ঘোষণা মতো নরেন্দ্রপুরের নাজিরাবাদে অগ্নিকাণ্ডে নিখোঁজদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হল বুধবার। অনুষ্ঠানে তৃণমূল নেতাদের দাবি, পুলিশের তরফে এই অর্থ-সাহায্য। অথচ, চেকে সই রয়েছে যে দু’টি গুদামে আগুন লেগেছে, সেই ফুলের ডেকরেটর্স সংস্থার মালিকের এবং মোমো সংস্থার প্রতিনিধির। অগ্নিকাণ্ডের জন্য যে দু’টি সংস্থার কর্তাদের বিরুদ্ধে আঙুল উঠেছে, গ্রেফতার করা হয়েছে, তাঁদেরই সই করা চেক পেয়ে পরিবারগুলির ধন্দ, ক্ষতিপূরণ আসলে দিচ্ছে কে! শুরু হয়েছে রাজনৈতিক তরজা।
পূর্ব মেদিনীপুরের মোট ২১ জন নিখোঁজের পরিবারের সদস্যদের থানায় ডেকে ১০ লক্ষ টাকার চেক দেওয়া হয় এ দিন। তমলুক, ময়না, পাঁশকুড়া, নন্দকুমার ও সুতাহাটা থানায় ওই অনুষ্ঠানে তৃণমূল নেতারাও ছিলেন। তমলুক থানার অনুষ্ঠানে জেলা তৃণমূল সভাপতি সুজিত রায় বলেন, “বারুইপুর পুলিশ ও পূর্ব মেদিনীপুর জেলা পুলিশ-পরিবার আপাতত আর্থিক সহায়তা নিয়ে আপনাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। আগামীতে রাজ্য সরকার যা-যা সহযোগিতা করবে, তা পুলিশ-প্রশাসনের মাধ্যমেই পাবেন।” পরেও সুজিতের দাবি, “নিখোঁজদের পরিবারগুলিকে সচল রাখতে পুলিশ-পরিবারের তরফে এই আর্থিক সাহায্য দেওয়া হয়েছে।” সুতাহাটা থানার অনুষ্ঠানে হাজির হলদিয়ার তৃণমূল বিধায়ক তাপসী মণ্ডল বলেন, “প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সরকারি তৎপরতায় নিখোঁজদের বাড়ির লোকের হাতে চেক তুলে দিয়েছি।”
অথচ, পাঁচ লক্ষ টাকার যে দু’টি চেক বিলি হয়েছে, তার একটিতে সই রয়েছে ফুলের গুদামের মালিক গঙ্গাধর দাসের। অন্যটিতে মোমো সংস্থার প্রতিনিধির সই। তমলুকে চেক নিতে আসা নীলকুন্ঠা গ্রামের নিখোঁজ বিমল মাইতির বাবা ভরত মাইতি বলেন, “পুলিশই থানায় ডেকেছিল। কিন্তু টাকাটা কে দিল বুঝলাম না!” ধৃত গঙ্গাধরকে এ দিন ফের আদালতে হাজির করানো হয়। তাঁর আইনজীবী অনির্বাণ গুহঠাকুরতা কোর্টে জানান, গঙ্গাধরের সংস্থার গুদামে থাকা ২৪ জন শ্রমিকের পরিবারকে সংস্থার তরফে পাঁচ লক্ষ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আগামী দিনে আবার সংস্থা গড়ে মৃতদের পরিজনকে চাকরিও দিতে চান গঙ্গাধর।
অগ্নিকাণ্ডে মৃত বারুইপুরের বাসুদেব হালদারের পরিবারকেও ১০ লক্ষ টাকার চেক দেওয়া হয়েছে মঙ্গলবার। তাঁর বাড়িতে যান বারুইপুর পশ্চিমের বিধায়ক বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ও সোনারপুর উত্তরের বিধায়ক ফিরদৌসী বেগম। মোমো সংস্থার কর্মী বাসুদেবের ছেলে দয়াময় বলেন, “প্রথমে ভেবেছিলাম, সরকারের তরফে চেক দিল। পরে দেখি, মোমো সংস্থার চেক। মোমো সংস্থার প্রতিনিধিরা এসে বলেও গিয়েছেন, চেক ওঁদের তরফেদেওয়া হয়েছে।’’
প্রশাসন সূত্রের বক্তব্য, এমন ঘটনায় প্রশাসনিক রিপোর্ট দাখিল হয়। তার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ করে তা সরকারেরই দেওয়ার কথা। বিপর্যয় মোকাবিলা দফতরের খাতে এমন সাহায্যের রীতি রয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে কি টাকা ওই দুই অভিযুক্ত সংস্থার থেকেই নেওয়া হচ্ছে?
বিধায়ক তথা বিধানসভার স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, ‘‘কার চেক কিছু জানি না।’’ বিধায়ক ফিরদৌসীর বক্তব্য, “বিষয়টি পুলিশ দেখছে।” অথচ, বারুইপুর পুলিশ জেলার সুপার শুভেন্দ্র কুমার বলেন, “ক্ষতিপূরণের বিষয় পুলিশের দেখার কথা নয়। পুলিশ তদন্তের বিষয়টি দেখছে।” পূর্ব মেদিনীপুরের ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মিতুনকুমার দে-র বক্তব্য, ‘‘পুলিশ-পরিবারের তরফে আর্থিক সাহায্য করা হয়েছে, বিষয়টা এমন নয়। আমাদের কাজটা এখানে সহায়তাকারীর (ফেসিলিটেটর)। সরকারের তরফে যে ঘোষণা, তার প্রক্রিয়া সহজতর করছি আমরা। আমাদের ভূমিকা এটুকুই।’’
কাঁথির বিজেপি সাংসদ সৌমেন্দু অধিকারী বলেন, ‘‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে যে কেউ আর্থিক সহায়তা করতে পারেন। কিন্তু সরকারি ভাবে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযুক্ত পক্ষের চেক বিলি করা অন্যায়।’’ রাজ্য তৃণমূলের অন্যতম সাধারণ সম্পাদক কুণাল ঘোষের অবশ্য মত, ‘‘ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা পাওয়াটাই বড় ব্যাপার। এতে কোনও বিতর্ক থাকতেই পারে না।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)