নবীনবরণের জন্য টাকা তোলা হলেও টিএমসিপি-র রাতভর ঘেরাওয়ের চাপে সেষ পর্যন্ত সে টাকা ফিরিয়ে দেওয়াই সিদ্ধান্ত নিল বহরমপুর কলেজ কর্তৃপক্ষ।
তবে, ঘেরাওয়ের ওই জবরদস্তি নতুন নয়। মাস খানেক আগে কলেজের দুই টিএমসিপি সদস্য গায়ে পেট্রল ঢেলে আত্মহত্যার ‘নাটক’ করে ছিলেন। সে ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই মঙ্গলবার শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা শিক্ষকদের রাতভর ঘেরাও করে রাখলেন। ওই দিন দুপুর থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত তারা শিক্ষকদের ঘেরাও করে রাখায় অসুস্থও হয়ে পড়েন কয়েক জন বলে কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে।
টিএমসিপি-র দাবি, কলেজ কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হয়ে নবীনবরণ ও সোস্যালের আয়োজন করছেন না। আবার ছাত্র সংসদের মাধ্যমেও ওই অনুষ্ঠান করতে উদ্যোগ নিচ্ছেন না। এ দিন ভোরে কলেজ কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে আলোচনার আশ্বাস দিলে শেষ পর্যন্ত বিক্ষোভ উঠে যায়।
বছর দু’য়েক ধরে কল্যাণী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন কোনও কলেজে ছাত্র ভোট হয়নি। ফলে কলেজগুলিতে নির্বাচিত ছাত্র সংসদেরও অস্তিত্ব নেই। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত শেষ ছাত্র ভোটে বহরমপুর কলেজের ছাত্র সংসদের দখল নেয় ছাত্র পরিষদ। পরে ছাত্র সংসদের সব পদাধিকারীরা টিএমসিপিতে যোগ দেয়।
তবে চাপে রাখার এমন ঘটনা এই প্রথম নয়। এর আগে গত ৬ জানুয়ারি একই দাবি জানিয়ে কলেজের মধ্যে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের দু’জন সদস্য গায়ে পেট্রল ঢেলে আত্মহত্যা করার হুমকিও দেয়। ওই ঘটনার পরে মঙ্গলবার ফের কলেজ শিক্ষক ও শিক্ষিকাদের ঘরের মধ্যে ঘেরাও করে রাখে। পরে সন্ধ্যার দিকে শিক্ষিকাদের ছেড়ে দিলেও সারা রাত আটকে রাখা হয় প্রায় ১৫-২০ জন শিক্ষককে। তবে রাতে শিক্ষকদের চপ, মুড়ি, চানুচুর খাইয়েছে। ঘন ঘন চা খাওয়ানোরও বন্দোবস্ত করে তারা।
বহরমপুর কলেজ সূত্রে জানা গিয়েছে, এক টানা গত তিন বছর ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫ এবং ২০১৫-১৬ সালের শিক্ষাবর্ষে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হয়নি। ফলে বহরমপুর কলেজের ছাত্র সংসদ কোনও রাজনৈতিক দলের দখলে নেই। এ দিকে নির্বাচিত ছাত্র সংসদ না থাকায় কলেজের সোশ্যাল অনুষ্ঠান, নবীণবরণ, বসন্ত উৎসব অনুষ্ঠানও হয়নি। কারণ কলেজে ভর্তির সময়ে সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে ওই খাতে যে অর্থ নেওয়া হয়, তা জমা পড়ে ছাত্র সংসদ খাতে। এখন নির্বাচিত ছাত্র সংসদ ছাড়া ওই অর্থ খরচ করার অধিকার কারও নেই। কিন্তু সে কথায় আমল দেয়নি শাসক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্যরা।
তৃণমূল ছাত্রপরিষদের বহরমপুর কলেজ শাখা সংগঠনের সভাপতি শেখ সানসাইন বলেন, ‘‘গত দু’বছর ধরে সোশ্যাল অনুষ্ঠান, নবীণবরণ, বসন্ত উৎসব, সরস্বতী পুজো হয়নি কলেজে। সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দাবি এ বছর কলেজে ওই সমস্ত অনুষ্ঠান আয়োজন করতে হবে। কিন্তু কলেজ কর্তৃপক্ষ ছাত্রছাত্রীদের আবেগকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। নিজেরাও অনুষ্ঠান করবে না, আমাদের হাতেও অনুষ্ঠানের দায়িত্ব তুলে দিচ্ছে না। তাই সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা তাদের দাবি পূরণের জন্য বাধ্য হয়ে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের ঘেরাও করে রাখে। এটা তৃণমূল ছাত্র পরিষদের কোনও নিজস্ব ব্যাপার নয়।’’ যদিও অভিযোগ, ঘেরাও করা ছাত্রাছাত্রীদের মধ্যে অধিকাংশই ছিল বহিরাগত।
শারীরিক অসুস্থতার কারণে বহরমপুর কলেজ অধ্যক্ষ ছুটিতে রয়েছেন। তাঁর অনুপস্থিতিতে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের দায়িত্বে রয়েছেন চার জন, তাঁর মধ্যে অন্যতম শান্তনু ভাদুড়ি বলেন, ‘‘এ দিন ভোর চারটেয় ঘেরাও তুলে নেওয়া হয়। সারা রাত দু’চোখের পাতা এক করতে পারিনি।’’
এ দিন অবশ্য স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকের জন্য দুপুর তিনটে নাগাদ কলেজের সমস্ত পঠনপাঠন বন্ধ হয়ে যায়। শান্তনু ভাদুড়ি জানান, ওই অনুষ্ঠান উপলক্ষে ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়। এখন ওই অনুষ্ঠান না হলে সেই অর্থ ছাত্রছাত্রীদের ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানায় তারা। সেই মত বিষয়টি নিয়ে স্টাফ কাউন্সিলের বৈঠকে সমস্ত শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। ওই অর্থ ছাত্রছাত্রীদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে সকলে একমত হন। তবে এ ব্যাপারে আমরা কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারি না। স্টাফ কাউন্সিলের মতামত অধ্যক্ষকের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে। এখন কলেজ অধ্যক্ষ হিসেবে তিনি যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার নেবেন।
কলেজের দর্শনের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শ্রুতি ভট্টাচার্য বলেন, ‘‘সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের দাবি বলে তৃণমূল ছাত্র পরিষদ নিজেদের আড়াল করার চেষ্টা করছে। কিন্তু কোন সাধারণ ছাত্রছাত্রী তাদের কাছে গিয়ে ওই দাবি জানায়নি।’’