রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পরে এ বারই প্রথম সরকারি ভাবে আজ, ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালিত হচ্ছে, যেখানে আসার কথা প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর। তার আগে বিজেপির বিরুদ্ধে ‘অসত্য, অর্ধসত্য’ ইতিহাস প্রচারের অভিযোগ তুলে দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গের ‘জন্মদিন’ হিসাবে পালনের যুক্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলল কংগ্রেস, সিপিএম-সহ বিরোধীদের একাংশ। ‘সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে’র কথা বলে এই নিয়ে ইতিহাস-প্রচারেও নেমেছে তারা। পাল্টা প্রচারেনেমেছে বিজেপি।
বিজেপি দলীয় ভাবে এই দিনটিকে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করেছে। অতীতে রাজভবনেও দিনটি পালিত হয়েছে। রাজ্যে পালাবদলের পরে ২০ জুন তারিখটিকে সরকারি ভাবে পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে পালন করা হবে জানিয়েছিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। তিনি শুক্রবার বলেছেন, “১৯৪৭-এর ২০ জুন শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে প্রাদেশিক আইনসভায় জন্ম নিয়েছিল পশ্চিমবঙ্গ। হুগলির তারকেশ্বরে শ্যামাপ্রসাদের নেতৃত্বে ৪, ৫ এবং ৬ এপ্রিল বাঙালি হিন্দুর নিজ ভূমি তৈরির স্বার্থে পশ্চিমবঙ্গ তৈরির পরিকল্পনা হয়েছিল।” জনতার উদ্দেশে শমীকের আহ্বান, “আসুন, ইতিহাসকে জানি, সত্যকে স্মরণ করি এবং আগামী প্রজন্মের হাতে গর্বের সঙ্গে তুলে দিই পশ্চিমবঙ্গের আত্মপরিচয়ের অমূল্য উত্তরাধিকার।”
অতীতে বিজেপি ২০ জুনকে রাজ্য দিবস হিসাবে পালন করার কথা বললেও তৎকালীন তৃণমূল সরকার পয়লা বৈশাখকে রাজ্য দিবস হিসেবে পালন করত। এই প্রেক্ষিতেতৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ বলেছেন, “ইতিহাসবিদদের পরামর্শ, নাগরিক সমাজের প্রত্যাশাকে মাথায় রেখে পয়লা বৈশাখকে এই মর্যাদা দিয়েছিল আমাদের সরকার। এখন রাজনৈতিক স্বার্থে সিদ্ধান্ত হলে ইতিহাস ও মানুষের প্রত্যাশার আধারেই তার মূল্যায়ন হবে।”
বিজেপি ‘ভুল’ ইতিহাস প্রচার করছে বলে অভিযোগ তুলে ‘ঠিক’ ইতিহাস তুলে ধরার কথা বলেছে সিপিএম। দলের কলকাতা জেলা কমিটি ২১ থেকে ২৪ জুন শহর জুড়ে ৪০টি জায়গায় ‘মানুষের দরবারে মানুষের ইতিহাস’ নামে কর্মসূচি নিয়েছে। দলের কলকাতা জেলা সম্পাদক কল্লোল মজুমদার বলেছেন, “আমরা দেশভাগের প্রকৃত ইতিহাস, দেশভাগ ও শ্যামাপ্রসাদের ভূমিকার মতো নানা বিষয় তথ্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরব।” ‘দেশ ভাগ’ থেকে ‘দেশ বিক্রি’: উগ্র দক্ষিণপন্থার ঐতিহাসিক গতিপথ’ শীর্ষক একটি বইও আজ, প্রকাশ করবে সিপিএম। দলের নেতা সুজন চক্রবর্তীও বলেছেন, “বিজেপি ভিত্তিহীন কথা বলছে। বাংলা ভাগের সিদ্ধান্ত হয়েছিল ৩ জুন, ১৯৪৭-এ। ২০ জুন ভোটাভুটি হয়। বিষয়টি কার্যকর হয় ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট। কিন্তু বর্তমানে পশ্চিমবঙ্গের যে মানচিত্র, তা পুরুলিয়া যুক্ত হওয়ার দিন, ১৯৫৬-র ১ নভেম্বর তৈরি হয়েছে।” তাঁর সংযোজন, “প্রাদেশিক আইনসভায় হিন্দু মহাসভার সদস্য হিসাবে ছিলেন শ্যামাপ্রসাদ। বাকি যে ৫৭ জন পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির পক্ষে ছিলেন, তাঁরা কি বানের জলে ভেসে এসেছিলেন?”
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকারও এ দিন বলেছেন, “বিজেপি শ্যামাপ্রসাদকে পশ্চিমবঙ্গ তৈরির একমাত্র কান্ডারি বলছে, যা অর্ধসত্য। প্রাদেশিক আইনসভায় যে ৫৮ জন পশ্চিমবঙ্গের ভারতভুক্তির পক্ষে ছিলেন, তার মধ্যে শ্যামাপ্রসাদ, কমিউনিস্ট পার্টির জ্যোতি বসু-সহ দু’জন ছাড়া বাকিরা সবাই কংগ্রেসের সদস্য ছিলেন। আর পশ্চিমবঙ্গ দিবস হিসেবে যদি কোনও দিনকে মনে করেন কেউ, সেটা ১৯৪৭-এর ১৫ অগস্ট। কারণ, সে দিনই পশ্চিমবঙ্গ স্বীকৃতি পেয়েছিল।” একই সূত্রে দেশ ভাগ নিয়ে দীর্ঘ দিন গবেষণা করা শান্তনু দত্ত চৌধুরীও বলেছেন, “দেশভাগ যদি হয়, তা হলে তার শর্ত হিসাবে পঞ্জাব ও বাংলাও ভাগের কথা বলেছিলেন জওহরলাল নেহরু ও সর্দার বল্লভভাই পটেল। পুরো প্রক্রিয়ায় শ্যামাপ্রসাদ ছিলেন না।” ‘পশ্চিমবঙ্গের জন্মবৃত্তান্ত: অর্ধসত্য প্রচারের বিরুদ্ধে প্রামাণ্য দলিল’ শীর্ষক একটি বইও প্রকাশকরেছে কংগ্রেস।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)