×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৭ জুন ২০২১ ই-পেপার

এখনও কেন পদ আঁকড়ে ডিজি, প্রশ্ন প্রাক্তনদেরও

নিজস্ব প্রতিবেদন
২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৪ ০৩:৪৩

পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার একের পর এক মামলায় রাজ্য পুলিশকে প্রায় প্রতিদিনই তুলোধনা করছে কলকাতা হাইকোর্ট। বুধবার পাড়ুই মামলায় তার বিস্ফোরণ ঘটেছে। তদন্তকারী দলের প্রধান রাজ্য পুলিশের ডিজি-র উপরে আদালতের যে আস্থা ছিল, পাড়ুই-কাণ্ডে তদন্তের গতিপ্রকৃতি দেখে তা চুরমার হয়ে গিয়েছে বলে বুধবারই মন্তব্য করেছিলেন বিচারপতি হরিশ টন্ডন। বৃহস্পতিবার পুলিশি নিষ্ক্রিয়তার আরও একটি মামলায় (তাপস পাল-কাণ্ড) রাজ্য সরকার কোণঠাসা হওয়ার পরে বাহিনীর প্রধান হিসেবে জিএমপি রেড্ডি-র ডিজি পদে থাকা উচিত কি না, তা নিয়েই প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। বিরোধী দলগুলি তো বটেই, প্রশ্ন উঠে গিয়েছে পুলিশের অন্দরেও।

সেই প্রশ্নের সূত্র ধরেই রাজ্য প্রশাসনের একাংশ বলছেন, গত তিন বছরে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে নানা ঘটনায় শাসক দলের কর্মী-সমর্থকদের হাতে যে ভাবে পুলিশকে হেনস্থা হতে হয়েছে, তাতে বাহিনীর মনোবল তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নিচুতলার পুলিশকর্মীরা দেখেছেন, বীরভূমে শাসক দলের সমর্থকদের ছোড়া বোমায় তাঁদের এক সহকর্মী রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পরেও অভিযুক্তেরা পাড়ায় বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেরিয়েছে! নিচুতলার পুলিশকর্মীরা এ-ও দেখেছেন, থানা ঘিরে আক্রমণ চালানোর পরেও গ্রেফতার তো দূরের কথা, হামলাকারীদের বিরুদ্ধে এফআইআর করার অনুমতি জোগাড় করতেই কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে জেলা প্রশাসনকে! আর এ সবই ঘটেছে জিএমপি রেড্ডি ডিজি থাকাকালীন। পুলিশের একটা বড় অংশের বক্তব্য, নিচুতলার কর্মীদের নিরাপত্তাই দিতে পারেননি বাহিনীর প্রধান।

প্রশাসনের ওই অংশের যুক্তি, কৃতিত্ব বা ব্যর্থতা, দু’টোই দলের নেতা দাবি করেন। পুলিশের গুলিতে মাওবাদী শীর্ষ নেতা কিষেণজির মৃত্যু হলে যেমন বাহিনীর নেতা হিসেবে ডিজি সেই কৃতিত্বের ভাগীদার হন, তেমনই পুলিশি ব্যর্থতার দায়ও নিতে হবে তাঁকেই। নবান্নের এক কর্তা বলেন, “যে ভাবে পুলিশ দিনদিন ঠুঁটো হয়ে যাচ্ছে এবং সরকারের নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে গিয়ে অধিকাংশ মামলায় আদালতের সমালোচনার মুখে পড়ছে, তাতে বাহিনীর সর্বোচ্চ পদ থেকে ডিজি-র সরে দাঁড়ানোই উচিত।”

