রাজ্যে সরকার বদলের সঙ্গে সঙ্গে বদলে গিয়েছে রাজনৈতিক সমীকরণ। শাসক বিজেপির বিপরীতে বিরোধী পরিসরে নতুন উদ্যমে ঝাঁপাতে চাইছে সিপিএম। শরিক বা সহযোগী দলকে না-ছেড়ে রাজ্যের আসন্ন উপনির্বাচনে এ বার নিজেদের প্রতীকেই লড়াই করতে চাইছে তারা।
বিধানসভা ভোটে একই সঙ্গে দুই কেন্দ্র থেকে জয়ী হয়েছিলেন বিজেপির শুভেন্দু অধিকারী ও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির হুমায়ুন কবীর। মুখ্যমন্ত্রী হয়ে শুভেন্দু ভবানীপুর রেখে নন্দীগ্রামের বিধায়ক-পদে ইস্তফা দিয়েছেন। বেলডাঙার বিধায়ক হিসেবে শপথ নিয়ে রেজিনগর আসন ছেড়ে দিয়েছেন হুমায়ুন। পূর্ব মেদিনীপুর ও মুর্শিদাবাদ জেলার ওই দুই বিধানসভা আসনে উপনির্বাচন হবে। অন্য দিকে, উত্তর ২৪ পরগনার বসিরহাট লোকসভা আসন ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে শূন্য রয়েছে তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ হাজী নুরুল ইসলামের মৃত্যুতে। ওই কেন্দ্রের বিজেপি প্রার্থী রেখা পাত্র নির্বাচন পিটিশন দায়ের করেছিলেন আদালতে। তবে রেখা এ বার হিঙ্গলগঞ্জ থেকে বিজেপির বিধায়ক হয়ে যাওয়ায় ওই আবেদনের জট কেটে যাবে এবং বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে উপনির্বাচন হবে ধরে নিয়ে তৈরি হচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। সিপিএম সূত্রের খবর, দুই বিধানসভা ও একটি লোকসভার উপনির্বাচনে তারা প্রার্থী দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
সদ্য ফলতার পুনর্নির্বাচনে বিজেপির পরে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছে সিপিএম। গত বিধানসভা (তখন জোট ছিল) ও লোকসভার তুলনায় অনেকটা ভোট বাড়িয়ে তারা পেয়েছে ১৯.৩৪%। সরকার থেকে বিদায় নেওয়ার পরেই প্রতাপ কমছে তৃণমূলের। বিধানসভা ভোটেই দেখা গিয়েছে, তৃণমূলের সাম্প্রতিক কালের একচেটিয়া সংখ্যালঘু সমর্থনে ভাগ বসিয়েছে সিপিএম-আইএসএফ এবং কিছু জেলায় কংগ্রেস। ফলতার পুনর্নির্বাচনেও তৃণমূলের সরকারের না-থাকা এবং প্রচারের শেষ দিনে তাদের প্রার্থী জাহাঙ্গির খানের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার জেরে সংখ্যালঘু ভোটের বড় অংশ ঘুরে গিয়েছে সিপিএমের দিকে। সূত্রের খবর, তার পরেই সিপিএমের রাজ্য নেতৃত্ব প্রাথমিক আলোচনায় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, বিজেপির সরকার আসার পরে বুলডোজ়ার-রাজ বা পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ অভিযানের প্রতিবাদে দল যে ভাবে দ্রুত রাস্তায় নেমেছে, সেই গতি বজায় রেখেই উপনির্বাচনে লড়াই করা হবে। বসিরহাট ও রেজিনগরে সিপিএম প্রার্থী দেবে। নন্দীগ্রামের ক্ষেত্রে কিছু আলোচনার অবকাশ থাকলেও শেষ পর্যন্ত সিপিএমের প্রার্থীই দেখা যেতে পারে। প্রসঙ্গত, এই তিন কেন্দ্রেই সংখ্যালঘু ভোট আছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে।
বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রে ২০২৪ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস-সমর্থিত সিপিএম প্রার্থী নিরাপদ সর্দার ৭৭ হাজার ৮৯৯ এবং আইএসএফের প্রার্থী আখতার রহমান বিশ্বাস এক লক্ষ ২৩ হাজার ৫০০ ভোট পেয়েছিলেন। এ বার বিধানসভা ভোটে বাম এবং আইএসএফের সমঝোতা হয়েছিল, বসিরহাট লোকসভা কেন্দ্রের মধ্যে আইএসএফ চারটি, সিপিএম দু’টি এবং সিপিআই একটি বিধানসভা আসনে লড়েছে। আইএসএফ ওই চার আসনে ভাল ভোটও পেয়েছে। তবে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের বক্তব্য, ‘‘বসিরহাট লোকসভা আসনে আমরা লড়ব, এই আলোচনার ভিত্তিতেই এর আগে বিধানসভা উপনির্বাচনে হাড়োয়া কেন্দ্র আইএসএফ-কে ছাড়া হয়েছিল। এ বারও বিধানসভা ভোটে ওই এলাকায় একাধিক আসন তাদের দেওয়া হয়েছিল। আর রেজিনগরে প্রস্তাব দেওয়া সত্ত্বেও বামফ্রন্টের শরিক দল রাজি হয়নি। শেষ পর্যন্ত ওয়েস্ট বেঙ্গল সোশ্যালিস্ট পার্টিকে আসন ছাড়া হয়েছিল। রেজিনগরে এ বার সিপিএমের প্রার্থী দেওয়াই সঙ্গত।’’ আইএসএফের চেয়ারম্যান নওশাদ সিদ্দিকী অবশ্য বসিরহাট নিয়ে সিপিএমের সঙ্গে আলোচনার পক্ষপাতী।
সিপিআইয়ের কাছ থেকে নিয়ে নন্দীগ্রামে ২০২১ সালে সিপিএম লড়লেও এ বার সেই আসন সিপিআইকেই ছাড়া হয়েছিল। সেখানে আইএসএফ-ও অবশ্য প্রার্থী দিয়েছিল। সিপিআইয়ের সঙ্গে কথা বলেই উপনির্বাচনে নন্দীগ্রামে প্রার্থী দিতে চায় সিপিএম। তবে কংগ্রেসকে নিয়ে আপাতত তারা ভাবছে না। দলের এক রাজ্য নেতার কথায়, ‘‘কেরলের ঘটনাবলির পরে পরিস্থিতি অনেকটাই অন্য রকম হয়ে গিয়েছে। আর অধীর চৌধুরী ছাড়া প্রদেশ কংগ্রেসে জোটের পক্ষে কেউ সওয়ালও করছেন না। কে কখন আসবে, কে আসবে না, সে সব না-ভেবে আমরা নিজেদের সংগঠন গুছিয়ে নিতে চাই।’’
ফলতার পুনর্নির্বাচনে ৬০টি বুথে ‘লিড’ পেয়েছেন সিপিএম প্রার্থী শম্ভুনাথ কুর্মি। একটি বুথে বিজেপি ও সিপিএম সমান ভোট পেয়েছে। কংগ্রেস এগিয়ে আছে ৬টি বুথে। তৃণমূল কোনও বুথেই ‘লিড’ পায়নি। সিপিএম যেমন সংখ্যালঘু ভোট পেয়েছে, তেমনই আবার কিছু বুথে মোট মুসলিম ভোটের চেয়ে বেশি ভোট এসেছে তাদের বাক্সে। কংগ্রেস নেতাদের কেউ কেউ বিধানসভা নির্বাচনে নিজেদের কেন্দ্রে কোথাও ২৮৮৪, কোথাও ১৯২২ ভোট পেলেও ফলতায় সিপিএম ধর্মীয় মেরুকরণের ফায়দা পেয়েছে বলে মন্তব্য করে চলেছেন। আবার সংখ্যালঘু এলাকায় আইএসএফ-কে বেশি জমি ছেড়ে দেওয়া নিয়ে সিপিএমের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে উপনির্বাচনে নিজেদের প্রতীকেই লড়তে চাইছে সিপিএম। দলের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের মতে, ‘‘সংখ্যালঘু ভোট আছে, এমন কেন্দ্রেই উপনির্বাচনআসছে— এতে আমাদের কিছু করণীয় নেই। এখন আমাদের সাংগঠনিক শক্তি বাড়িয়ে নিতে হবে। পাশাপাশি, সিপিএম মানেই মুসলিম— এই মর্মে যে প্রচার আরএসএস শুরু করেছে, তার মোকাবিলা করে রাজনৈতিক কর্মসূচিও ঠিক করতে হবে।’’
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)