করোনা-রোগীদের হাসপাতাল থেকে ছুটি সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় নির্দেশিকা ঘিরে দ্বিধাবিভক্ত চিকিৎসক সমাজ। তাঁদের একাংশ বলছেন, এই নির্দেশিকা বাস্তবসম্মত। তবে সেই পর্যবেক্ষণে সম্মতি জানিয়েও ঝুঁকি যে রয়েছে তা অস্বীকার করতে পারছেন না চিকিৎসকদের অন্য একটি অংশ।
এত দিন আরটিপিসিআর (রিভার্স ট্রানস্ক্রিপশন পলিমারাইজ় চেন রিঅ্যাকশন)-এ পরপর দু’বার নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এলে, তবেই আক্রান্তকে হাসপাতাল থেকে ছাড়া হত। সেই নিয়মে বদল এনে নতুন নীতিতে বলা হয়েছে, উপসর্গহীন, হালকা-খুবই হালকা উপসর্গ এবং মাঝারি মাপের উপসর্গ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ছুটি দেওয়ার আগে আরটিপিসিআরে নমুনা পরীক্ষা করা আবশ্যক নয়।
কেন্দ্রের এই ছুটি-নীতি রাজ্য কখন চালু করবে, এই প্রশ্নের মধ্যেই নির্দেশিকা ঘিরে কাটাছেঁড়া শুরু হয়েছে। এ রাজ্যে করোনা সংক্রান্ত সরকারি চিকিৎসা নীতির সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত এক সংক্রমক রোগ বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘আরটিপিসিআরের রিপোর্ট রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার প্রমাণ হতে পারে না। তার জন্য ভাইরাস কালচার করতে হবে। সেটা যখন করছি না তখন নতুন কেস ডায়াগনসিসের উপরে জোর দেওয়া উচিত। বর্তমান নিয়মে একটি শয্যা আটকে থাকছে প্রায়
এক মাস।’’
রিপোর্টের বিড়ম্বনা প্রসঙ্গে বেলেঘাটা আইডি হাসপাতালের নোডাল করোনা চিকিৎসক কৌশিক চৌধুরী জানান, গত ১৩ এপ্রিল বাইশ বছরের এক যুবক করোনায় আক্রান্ত হয়ে আইডি-তে ভর্তি হন। ভর্তির বারো দিনের মাথায় তাঁর প্রথম নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ আসে।
তিন দিনের মাথায় তা আবার পজ়িটিভ হয়। চার দিনের মাথায় গত ২ এপ্রিল পরবর্তী পরীক্ষা ফের নেগেটিভ হয়। কিন্তু ৫ এপ্রিলের পরীক্ষায় নেগেটিভ হয়ে যায় পজ়িটিভ। তিনি জানান, ওই রোগী ক্লিনিক্যালি সুস্থ হলেও আরটিপিসিআরের ছাড়পত্র না-মেলায় কুড়ি দিন পরও তাঁকে ছাড়া সম্ভব হয়নি। তবে একই সঙ্গে তিনি জানান, আরটিপিসিআর ছাড়া রোগীকে ছুটি দেওয়ার সুবিধা যেমন রয়েছে ঝুঁকিও আছে। তাঁর মতে, নির্দেশিকায় যে সাত দিন হোম আইসোলেশনের কথা বলা হয়েছে, তা বাড়িয়ে ১৪ দিন করা উচিত।
আরও পড়ুন: রাজ্যে করোনার শিকার বেড়ে ৯৯, শেষ ২৪ ঘণ্টায় মৃত ১১
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ প্রীতম রায় জানান, ইটালি, সিঙ্গাপুর, চিন, আমেরিকার ‘ডিসচার্জ পলিসি’ পর্যালোচনা করে সম্প্রতি একটি টেকনিক্যাল রিপোর্ট প্রকাশ করেছে ‘ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর ডিজ়িজ় প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল’। সেখানেও নমুনা পরীক্ষার চাপ কমাতে অল্প উপসর্গযুক্ত রোগীদের ছুটি দেওয়ার বিষয়টি বিচার করার কথা বলা হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে, মডারেট উপসর্গযুক্ত ব্যক্তি, যাঁদের এক সময় অক্সিজেন দিতে হয়েছে, তাঁদের আরটিপিসিআর ছাড়া ছুটি দেওয়া কতটা বিজ্ঞানসম্মত, তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
একটি বেসরকারি হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল মাইক্রোবায়োলজি তথা ইনফেকশন কন্ট্রোল বিভাগের প্রধান দেবকিশোর গুপ্তও বলেন, ‘‘আক্রান্তের দেহ থেকে অন্তত কুড়ি দিন পর্যন্ত ভাইরাস ছড়াতে পারে। মডারেট কেসের ক্ষেত্রে আরটিপিসিআর ছাড়া ছুটি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিষয়টি আর একটু অপেক্ষা করা উচিত ছিল।’’