আবার প্রহৃত পুলিশ। রাস্তায় হোক বা খাস থানা ভবনে, আইনশৃঙ্খলার রক্ষকদের উপরে পরের পর হামলা দেখছে হাল আমলের বাংলা। তবে সেগুলো মূলত সাধারণ ভাবে পুলিশবাহিনীর উপরে যূথবদ্ধ আক্রমণ বা পথের আইন ভেঙে মরিয়া হয়ে ট্রাফিক পুলিশকে মার। দীর্ঘদিন ধরে রাগ পুষে রেখে, তক্কে তক্কে থেকে ব্যক্তি-পুলিশের উপরে হামলা ছিল না সেগুলো। এ বার সেটাও দেখল কলকাতা।
সোমবার ঘটনাটি ঘটেছে ভিআইপি রোডের উপরে, তেঘরিয়া বাসস্ট্যান্ডে। দুপুরে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন মণিশঙ্কর রায় নামে বিধাননগর কমিশনারেটের সাইবার থানার এক সাব-ইনস্পেক্টর। একটি লোক হঠাৎই ছুটে এসে আস্ত থান ইট নিয়ে তাঁর মাথা তাক করে আঘাত হানে। মণিশঙ্করবাবু কোনও মতে মাথা বাঁচাতে পারলেও পিঠ বাঁচাতে পারেননি। ইটের আঘাত লাগে তাঁর পিঠে। ঘটনার আকস্মিকতায় তাজ্জব বনে যান বাসের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা প্রত্যক্ষদর্শীরা। মণিশঙ্করবাবুকে বাঁচাতে গিয়ে জখম হন এক ট্রাফিক পুলিশকর্মীও। অরূপকুমার ঘোষ নামে ওই পথ-পুলিশের আঙুল কামড়ে ধরে আক্রমণকারীরা। অন্য ট্রাফিক-কর্মীরা ছুটে গিয়ে ওই ব্যক্তিকে ধরে ফেলেন। তাকে বাগুইআটি থানার পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়।
তার পরেই জানা যায়, মোটেই তাৎক্ষণিক কোনও কারণে এই হামলা চালানো হয়নি। এর পিছনে কাজ করছে দীর্ঘদিনের প্রতিশোধস্পৃহা। অন্তত এক বছরের প্রস্তুতি। সুযোগের অপেক্ষাটাও কম দিনের নয়।
পুলিশ জানায়, ধৃতের নাম রামরঞ্জন মণ্ডল। এক বছর আগে এক নাবালিকার শ্লীলতাহানির অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। আর সেই মামলার তদন্তকারী অফিসার ছিলেন মণিশঙ্করবাবু। জামিনে মুক্তি পাওয়ার পরে তদন্তকারী অফিসারের উপরে নজর রাখছিল রামরঞ্জন। আর খুঁজছিল আক্রমণের সুযোগ। এক বছর পরে, এ দিন সেই সুযোগ মেলে। সঙ্গে সঙ্গে থান ইট নিয়ে মণিশঙ্করবাবুর উপরে হামলা। শ্লীলতাহানির মামলায় অভিযুক্ত রামরঞ্জনকে এ দিন ফের গ্রেফতার করা হয়েছে। এ বার রাস্তায় পুলিশ পেটানোর অভিযোগে।
তদন্তকারীরা জানান, মণিশঙ্করবাবু এক বছর আগে বাগুইআটি থানাতেই কর্মরত ছিলেন। তখনই এক নাবালিকার শ্লীলতাহানির অভিযোগে রামরঞ্জনকে গ্রেফতার করেন তিনি। রামরঞ্জনের বাড়ি বাগুইআটির জ্যাংড়া এলাকায়। শ্লীলতাহানির মামলায় জামিন পাওয়ার পর থেকেই সে মণিশঙ্করবাবুকে টেলিফোনে গালিগালাজ করত, প্রাণনাশের হুমকি দিত বলে অভিযোগ। ওই এসআই অবশ্য বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে চাননি।
তদন্তকারীরা জানান, এ দিন সকালেও মণিশঙ্করবাবুকে হুমকি দেয় রামরঞ্জন। কিন্তু ওই এসআই সেটাকে গুরুত্ব দেননি। দুপুরে তাঁকে তেঘরিয়া বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই আঘাত হানে রামরঞ্জন। বিধাননগর কমিশনারেটের কর্তারা এই বিষয়ে বিশেষ কিছু বলতে চাননি। কমিশনারেটের গোয়েন্দা-প্রধান কঙ্করপ্রসাদ বারুই শুধু বলেন, ‘‘একটা ঘটনা ঘটেছে। তদন্ত চলছে।’’ তবে কমিশনারেটের পুলিশকর্মীদের একাংশ জানান, ওই সাব-ইনস্পেক্টর রাজনৈতিক দলের হাতে প্রহৃত হননি ঠিকই। কিন্তু প্রকাশ্যেই মার খেয়েছেন। সাম্প্রতিক কালে বারবার নিগ্রহের মুখে পড়ছে পুলিশ। বিষয়টি স্পর্শকাতর। তাই মুখে কুলুপ এঁটেছেন কমিশনারেটের কর্তারা।
সম্প্রতি কলকাতার বিভিন্ন প্রান্তে পথ-বিধি ভাঙার অভিযোগে গাড়ির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে আক্রমণের মুখে পড়েছেন পুলিশকর্মীরা। এই রকম ঘটনায় খোদ মেয়রের ভাইঝির নামেও অভিযোগ উঠেছে। ট্রাফিক পুলিশকে নিগৃহীত হতে হয়েছে এক দম্পতির হাতেও। তবে সেগুলো ছিল বেপরোয়া গাড়ি চালানো বা রাস্তার আইন ভেঙে বিপাকে পড়ে আত্মরক্ষার তাৎক্ষণিক মরিয়া চেষ্টা। আর বোলপুর বা আলিপুর থানা কিংবা খয়রাশোল বা চাঁপদানি ফাঁড়িতে ঢুকে পুলিশকে মারধরের ঘটনায় ছিল রাজনৈতিক মাত্রা। কিন্তু কর্তব্য পালন করায় ব্যক্তি-পুলিশের বিরুদ্ধে বদলা নেওয়ার এমন ঘটনা বিরল বলেই পুলিশমহলের অভিমত।