চম চিঠি লিখলেন তিনি।