মহারাষ্ট্রে করোনা সংক্রমণের বাড়বাড়ন্ত হলে মুম্বইয়ের বেসরকারি হাসপাতাল থেকে ছেলেকে নিয়ে এ রাজ্যে ফিরে আসেন মস্তিষ্কের টিউমারে আক্রান্ত দশ বছরের স্বাগত অধিকারীর বাবা-মা। এখানে নন-কোভিড রোগীদের হাসপাতালে ভর্তি করাতে কী ধরনের হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে, তা জানতে পেরে দিশাহারা হয়ে পড়েন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত হাওড়ার একটি বেসরকারি হাসপাতাল স্বাগতকে ভর্তি নিতে রাজি হয়। মেদিনীপুর থেকে তাকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাওড়ায় নিয়ে আসা হয়।
বজবজের নুঙ্গির বাসিন্দা, বছর পঁয়ষট্টির আবিদ আলির গালে ক্যানসার। বৃদ্ধের ছেলে শেখ সাজিদ আলি বলেন, ‘‘বাবা খুব কষ্ট পাচ্ছেন। সামনের সপ্তাহে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেলে যাব কোথায়?’’
উত্তরপাড়ার বাসিন্দা, বছর সাতাত্তরের গীতা বাগচীর হঠাৎ খিঁচুনি শুরু হয় রবিবার রাতে। কিন্তু অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া যায়নি। তাঁর পরিবারের অভিযোগ, পুলিশের বারণ আছে, এই বলে এলাকায় ঢুকতে চাননি অ্যাম্বুল্যান্স চালকেরা। স্বাস্থ্য ভবনের সঙ্গে যুক্ত, তাঁদের এক চিকিৎসক আত্মীয়ও অ্যাম্বুল্যান্স জোগাড় করার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। শেষমেশ ভোরে অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া যায়। স্বাগত, আবিদ, গীতাদেবীর মতো অন্য রোগে আক্রান্তদের চিকিৎসা পরিষেবা দেওয়ায় এখন এ ভাবেই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে করোনা আতঙ্ক। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্বাস্থ্যকর্মীদের বিরুদ্ধে পাড়া-প্রতিবেশীর সামাজিক ফতোয়া।
সম্প্রতি হাওড়ার ওই বেসরকারি হাসপাতালের এক নার্স-সহ পাঁচ জন স্বাস্থ্যকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। হাসপাতাল সূত্রের খবর, এ কথা জানাজানি হওয়ার পরে হাসপাতালের নার্সদের একাংশ নিজেদের পাড়ায় প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছেন। ওই হাসপাতালের ক্লিনিক্যাল ডিরেক্টর সুমন মল্লিক জানান, কিছু বাসিন্দার বক্তব্য, আক্রান্তদের যেমন হাসপাতালে যেতে বারণ করা হয়েছে, তেমনই হাসপাতালে কাজে যোগ দিলে কোনও স্বাস্থ্যকর্মী যেন পাড়ায় না ঢোকেন!
আন্দুল রোডে অবস্থিত সংশ্লিষ্ট বেসরকারি গ্রুপের দু’টি হাসপাতাল রয়েছে। একটি সুপার স্পেশ্যালিটি এবং অন্যটি মাল্টি স্পেশ্যালিটি। মাল্টি স্পেশ্যালিটি হাসপাতালটিকে আগামিদিনে জেলা প্রশাসনের তরফে লেভেল-টু কোভিড হাসপাতালে পরিণত করার প্রস্তাব রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মাল্টি স্পেশ্যালিটির প্রসূতি, অস্থি, শিশু শল্য এবং শল্য বিভাগকে সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে স্থানান্তরিত করে পরিষেবা দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন কর্তৃপক্ষ। সুপার স্পেশ্যালিটি হাসপাতালে অঙ্কোলজি এবং কার্ডিয়োলজি বিভাগ রয়েছে। সুমনবাবু জানান, স্বাস্থ্যকর্মীরা আক্রান্ত হওয়ায় ইতিমধ্যেই কম সংখ্যক কর্মী নিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। এর উপরে তাঁরা পাড়ায় এ ধরনের প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলে অন্য রোগে আক্রান্তদের পরিষেবা দেওয়া আরও কঠিন হয়ে যাবে। ওই হাসপাতালের ক্যানসার শল্য চিকিৎসক সৌরভ দত্তের কথায়, ‘‘ক্যানসার রোগীদের রেডিয়োথেরাপি বন্ধ করা যায় না। নির্দিষ্ট সময়ে রোগী যদি কেমোথেরাপি না পান, তা হলে কী হবে!’’
হাওড়ার ওই বেসরকারি হাসপাতাল শুধু নয়, সম্প্রতি চিকিৎসাধীন রোগীর করোনা ধরা পড়ায় একই রকম প্রতিকূলতার সম্মুখীন হয়েছে ঠাকুরপুকুর ক্যানসার হাসপাতালও। সপ্তাহখানেক আগে ওই হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদেরও হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে। যার জেরে হাসপাতালে সেই সময়ে চিকিৎসাধীন শিশু-সহ ৫০ জন রোগীকে পরিষেবা দেওয়ার বিষয়টি অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সোমবার ক্যানসার হাসপাতালের অধিকর্তা অর্ণব গুপ্ত জানান, ওই আক্রান্তের সংস্পর্শ যোগে যে ৫০ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে কোয়রান্টিনে রাখা হয়েছিল, তাঁদের সকলের নমুনা পরীক্ষার রিপোর্ট নেগেটিভ এসেছে। তিনি বলেন, ‘‘হাসপাতালের ৮৩০ জন সদস্যের মধ্যে এখন ৩০ শতাংশ স্বাস্থ্যকর্মী কাজে যোগ দিয়েছেন। সাধারণ মানুষকে বুঝতে হবে, তাঁদের কথা ভেবেই আমরা পরিষেবা চালু রাখতে চাইছি।’’
সুমনবাবু বলেন, ‘‘যাঁরা এ ভাবে প্রতিবাদ করছেন, তাঁদের কোনও ধারণা নেই এখন করোনা আক্রান্ত ছাড়া অন্য রোগীদের পরিষেবা পেতে কতটা অসুবিধা হচ্ছে। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে সমাজের সমর্থন চাইছি। আশা করি সেটা পাব।’’
আরও পড়ুন: অ-বিজেপি রাজ্যকে পাশে পেতে চান মমতা