সদ্য শেষ হয়েছে তলবি সভা। প্রায় ছয় দশকের দখলদারি খুইয়ে, শাসক দলের কাছে এক ভোটে কান্দি পুরবোর্ড হারিয়েছে কংগ্রেস। হারের যন্ত্রণা চেপে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী অবশ্য দাবি করছেন, টাকার কাছে এই লড়াইটা হারলেও ‘শেষ যুদ্ধ’ তাঁরাই জিতবেন।
শুক্রবার বিকেলে সেই সম্ভাব্য যুদ্ধ জয়ের একটা ব্যাখ্যাও দিয়েছেন অধীর— ‘‘হাত (কংগ্রেস) ছিল, এ বার তার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে হাতুড়ি (সিপিএম)। জেনে রাখুন, সেই হাতুড়ির ঘা পড়লে, রাজ্যে তৃণমূল বলে আর কিছু থাকবে না!’’ নির্দল কাউন্সিলর অপহৃত হওয়ার পরে এই ভোটাভুটি নিয়ে তারা ফের হাইকোর্টে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছে কংগ্রেস।
মুর্শিদাবাদে নিজের খাসতালুকে কান্দি পুরসভা খোয়ালেও জোট যে তাঁর কাছে অনেক বড় স্বস্তি, দিনভর অধীরের চোখে-মুখে তার ছাপই ছিল স্পষ্ট। কান্দি পুরসভার অদূরে, কখনও ধর্না মঞ্চে কখনও বা থানার সামনে দাঁড়িয়ে দলীয় নেতা-কর্মীদের অনর্গল আশ্বস্ত করে গিয়েছেন একই কথায়—‘‘আর ক’টা দিন অপেক্ষা করুন, জোটের জোয়ারে ভেসে যাবে তৃণমূলের অপশাসন।’’ কখনও বা ধরাতে চেয়েছেন ইতিহাসের সূত্র— ‘‘এই মুর্শিদাবাদ থেকেই শুরু হয়েছিল সিপাহি বিদ্রোহ, রাজ্যে জোটেরও সূত্রপাত হল এখানেই।’’
সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটি এ রাজ্যে কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা নিয়ে আলোচনার দরজা খোলায় জোটপন্থী অধীর যে স্বস্তিতে, কান্দি হাতছাড়া হওয়ার পরেও বারবার বাম-কংগ্রেস জোট প্রসঙ্গ তুলে সে কথাই বুঝিয়ে দিয়েছেন। পাশাপাশি, দাবি করেছেন, তৃণমূলের লোকেরা বাম সমর্থিত নির্দল কাউন্সিলর দেবজ্যোতি রায়কে অপহরণ না করলে এবং তিনি ভোট দিতে পারলে কান্দিও তাঁদের হাতছাড়া হত না।
শুক্রবার রাতেও দেবজ্যোতিবাবুর খোঁজ পায়নি পুলিশ। দেবজ্যোতিকে উদ্ধারের দাবিতে এ দিন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠীর সঙ্গে দেখা করেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতারা। রাজ্যপাল উদ্বেগ প্রকাশ করে খোঁজ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলেও তাঁদের দাবি।
বছরখানেক আগে, কান্দি পুর নির্বাচনে ১৮টি আসনের মধ্যে ১৩টি দখল করেছিল কংগ্রেস। তিনটি পায় তৃণমূল, কি দু’টি আসনে জয়ী হয়েছিলেন বাম-সমর্থিত নির্দল প্রার্থী দোবজ্যোতি ও তাঁর স্ত্রী সান্ত্বনা রায়। কংগ্রেসের অন্দরের খবর, মাস দুয়েক আগে দলের পাঁচ কাউন্সিলর তৃণমূলে যোগ দেওয়ার পরে তাদের সংখ্যা নেমে আসে আটে। তৃণমূলও আটে উঠে আসে। অস্তিত্বের সঙ্কট কাটাতে ওই দুই নির্দল কাউন্সিলরের সঙ্গে সমঝোতা করেছিল কংগ্রেস। কিন্তু কিছু দিন আগে দলের আরও এক কাউন্সিলর তৃণমূলে পা বাড়ানোয় তৃণমূলের কাউন্সিলর সংখ্যা দাঁড়ায় নয়ে, কংগ্রেসের সাত। দুই বাম-সমর্থিত নির্দলের সঙ্গে মিলিজুলি করে ভারসাম্য কোনও রকমে টিকিয়ে রেখেছিল কংগ্রেস। কিন্তু তৃণমূলের আনা অনাস্থা প্রস্তাবের ভোটাভুটির ঠিক আগে দেবজ্যোতি অপহৃত হওয়ায় তৃণমূলের পাল্লা ভারি হয়ে যায়। সেই অঙ্কেই এ দিন বোর্ডের দখল তাদের হাতে চলে গিয়েছে।
কান্দি পুরবোর্ডের সমীকরণ বদলে গেলেও কংগ্রেস এ নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টে ফের মামলা করতে চলেছে বলে জানিয়েছেন দলের আইনজীবী প্রতীপ চট্টোপাধ্যায়। তিনি জানান, কাউন্সিলর অপহরণের প্রেক্ষিতে বৃহস্পতিবারই বিচারপতি দীপঙ্কর দত্তের এজলাসে পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার মামলা করা হয়েছিল। বিচারপতি দত্ত মুর্শিদাবাদের পুলিশ সুপার ও কান্দির মহকুমা পুলিশ অফিসারকে নির্দেশ দেন, ওই পুর প্রতিনিধিকে উদ্ধার করে বৈঠকে হাজির করানোর জন্য যথাসম্ভব চেষ্টা করতে। তা করতে না পারলেও বৈঠক সংক্রান্ত অভিযোগ নিয়ে ফের হাইকোর্টে মামলা করা যাবে বলে জানিয়েছিলেন বিচারপতি। সেই মতোই কংগ্রেস ফের আদালতের শরণাপন্ন হতে চলেছে।
যা শুনে হাসছেন, মুর্শিদাবাদ জেলা তৃণমূল সভাপতি মান্নান হোসেন। বলছেন, ‘‘হাইকোর্ট কেন ওরা (কংগ্রেস) রাষ্ট্রপুঞ্জে যাক না, কান্দি আটকাতে পারবে না। যেমন পারবে না জোট করে রাজ্য দখল করতে।’’
এই তোপ, পাল্টা তোপের মাঝে, প্রায় দু’মাস ধরে চলা কান্দি পুরসভার অচলাবস্থা যে কাটছে না এখনই, তা কার্যত স্পষ্ট।