Advertisement

একই মত প্রাক্তন শীর্ষ পুলিশকর্তাদেরও। রাজ্যের প্রাক্তন ডিজি অরুণপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় যেমন সরাসরিই বলেছেন, “এক জন ডিজি এই অসম্মান সহ্য করছেন কী করে, তা আমার বোঝার বাইরে! এ ক্ষেত্রে ওই পুলিশকর্তা বা সরকারের নৈতিকতা, ঔচিত্যবোধ নিয়েও প্রশ্ন উঠছে বৈ কী!” কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার তুষার তালুকদার অবশ্য বলেছেন, “ওঁর (বর্তমান ডিজি) ইস্তফা দেওয়া উচিত কি না, কী করে বুঝব! ওঁর মতো নতজানুু হয়ে কখনওই চাকরি করিনি। কোনও আমলেই করিনি। যিনি এ ভাবে নতজানু হয়ে কাজ করেন, তাঁর কোনও কিছুতেই অসম্মান হয় বলে মনে হয় না!”

তবে রাজ্যের আর এক প্রাক্তন ডিজি নিরুপম সোমের মত আবার ওঁদের থেকে অনেকটাই ভিন্ন। তাঁর প্রশ্ন, “ডিজি কেন পদত্যাগ করবেন? ডিজি তো সব সময় স্বরাষ্ট্রসচিব, মুখ্যসচিব ও পুলিশমন্ত্রীর কথা মতো চলেন।” রাজ্য পুলিশের আর এক প্রাক্তন ডিজি নপরাজিত মুখোপাধ্যায় ফোন ধরেননি। এসএমএস করলেও জবাব মেলেনি।

রেড্ডি নিজে কী বলছেন?

বৃহস্পতিবার এ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “কোনও মন্তব্য করব না।”

এই পরিস্থিতিতে ডিজি-র পদত্যাগের দাবি জোরালো হলেও নিরুপমবাবুর বক্তব্যে কিন্তু সায় দিয়েছেন প্রশাসনেরই অন্য একটি অংশ। একাধিক সিনিয়র পুলিশকর্তা বলেন, “পুলিশ সিদ্ধান্ত নেয় না। সরকারের সিদ্ধান্ত কার্যকর করে। যদি পুলিশের ব্যর্থতাকেই কাঠগড়ায় তুলতে হয়, তা হলে বাহিনী যাঁদের কথায় চলে, তাঁদেরও দায়, দায়িত্ব ও দায়বদ্ধতা প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে যায়।” ওই পুলিশকর্তাদের বক্তব্য, ডিজি চাইলেও সরকারি সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে পদত্যাগ করতে পারেন না। সরকারি বিধি সেই অধিকার তাঁকে দেয়নি। উল্টে সরকারি নির্দেশ না মানলে ডিজির বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আইনি অধিকার দেওয়া হয়েছে সরকারকে।

তা হলে? নবান্নের একাংশ বলছেন, সরকারের কাজকর্ম অপছন্দ হলে ডিজি বড়জোড় ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি চাইতে পারেন। সে ক্ষেত্রে ওই আর্জি মানা না মানা পুরোটাই সরকারের মর্জির উপরে নির্ভর করে। আরও একটি পথ হল, ডিজি চাকরি থেকে অবসর নিতে পারেন। কিন্তু সরকারি কর্মী হয়ে কখনওই সরকারের বিরোধিতা করতে পারবেন না।

বাম আমলের উদাহরণ টেনে ওই পুলিশকর্তারা বলছেন, ২০০৯ সালে গোটা জঙ্গলমহল যখন ধীরে ধীরে মাওবাদীদের দখলে চলে যাচ্ছে, তখন তৎকালীন শাসনকর্তাদের বলা হয়েছিল, গোড়ায় প্রতিরোধ না হলে পরিস্থিতি ভয়ানক হবে। অনেক প্রাণহানি হবে। এমনকী, নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়ও পুলিশ ঢোকানো নিয়ে মহাকরণের উপরে চাপ সৃষ্টি করেছিল প্রশাসন। কিন্তু তখনও পুলিশের কোনও কথা শোনা হয়নি। শাসকপক্ষ নিজেদের সিদ্ধান্তেই অবিচল ছিলেন। তার খেসারত দিতে হয়েছিল বাম সরকারকে। নবান্নের ওই অংশের আরও যুক্তি, বাম আমলে ছোট আঙারিয়া হত্যাকাণ্ডে পশ্চিম মেদিনীপুরের দুই সিপিএম নেতা তপন ঘোষ এবং শুকুর আলির নাম জড়িয়েছিল। এফআইআরে তাঁদের নামও ছিল। কিন্তু তাঁরা এলাকায় ছিলেন নির্বিঘ্নে। প্রশাসনের শীর্ষমহলের নির্দেশেই পুলিশ তাঁদের ছোঁয়নি।

