রাত ১টা বেজে ৩৫ মিনিট। ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের পাঁচতলা।
লিফ্টের বাইরেই কম্বল মুড়ি দিয়ে ঘুমোচ্ছেন এক ব্যক্তি। পরিপাটি বন্দোবস্ত। পাঁচতলায় ওঠার সিঁড়ির রাস্তা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছেঁড়া কাপড় দড়ির মতো ব্যবহার করে বাঁধা হয়েছে দরজার হাতল। তার পরেও যাতায়াত বন্ধ নিশ্চিত করতে দরজার সামনে বসিয়ে রাখা হয়েছে একটি কাঠের টুল। সিঁড়ির দরজা যেখানে খোলার কথা, সেখানেই পাতা হয়েছে বিছানা। চোখে আলো পড়া আটকাতে জায়গাটি ঘিরে দেওয়া হয়েছে সবুজ মেডিক্যাল স্ক্রিন বা হসপিটাল স্ক্রিন দিয়ে, যা রোগীর গোপনীয়তা রক্ষা বা চিকিৎসা সংক্রান্ত নানা কারণে রোগীর শয্যার পাশে বসানোর কথা। যেটুকু জায়গা স্ক্রিন ঢাকতে পারেনি, সেখানে আবার পাতা হয়েছে একটি কাঠের চেয়ার!
রোগী নাকি? কাছে গিয়ে মাথা-মুখ কম্বলে ঢাকা অবস্থায় ঘুমোনোর দৃশ্য দেখে ভুল ভাঙে। লিফ্টকর্মী কি? বারকয়েক প্রশ্ন করায় কম্বল থেকে মুখ বার করে ঘুম জড়ানো গলায় এক ব্যক্তি বললেন, ‘‘লিফ্ট-ম্যান নেই। আমি সিকিয়োরিটি..!’’ লিফ্ট-ম্যান কোথায়? নিরাপত্তারক্ষীর উত্তর, ‘‘কোথায় কে জানে! ওরা থাকে না।’’
আর জি করের ট্রমা কেয়ারের লিফ্টের বাইরে ঘুমোচ্ছেন এক নিরাপত্তারক্ষী। ছবি: সুমন বল্লভ।
মঙ্গলবার রাতের এই দৃশ্য আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের। লিফ্টে আটকে ও থেঁতলে অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায় নামে এক যুবকের মৃত্যুর ঘটনার পরে পাঁচ দিনও পেরোয়নি। আর জি করের সুপার বা স্বাস্থ্য ভবনের কর্তারা জানিয়েছেন, কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এ বার থেকে প্রতিটি লিফ্টে কর্মী থাকবেন। ২৪ ঘণ্টা তাঁদের কাজে দেখা যাবে! কিন্তু বাস্তবে দেখা গেল, মঙ্গলবার মধ্যরাতে ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের চারতলায় লিফ্ট রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীদের ঘরে তালা ঝুলছে! বিল্ডিংয়ের কোথাওই কোনও লিফ্টকর্মীর দেখা মেলেনি। লিফ্টের ভিতরে শুধু পড়ে রয়েছে লিফ্টকর্মীর বসার জন্য রাখা টুল। রোগীকে নিয়ে নিজেদেরই লিফ্ট চালিয়ে ওঠানামা করতে হচ্ছে পরিজনদের। ভুল করে লিফ্ট বেসমেন্টে চলে গেলে সেখানেও দুর্ঘটনার দিনের মতোই তালা ঝুলছে। সেখানেও নেই কোনও লিফ্টকর্মী বা নিরাপত্তারক্ষী।
তা হলে কিছুই বদলাল না? আর জি করের জরুরি বিভাগে কর্মরত হাসপাতালের এক কর্মী বললেন, ‘‘আমরা ১৪-১৫ ঘণ্টা ডিউটি করছি। লিফ্টের লোক এসেই ঘুমোতে চলে যান। ছাদে তাঁদের সব বন্দোবস্ত। অনেকে তো সই করে বাড়িও চলে যান। বিপদ ঘটে যাওয়ার পরেও দেখছি কারও হুঁশ হয়নি।’’
