আসন-রফা নিয়ে টানাপড়েন যে কোনও নির্বাচনের আগেই চেনা ছবি। এ বার বামফ্রন্টের অন্দরে নতুন দরাদরি বেধেছে বুথ নিয়ে!
রাজ্যে বিধানসভা ভোটের আগে অনেকটা সময় হাতে রেখেই বামফ্রন্টের মধ্যে আসন ভাগাভাগির আলোচনা শুরু করতে চেয়েছিল সিপিএম। সেই প্রক্রিয়া এক সময় অবশ্য গতি হারিয়েছিল। এখন আবার নতুন করে শুরু হয়েছে তৎপরতা। ইন্ডিয়ান সেক্যুলার ফ্রন্টের (আইএসএফ) চেয়ারম্যান নওসাদ সিদ্দিকী তাঁদের প্রস্তাবিত আসনের তালিকা নিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে গিয়ে সিপিএম রাজ্য নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করার পরে তৎপকতা বেড়েছে বাম শিবিরে। সূত্রের খবর, পুরনো আসনের দাবি থেকে সরে এসে আইএসএফ-সহ রাজ্যে বিজেপি ও তৃণমূল কংগ্রেসের বিরোধী শক্তিকে সঙ্গে নেওয়ার জন্য জায়গা তৈরি করতে বাম শরিকদের বার্তা দিয়েছে সিপিএম।
আসন ভাগের প্রশ্নেই বাম শিবিরে আলোচনায় এসেছে বুথ-সূত্র। পশ্চিমবঙ্গে ১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট তৈরি হওয়ার পর থেকে যারা যত আসনে লড়ত, মূলত সেই সংখ্যাই ধরে রাখার প্রাথমিক ভাবে পক্ষপাতী ফরওয়ার্ড ব্লক, আরএসপি, সিপিআইয়ের মতো শরিক দল। তবে সিপিএম এই ছক আগের দু’বার বিধানসভা নির্বাচনে ভেঙেছে, এ বারও ভাঙতে চায়। রাজ্যে ২০২১ সালের বিধানসভা এবং ২০২৪ সালের লোকসভা, পরপর দুই নির্বাচনে বামফ্রন্টের কোনও আসনে জয় নেই। ফলে, সেই নিরিখে কোনও শরিকেরই বাড়তি দাবি করার জায়গাও নেই। বাম সূত্রের খবর, এই পরিস্থিতিতে পঞ্চায়েত ও পুরসভা ভোটের ফলের পাশাপাশি বুথের সাংগঠনিক ছবিকে মাপকাঠি করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে সিপিএমের তরফে। সেখানে বলা হয়েছে, ফ্রন্টের যে শরিক দল যে আসনে লড়তে চাইবে, সেখানে সংশ্লিষ্ট দলের সাংগঠনিক অস্তিত্ব অন্তত ৬০% বুথে থাকতে হবে। এই মাপকাঠিই কমানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন শরিক নেতৃত্ব। তাঁদের যুক্তি, ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় দেখা যাচ্ছে, সিপিএম-সহ ফ্রন্টের কোনও দলই সব বুথে প্রতিনিধি (বিএলএ-২) দিতে পারেনি। রাজ্যের অনেক বিধানসভা কেন্দ্রে সিপিএম-ও ৬০% বুথে লোক দিতে পারবে না। তা হলে শরিকদের জন্য এই মাপকাঠি রেখে লাভ কী!
তবে নওসাদের সঙ্গে প্রাথমিক আলোচনার পরে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু, সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম এবং পলিটব্যুরোর সদস্য শ্রীদীপ ভট্টাচার্য ফ্রন্টের বৈঠকে বার্তা দিয়েছেন, গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ জোটের স্বার্থে সব দলকেই আসন ছাড়তে প্রস্তুত থাকতে হবে। আসনের দাবি ‘ন্যায্য ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়নে’র ভিত্তিতে পেশ করতে হবে। নরেন চট্টোপাধ্যায়, তপন হোড়, স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়েরা পাল্টা দাবি জানিয়ে রেখেছেন, আইএসএফ-ও যা চাইবে, তাতেই রাজি হওয়া চলবে না! এমতাবস্থায় আগামী ৬-৭ জানুয়ারি শরিকদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় বসছে সিপিএম।
গত ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিক ভাবে আসন বণ্টনে সিপিএম ১৩৮, ফ ব ২১, আরএসপি ১১ এবং সিপিআই ১০টি কেন্দ্রে লড়েছিল। কংগ্রেসকে ৯২ এবং আইএসএফ-কে ৩২টি আসন ছাড়া হয়েছিল। তবে এর বাইরে গিয়ে আইএসএফ এবং কংগ্রেস পরস্পরের একাধিক আসনে প্রার্থী দিয়েছিল, বাম শরিকদের সঙ্গেও কংগ্রেসের কিছু আসনে লড়াই হয়েছিল। এ বার নওসাদেরা প্রায় ৭৫টি আসনের তালিকা সিপিএমকে দিয়ে তার মধ্যে থেকে বাছাইয়ের প্রস্তাব দিয়েছেন। সিপিএমের রাজ্য সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্যের কথায়, ‘‘বিজেপি এবং তৃণমূলের লাভ যাতে না হয়, সে ভাবেই ভোটের রণকৌশল সাজাতে হবে। আসন-রফাও হবে সেই লক্ষ্যেই।’’ সূত্রের খবর, কংগ্রেস কী করতে চায়, সে দিকে দৃষ্টি রাখার ইঙ্গিত শরিক নেতাদের দিয়েছেন ফ্রন্ট চেয়ারম্যান বিমান।
এই খবরটি পড়ার জন্য সাবস্ক্রাইব করুন
5,148
1,999
429
169
(এই প্রতিবেদনটি আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণ থেকে নেওয়া হয়েছে)