পুলিশকর্তাদের একাংশের এই যুক্তিকে কার্যত উড়িয়ে দিয়েছেন তাঁদেরই অন্য একটি অংশ। ওই অংশের পাল্টা যুক্তি, পুলিশ কী করবে, কী করবে না, তা ‘পুলিশ রেগুলেশন’-এ স্পষ্ট বলে দেওয়া আছে। পুলিশ যাতে নিরপেক্ষ ভাবে কাজ করতে গিয়ে বিপদে না পড়ে, সেই জন্যই ওই আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছে তাঁদের। সেই প্রেক্ষাপটে, বর্তমান ডিজির পেশাদারিত্ব, দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে বলে মনে করেন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ অফিসারদের অনেকেই। তাঁরা মনে করেন, নিচুতলার পুলিশকর্মীদের বিরুদ্ধে যেমন আদালতের নির্দেশ মেলার পরেই ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তেমনই সর্বোচ্চ পর্যায়েও পদক্ষেপ করা দরকার।

রাজ্য পুলিশের একাধিক প্রাক্তন কর্তা জানান, কোনও মামলায় তদন্তকারী অফিসারের বিরুদ্ধে আদালত বিরূপ মন্তব্য করলে তাকে ভর্ৎসনা হিসেবেই ধরা হয়। ওই মন্তব্য সংশ্লিষ্ট পুলিশকর্মীর পেশাদারিত্ব ও দক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলারই সামিল। সে জন্য সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়াই প্রথা। অতীতে তদন্তে গাফিলতির জন্য একাধিক ইনস্পেক্টর, ডিএসপির বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত করে ব্যবস্থা নিয়েছেন প্রাক্তন ডিজিদের অনেকে। বেশ কয়েক জনের পদোন্নতিও দীর্ঘ সময় আটকে গিয়েছে। এই প্রসঙ্গে রিজওয়ানুর-কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে এক পুলিশকর্তা বলেছেন, ওই মামলায় সিবিআই তদন্তে জ্ঞানবন্ত সিংহের বিরুদ্ধে অপরাধে যুক্ত থাকার

প্রমাণ মেলেনি। কিন্তু তাঁর ভূমিকা নিয়ে উচ্চ আদালতে প্রশ্ন ওঠায় তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের নির্দেশে ওই আইপিএস অফিসারের বিরুদ্ধে বিভাগীয় পর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এতে পাঁচ বছর পদোন্নতি আটকে যায় জ্ঞানবন্তের।

স্বাভাবিক ভাবেই বিরোধী দলগুলি এ নিয়ে সরব হয়েছে। রাজ্যের বিরোধী দলনেতা সূর্যকান্ত মিশ্র বুধবারই ডিজি-র পদত্যাগ দাবি করেছিলেন। এ দিন বিজেপির রাজ্য সভাপতি রাহুল সিংহও সেই সুরে গলা মিলিয়ে বলেছেন, “হাইকোর্টের রায়ে পরিষ্কার, রাজ্যের চাপে ডিজি সত্যের অপলাপ করেছেন। তাঁর উপরে আদালতের আস্থা নেই, তা-ও প্রমাণিত। এই ডিজি-র পদত্যাগ করাই উচিত।”



Advertisement