শুধু আর জি কর নয়, রাতভর শহরের মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতে ঘুরে দেখা গেল, সর্বত্রই প্রায় একই চিত্র। কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও জরুরি বিভাগে ফাঁকা পড়ে রয়েছে লিফ্টকর্মীর চেয়ার। দোতলা, তেতলা ঘুরেও লিফ্টকর্মীর দেখা মেলেনি। বেরিয়ে আসার মুখে নিরাপত্তারক্ষীদের কাছে লিফ্টকর্মীর খোঁজ করতে ডেকে দেওয়া হল এক জনকে। সুভাষ বসু নামে ওই ব্যক্তি বললেন, ‘‘জেনারেটরের কাজ থেকে অনেক কিছুই আমাকে করতে হয়। সকাল ৬টার ডিউটিতে থাকা লিফ্টম্যান সময়ে আসেন না। তা নিয়ে তো কই কেউ কিছু বলছেন না!’’
এন আর এস মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও একাধিক ওয়ার্ডের লিফ্টে কোনও লিফ্টকর্মীর দেখা মেলেনি। ফ্রেজ়ার বিল্ডিংয়ের লিফ্ট আবার তেতলায় নির্দিষ্ট জায়গায় থামছে না। আতঙ্ক তৈরি হলে সাহায্য করবেন কে? দেখা গেল, ‘ফ্রেজ়ার সার্জারি অপারেশন থিয়েটার’-এর সামনে ঘুমোচ্ছেন এক ব্যক্তি। ডাকা হলে লিফ্টকর্মী পরিচয় দিয়ে বললেন, ‘‘জরুরি বিভাগেই তো ঘুমোচ্ছি, আমি আবার কী দোষ করলাম?’’ জরুরি বিভাগে গিয়ে দেখা গেল, চারটি লিফ্ট খালি পড়ে রয়েছে। লিফ্টকর্মী নেই। অন্যত্র কানে হেডফোন গুঁজে শুয়ে থাকা এক যুবককে জিজ্ঞাসা করতে বললেন, ‘‘দিনে দোকান চালাতে হয়। রাতে ডিউটি নেওয়া তো একটু শোয়ার জন্যই।’’ ন্যাশনাল মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে গিয়ে ফাঁকা লিফ্ট দেখে লিফ্টকর্মীর খোঁজ করতে পরনের নীল পোশাক দেখিয়ে এক ব্যক্তি আবার বললেন, ‘‘আমাকে নিশ্চয়ই লিফ্ট-ম্যান মনে হচ্ছে না! নিজে খুঁজে নিন। পাওয়া গেলে আমাকে বলবেন।’’
প্রতিক্রিয়া পেতে রাজ্যের স্বাস্থ্য সচিব নারায়ণস্বরূপ নিগমকে বার বার ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি। উত্তর মেলেনি মেসেজেরও। তবে এসএসকেএম হাসপাতালে ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ে দেখা মিলল লিফ্টকর্মীর। একতলায় দু’টি লিফ্টের সামনে একটি চেয়ার পাতা। তাতে বসেই গোটা বিল্ডিংয়ের লিফ্টচালানোর কাজ চলে। রাত আড়াইটেয় দেখা গেল, সেই চেয়ারে বসে ঘুমোচ্ছেন এক ব্যক্তি। শৌচাগার কোথায়? কয়েক বার প্রশ্ন করলেও উত্তর এল না। দূর থেকে এক নিরাপত্তারক্ষী ইশারায় উপরে যেতে বললেন। লিফ্টের যাতায়াত চলতে থাকলেও ঘুম ভাঙল না লিফ্টকর্মীর।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)